দেশে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বিকাশের সঙ্গে পণ্য পরিবহন বাড়ছে। এতে বাণিজ্যিক যানবাহনের চাহিদাও বাড়ছে। যা দেশে যানবাহন সংযোজন ও উৎপাদনশিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এ শিল্পের যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমিন সংকটও আছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের দেশ অটোমোবাইলশিল্পের জন্য আকর্ষণীয় বাজার। এই খাতে বিনিয়োগের অনেক সুযোগ আছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। বিশেষভাবে নীতিসহায়তার পাশাপাশি কম সুদে ব্যাংক ঋণ, কারখানা নির্মাণের জন্য জায়গা বরাদ্দের দাবিও করেছেন তারা।
অটোমোবাইল খাতের মেরামতের জন্য আলাদা অঞ্চল নির্ধারণ, দেশে বৈদুত্যিক যানবাহন আমদানি সহজ করার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে বিআরটিএতে যানবাহনের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা, অটোমোবাইল খাতের সব প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যাংকগুলোকে একই নীতি অনুসরণ করা, অটোমোবাইল খাতসংশ্লিষ্ট সরকারের যেকোনো নীতি প্রণয়নে অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের মতামত গ্রহণেও দাবি জানান ব্যবসায়ীরা।
সম্প্রতি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে অটোমোবাইল খাতে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব পড়ে, এমন অনেক পণ্য ও সেবায় ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক কমানোর কথাও বলেছেন অটোমোবাইল ব্যবসায়ীরা।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, বাংলাদেশে অটোমোবাইলশিল্পের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। আবার সমস্যাও রয়েছে। এ খাতে গতি আনতে হলে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে কাজ করতে হবে। অটোমোবাইল খাতের ওপর শতাধিক শিল্প খাত নির্ভরশীল। অটোমোবাইল খাতে গতি এলে ওইসব শিল্পেও গতি বাড়বে। সমগ্র অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
শিল্প মন্ত্রণালয় প্রণীত সর্বশেষ অটোমোবাইল নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। গত ১০ বছরে দেশের শিল্প উৎপাদন সূচক বেড়েছে গড়ে ১০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে অটোমোবাইলশিল্পকে বিবেচনা করা হয়েছে। এ শিল্প খাতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত হলে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব। আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে ইঞ্জিনচালিত যান সম্পূর্ণভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। কিছু প্রতিষ্ঠান সংযোজনে আসছে। এখানেও সরকারি পৃষ্টপোষকতা বাড়াতে হবে। বিনিয়োগকারীদের পর্যাপ্ত পুঁজি না থাকাও অটোমোবাইল খাতের বিকাশে বাধা। ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের দাম কমাতে দেশেই পরিবেশবান্ধব যন্ত্রাংশ উৎপাদন করতে হবে। এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হলে গতিশীল অটোমোবাইলশিল্প খাত গড়ে তোলা সম্ভব। অটোমোবাইল খাতের আমদানি নির্ভরশীলতা কমবে।’
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জিকা) গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইঞ্জিনচালিত গাড়ির বিক্রি গড়ে এক বছরে ১ লাখ পর্যন্ত সম্ভব। অথচ বর্তমানে দেশে গড়ে প্রতি বছর ১২ হাজার থেকে ৩৫ হাজার গাড়ি বিক্রি হচ্ছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসেল পরিচালিত এক সমীক্ষা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশে প্রতি ১ হাজার মানুষের বিপরীতে ২ দশমিক ৫টি গাড়ি রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যক্তিগত গাড়ির বাজার ৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বেশির ভাগ গাড়ির চাহিদা পূরণ করে প্রায় ১ হাজার রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়ভাবে সম্পূর্ণ গাড়ি উৎপাদন করার চেয়ে সংযোজনশিল্পে আছে বেশি।
দেশে এখন ১৪ থেকে ১৫টি বড় অটোমোবাইল পরিবেশক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচ-ছয়টি প্রতিষ্ঠানের রয়েছে নিজস্ব সংযোজন কারখানা। বাকিরা শুধু পরিবেশক বা আমদানিকারক। বাংলাদেশে অটোমোবাইলের প্রধান প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: ইফাদ অটোস, আফতাব অটো, নাভানা, র্যাংগস মটরস, রনকন মোটরস, নিটল মোটর, রানার মোটর, এজি অটোমোবাইল, এসিআই মটরস ইত্যাদি।
