শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল শাকসু নির্বাচন হবে। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে সেটা পেছাতে থাকে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও প্রতিবাদের মুখে অবশেষে সেটা হতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে কী বলছেন শিক্ষার্থীরা, চলুন দেখে নিই।
২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আদনান ফরহাদ বলেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা শাবিপ্রবি প্রশাসনের দায়িত্ব। দীর্ঘ ২৮ বছর শিক্ষার্থীরা কথা বলার, তাদের অধিকার ও স্বার্থ আদায়ের কোনো প্ল্যাটফর্ম পায়নি। প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও আমাদের নেই পর্যাপ্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। আমাদের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে নেই কোনো আধুনিকতার ছোঁয়া, নেই পর্যাপ্ত বইয়ের সংগ্রহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীদের জন্য নেই আবাসন ব্যবস্থা। নেই পর্যাপ্ত রিসার্চ ফান্ড। দেওয়া হয় না জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে প্রণোদনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি হলে খাবারের মান অত্যন্ত নিম্নমানের।
ক্যাম্পাসের অবকাঠামোগত অবস্থা দেখলে মনে হয়, আমরা বসবাস করছি কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ইদানীং বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বিক নিরাপত্তার অভাব রয়েছে, যা থেকে সূত্রপাত ঘটছে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার। বিশেষ করে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজনীতির কালো অধ্যায় দেখে দেখে বড় হয়েছি। কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারিনি। জীবনে প্রথমবারের মতো শাকসুর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে যাচ্ছি এবং নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছি। একমাত্র শাকসুই নিশ্চিত করতে পারে শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস। তাই আমরা চাই একটা সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেন আমরা আমাদের আগামীর নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারি।
অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাফিজুর ইসলাম হাফিজ। একই প্রশ্ন নিয়ে খবরের কাগজ কথা বলে তার সঙ্গে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অপেক্ষায়। গণতান্ত্রিক চর্চা ও নেতৃত্বের বিকাশের অন্যতম সুযোগ তৈরি করবে এই নির্বাচন। অথচ অনুপস্থিত প্রতিনিধিত্বের কারণে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দাবি, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অনেকটা দিশাহীন ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসন নির্বাচনের আশ্বাস দিয়েছে, নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সূচনা। এখন অপেক্ষা তফসিল ঘোষণার এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ নির্বাচনি প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তার। শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব বেছে নেবেন, যিনি দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে থেকে ছাত্রদের অধিকার ও স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নিতে সক্ষম। ক্যাম্পাস রাজনৈতিক প্রভাব আর দমন-পীড়নের ক্ষেত্র হবে না। এটা হওয়া উচিত শিক্ষা, গবেষণা, চিন্তা ও সংস্কৃতির মুক্তচর্চার স্থান। গ্রন্থাগারের আধুনিকীকরণ, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, উদ্ভাবনে সহায়তা, নিরাপদ ও মানবিক আবাসিক পরিবেশ এগুলোর দাবি উচ্চারিত হওয়া উচিত সর্বাগ্রে। সর্বোপরি, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তৈরি হবে এবং আমরা সেই পথে আস্থাশীল।
সমাজকর্ম বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মোফাজ্জল হক। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ত্যাগ, সংগ্রাম ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে শিক্ষাঙ্গনের রাজনীতি হওয়া উচিত দায়িত্বশীল, আদর্শনির্ভর ও কল্যাণমুখী। রাজনীতি হবে সচেতনতা, ন্যায়বোধ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধভিত্তিক, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ নয়, বরং শিক্ষার্থী ও দেশের স্বার্থই হবে মূল প্রেরণা। শিক্ষাঙ্গনে এমন রাজনীতি দরকার যা জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মানবিকতার চর্চাকে উৎসাহিত করবে। সহিংসতা ও লেজুড়বৃত্তিক সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে রাজনীতি হবে সেবার মাধ্যম। শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান, অধিকার রক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার অঙ্গীকার। আর সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বৈধ এজেন্ডা হচ্ছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বা নির্বাচিত প্রতিনিধি।
আমাদের প্রত্যাশা- নির্বাচন যেন হয় অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেন কোনো ধরনের হিংসা, ভয়ভীতি বা রাজনৈতিক প্রভাব না থাকে, বরং শিক্ষার্থীদের মতামত ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। আমরা চাই এমন একটি পরিবেশ, যেখানে প্রার্থীরা ভয়ের নয়, ভাবনার রাজনীতি করবে; ব্যক্তিস্বার্থ নয়, বরং শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকে প্রাধান্য দেবে।