পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে এবার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের বৃহত্তম ও ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী।
রবিবার (৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে এক প্রস্তুতি সভা শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য জানান সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
জাতীয়ভাবে বাংলা নববর্ষ এবং চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি সভা শেষে তিনি বলেন, ‘শোভাযাত্রার নামকরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জনমনে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক ছিল। উৎসবটি যেন সব ধরনের বিভাজনের ঊর্ধ্বে থেকে দেশের সব মানুষের সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়, সে লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
মন্ত্রী জানান, এখন থেকে পূর্বের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র পরিবর্তে এটি কেবল ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত হবে। তার ভাষ্য, সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নামকরণের মাধ্যমে ‘বিতর্কের অবসান ঘটবে’ এবং সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হবে।
তবে নাম পরিবর্তন হলেও শোভাযাত্রার মূল কাঠামো ও ঐতিহ্যে কোনো পরিবর্তন আসবে না বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে প্রতি বছরের মতো এবারও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হবে এবং এর চিরাচরিত মোটিফ, লোকজ সাজসজ্জা ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন থাকবে। পাশাপাশি রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য আয়োজন আগের মতোই অনুষ্ঠিত হবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মূল শক্তি বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য। কোনো নির্দিষ্ট শব্দ বা নাম যেন উৎসবের আমেজ নষ্ট না করে এবং সমাজের কোনো অংশ যেন নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে না করে, সে দায়বদ্ধতা থেকেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
তিনি সব ধর্ম ও পেশার মানুষকে কোনো দ্বিধা বা বিতর্কে কান না দিয়ে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’য় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় উপস্থিত ছিলেন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, সচিব কানিজ মওলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা।
এদিকে, শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের ঘোষণায় ক্ষোভ জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।
সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা কেবল একটি নাম নয়, এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বাঙালির সার্বজনীন ঐক্যের প্রতীক।’
বারবার নাম পরিবর্তনের প্রবণতাকে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী সংস্কৃতির ওপর অযাচিত ও অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তারা সরকারের কাছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি অবিলম্বে পুনর্বহালের দাবি জানান। একইসঙ্গে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত শতকের আশির দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শোভাযাত্রার সূচনা হয় এবং পরে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি পায়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি এটিকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়। নাম পরিবর্তনের চেষ্টা ইতিহাস, সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে অস্বীকার করার শামিল বলেও উল্লেখ করা হয়।
উদীচী নেতারা বলেন, সংস্কৃতি কখনো রাজনৈতিক সুবিধাবাদ, মতাদর্শিক চাপ বা ধর্মীয় সংকীর্ণতার কাছে নত হতে পারে না। ‘মঙ্গল’ শব্দটি অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এই শব্দ অপসারণ সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেবে।
তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতি বহুত্ববাদ, সহনশীলতা ও মুক্তচিন্তার জন্য বিশ্বে সমাদৃত। সেই চেতনাকে অক্ষুণ্ন রাখা সবার নৈতিক দায়িত্ব, ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জাতির অস্তিত্ব ও পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত।
জয়ন্ত সাহা/নাঈম