উদ্যোক্তাদের মতে, অর্থনীতির গতি বাড়ছে বলে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক যানবাহনের জন্য একটি সম্ভাব্য বাজার তৈরি হয়েছে। বাণিজ্যিক যানবাহনগুলোর চাহিদা দিন দিন বাড়বে। কারণ, পণ্য পরিবহন ও মানুষের গতিবিধির জন্য যানবাহন দরকার।
বারভিডা সভাপতি আবদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, দেশে ইঞ্জিন সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে গাড়ি আমদানিতে শুল্ক ১২৮ শতাংশ থেকে শুরু করে ৭০০ শতাংশ পর্যন্ত আছে। যা অতি উচ্চ হারের। সরকার যুক্তিসংগত কর এবং শুল্ক আরোপ করলে বাংলাদেশে গাড়ির বাজার বাড়বে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, করোনার আঘাত আসার আগে বাংলাদেশের অটোমোবাইল বাজার গড়ে বার্ষিক ১৫-২০ শতাংশ হারে সম্প্রসারিত হচ্ছিল। অটো পার্টসের বাজার সম্প্রসারণের হার ছিল গড়ে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ।
তিনি বলেন, করোনার সময়ে এসব হিসাব কিছুটা কমলেও করোনা কমার পর আবারও বাড়ে। কিন্তু ডলারের দাম বাড়ার কারণে অটোমোবাইল খাতের ব্যবসা আবারও চাপে পড়েছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও এ দেশে অটোমোবাইল খাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ আরও বলেন, গত ১০ বছরে দেশের সড়ক, মহাসড়ক আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। ব্রিজ ও টানেল এবং আঞ্চলিক পর্যায়ের রাস্তাঘাটও আগের চেয়ে ভালো। এতে বাংলাদেশে দুই চাকা, যাত্রীবাহী গাড়ি, হালকা ও ভারী বাণিজ্যিক পরিবহন কিংবা তিন চাকার বাহনের মতো অটোমোবাইলেরও চাহিদা বাড়ছে। এ খাতের বিরাজমান সমস্যার সমাধান করতে পারলে অটোমাবাইল খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
আকিজ মোটরসের সিইও শেখ আমিনুদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন না হলেও আমাদের এখানে সংযোজনের মাধ্যমে রপ্তানির সুযোগ আছে। এটা পৃথিবীর অনেক দেশেই করে থাকে। আমাদের দেশে সংযোজন করে উন্নত বিশ্বে সেগুলো রপ্তানি করলে সেখানে শুল্ক সুবিধা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি আমরা নিজেরাও পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল ও ভুটানে রপ্তানির চিন্তাভাবনা করছি। এ ব্যাপারে চলতি বছরই কাজ শুরু করব বলে আশা করছি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যানুসারে, দেশে মোটরচালিত যানের অধিকাংশই দুই বা তিন চাকার, যেগুলোর বেশির ভাগের নিবন্ধন নেই। দেশে নিবন্ধিত মোটরচালিত যানের সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি। মোট নিবন্ধিত অটোমোবাইল খাতের মোটরচালিত পরিবহনের প্রায় ৬০ শতাংশ দুই চাকাবিশিষ্ট। বাকি ১০ শতাংশ যাত্রীবাহী গাড়ি। এর বাইরে বাস, ট্রাক, পিকআপ, অটোরিকশা, ভ্যান এবং মাইক্রোবাস মিলে আছে বাকি অংশ।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, অটোমোবাইল খাতে উচ্চ শুল্ক, কর ও ভ্যাটের কারণে এ শিল্পের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুল্ক, কর ও ভ্যাট কমানো হলে অটোমোবাই খাতে বিনিয়োগকারী বাড়বে। এতে রাজস্ব আদায় বাড়বে। তাই সরকারকে বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন।
নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল মাতলুব আহমাদ খবরের কাগজকে বলেন, স্থানীয়ভাবে অটোমোবাইল শিল্প খাতের বিকাশে পৃথক অটোমোবাইল শিল্প এলাকা প্রয়োজন। দেশে অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ উৎপাদন করতে না পারলে অটোমোবাইলশিল্প খাতে গতি আসবে না। এ খাতের বিকাশে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের জনসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। জনসংখ্যার তুলনায় পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি কিনছে। এ ক্ষেত্রে রিকন্ডিশনন্ড গাড়ি আমদানি কমিয়ে দেশেই গাড়ি অ্যাসেম্বলিংয়ের সুযোগ দিতে হবে। গাড়ি উৎপাদনেও বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিতে হবে।
উত্তরা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউর রহমান বলেন, অটোমোবাইল খাতের যানের চাহিদা বাড়লেও এখনো এই খাত অনেক পিছিয়ে আছে। এই খাতকে এগিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা ও প্রণোদনা প্রণয়ন প্রয়োজন। অন্তত ৫-১০ বছরের টেকসই শুল্কনীতি প্রণয়নের কথাও বলেন তিনি।
/আবরার জাহিন