চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার পূর্ব চর কৃষ্ণপুর, যার চারদিকে নদীর ঢেউ, বাতাসে ইলিশের গন্ধ আর জেলেদের সুরেলা গান। এই নদীপাড়েই বেড়ে উঠেছেন জান্নাতুল মাওয়া। শৈশবের স্বপ্ন ছিল নিজেকে নিজের পরিচয়ে গড়ে তোলা। কিন্তু জীবনের শুরুটা থেমে গিয়েছিল বাল্যবিবাহের আঁধারে।
ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই বাবা ও দাদির ইচ্ছাতেই মাওয়ার বাল্যবিবাহ হয়। তখনো তার বয়স পুতুল খেলার ঘর ছাড়েনি। সংসারের ঘেরাটোপে বন্দি হয়ে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল তার স্বপ্ন।
তবুও মাওয়া হাল ছাড়েননি। সংসারের কাজ সামলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, হাতের কাজ শেখা ও অন্যকে শেখানো এসবই হয়ে ওঠে তার নেশা। প্রথম সন্তানের জন্মের পাঁচ বছর পর আবার শুরু করেন পড়াশোনা। হাইমচর নীল কমল উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং হাজীগঞ্জ সরকারি মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বর্তমানে তিনি চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজে বিএ ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী।
‘আমি সব সময় চেয়েছি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে। কারণ, শিক্ষাই আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি দেবে’ মাওয়ার কণ্ঠে দৃঢ়তা।
২০২১ সালে বাবার আকস্মিক মৃত্যু তার জীবনে ঝড় বয়ে আনে। বাবার অনুপস্থিতি শুধু মানসিক শূন্যতাই নয়, তার সাহসও কাঁপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু হাল না ছেড়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এখন নিজের জন্য, নিজের পরিচয়ের জন্য লড়াই করতে হবে। ঠিক তখনই যুক্ত হন ‘নিজের বলার মতো একটি গল্প’ ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তা উন্নয়ন কার্যক্রমে। সেখান থেকে শেখেন ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কৌশল। এই প্রশিক্ষণ তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
মাওয়ার স্বামী ছিলেন প্রবাসী। যৌথ পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে তার ওপর ছিল অনেক দায়িত্ব। আত্মীয়স্বজনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে নিজের সন্তানের জন্য কিছু করার ফুরসতও ছিল না। একপর্যায়ে তিনি স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে আসেন। এতে সংসারে নেমে আসে অর্থনৈতিক ও মানসিক অস্থিরতা। সেই দুঃসময়ে মাওয়া বুঝেছিলেন, যদি তিনি নিজে কিছু না করেন, তবে সংসার ভেঙে পড়বে। তাই সাহস করে শুরু করলেন নতুন যাত্রা।
‘ইলিশ রাণী’ নামের ব্র্যান্ড
চাঁদপুর মানেই ইলিশের নগরী। এই পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে ফেসবুকে ‘ইলিশ রাণী’ নামে একটি পেজ খুললেন। চাঁদপুরের রুপালি ইলিশ, রুই, কাতলাসহ নদীর সব ধরনের টাটকা মাছ সারা দেশে পৌঁছে দিতে শুরু করলেন।
তার সততা, স্বচ্ছ লেনদেন আর সময়মতো ডেলিভারির কারণে দ্রুতই গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেন। এখন তার ব্র্যান্ড শুধু দেশের নানা প্রান্তেই নয়, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।
“দূর দেশে থেকেও অনেকে বলেন, ‘ইলিশ রাণী আমাদের মেঘনার স্বাদ পৌঁছে দেন।’ এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি” বললেন তিনি।

তার এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় সঙ্গী মেয়ে সাবিকুন নাহার। অর্ডার প্যাকিং, অনলাইন মেসেজের উত্তর দেওয়া সব জায়গায় মেয়ের সহযোগিতা তাকে এগিয়ে নিয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সংগঠন ‘হাজীগঞ্জ ই-কমার্স’ থেকেও পেয়েছেন প্রযুক্তিগত সহায়তা।
গ্রামের নারী উদ্যোক্তা মানেই অবজ্ঞা, প্রশ্ন আর কটূক্তি। মাওয়াকেও শুনতে হয়েছে, ‘নারীরা ব্যবসার কী বুঝবে?’ কিন্তু তিনি জানেন, প্রতিটি বাধাই আসলে শক্তি জোগায়। ‘আমি চাই গ্রামের মেয়েরা বুঝুক—আমাদেরও স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে। আর সেই স্বপ্ন পূরণের ক্ষমতাও আমাদের আছে’ বললেন মাওয়া দৃঢ় কণ্ঠে।
আজ মাওয়া কেবল একজন সফল উদ্যোক্তা নন, তিনি হয়ে উঠেছেন এলাকার নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা। তার লক্ষ্য ব্যবসা আরও বড় করা, নারীদের কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং মেঘনার তীরের মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করে তোলা।
‘আমার গল্প যদি একজন মেয়েকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে, তবেই আমি সফল’ বলেন মাওয়া।
নারীদের জন্য মাওয়ার গল্প বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। গ্রামীণ সমাজে এখনো নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে নানা কটূক্তি শোনা যায়। কিন্তু মাওয়া দেখিয়েছেন, নারীরাও ব্যবসা করতে পারে, নিজেদের ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারে, পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করতে পারে। তিনি কেবল একজন উদ্যোক্তা নন; তিনি এক সামাজিক বার্তা বহন করছেন, ‘নারী মানেই শুধু সংসারের খাঁচায় বন্দি নয়, বরং স্বপ্ন দেখার ও তা বাস্তবায়নের অধিকার তারও আছে।’
অন্যদিকে, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য তার পথচলা শেখায়, স্থানীয় সম্পদ ও সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে একটি ব্যবসা গড়ে তোলা যায়। মাওয়া চাঁদপুরের ইলিশকে ভিত্তি করে যে ব্র্যান্ড দাঁড় করিয়েছেন, তা স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও যুক্ত করেছে।
সুতরাং মেঘনার ঢেউ যেমন কখনো থামে না, তেমনি জান্নাতুল মাওয়ার স্বপ্নও অবিরাম। তিনি প্রমাণ করেছেন, জীবন সংগ্রাম মানে কেবল বেঁচে থাকা নয়, বরং নিজের আলো দিয়ে অন্যের পথ আলোকিত করা।
/ এসএল
.jpg)