সমাজে এখনো নারীর সাফল্য নিয়ে ব্যতিক্রম ধারণা কাজ করে। যেন নারীর সাফল্য স্বাভাবিক কিছু নয়; বরং বিস্ময়ের বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এখনো কেন এমন ভাবনা? একুশ শতকে শিক্ষা, প্রযুক্তি, ব্যবসা, গবেষণা বা ক্রীড়াজগৎ সব ক্ষেত্রেই নারীরা যে যোগ্যতা ও নেতৃত্ব দেখিয়েছেন, তা প্রমাণ করে সাফল্য কোনো লিঙ্গনির্ভর বিষয় নয়। তবুও সমাজে নারীর সাফল্যকে বিশেষ ঘটনা হিসেবে দেখা হয়, যা মূলত দীর্ঘদিনের সামাজিক মানসিকতা ও লিঙ্গবৈষম্যের ফল।
শতাব্দীর পর শতাব্দী গৃহস্থালি কাজ ও পরিবার দেখাশোনাকেই নারীর প্রধান ভূমিকা হিসেবে ধরা হয়েছে। ফলে যখন কোনো নারী এ নির্ধারিত সীমানা পেরিয়ে পেশাগত বা সামাজিক ক্ষেত্রে উন্নতি করেন, তখন সমাজ তাকে ভিন্ন নজরে দেখে। যেন তিনি নিত্যদিনের নিয়ম ভেঙে ‘অসাধারণ’ কিছু করে ফেলেছেন। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই জন্ম নেয় নানা ধরনের মিথ। যেমন অনেকেই বলে থাকেন সফল নারী মানে তিনি পরিবার অবহেলা করেন, সংসারে মনোযোগী নন। কিংবা কেউ কেউ বলে থাকেন- নারীরা নিজের যোগ্যতায় নয়, বরং কারও সহায়তায় সাফল্য পান। পুরুষ যখন ক্যারিয়ারে ব্যস্ত থাকেন, তাকে বলা হয় পরিশ্রমী; কিন্তু একই কাজ করলে নারীকে বলা হয় দায়িত্বহীন। এটাই লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির সূক্ষ্ম প্রতিফলন।
নারী নেতৃত্বকেও সমাজ নানা ছাঁচে ফেলে বিচার করে। তিনি দৃঢ় হলে বলা হয় ‘বেশি কঠোর’, নমনীয় হলে বলা হয় ‘নরম’, তাই নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য নন। নেতৃত্বের মানদণ্ডকে পুরুষকেন্দ্রিক ধরা হয় বলে নারী যেভাবেই কাজ করুন না কেন, তাকে একই গৎবাঁধা বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। আরেকটি বড় ভুল ধারণা হলো, সফল নারী মানেই ‘অসাধারণ প্রতিভাধর’। যেন সাধারণ মেধা, পরিশ্রম এবং ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় নারীর সাফল্য সম্ভব নয়। সমাজের এ প্রত্যাশা থেকেই মনে হয় নারীর সফল হওয়া নিতান্তই একটি বিরল ঘটনা।
তবে নারীর সাফল্যকে ব্যতিক্রম মনে হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো সামাজিক কাঠামো। একজন নারীকে পেশাগত উন্নতির পথে যে পরিমাণ সামাজিক, পারিবারিক ও মানসিক বাধা অতিক্রম করতে হয়, তা অনেক মানুষ দৃশ্যমানভাবে বোঝেন না। নিরাপত্তাহীনতা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, অসম বেতন, হয়রানি, মাতৃত্বকে ‘বাধা’ হিসেবে দেখা এগুলো নারীর পথকে কঠিন করে তোলে। তাই যখন কোনো নারী এ বাধা ভেদ করে সামনে এগিয়ে যান, তা সমাজ বিশেষ কিছু মনে করে।
তবে এ মিথ নারীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে। তাকে সবসময় নিজেকে প্রমাণ করতে হয়, একটি ভুল করলেও মনে করা হয় ‘নারীরা পারে না’। সফল নারীর পথচলা কখনো শুধুই সাফল্যের গল্প নয়; এর সঙ্গে যোগ হয় সমালোচনা, দায়িত্বের চাপ এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াই। অথচ সফল পুরুষ এসব দ্বিধা বা অতিরিক্ত প্রত্যাশার মুখোমুখি হন না।
এ ভুল ধারণা পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিকর। কারণ সাফল্যকে যদি লিঙ্গের ভিত্তিতে দেখা হয়, তাহলে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কমিয়ে দেওয়া হয়। উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং কর্মক্ষেত্রে বৈচিত্র্য বাধাগ্রস্ত হয়। নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতিও বেড়ে যায়, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণেই প্রমাণিত।
তাই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হচ্ছে নারীর সাফল্যকে অস্বাভাবিক নয়, বরং স্বাভাবিক অর্জন হিসেবে দেখা। পরিবারে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং মিডিয়ায় নারীর সাফল্যের সঠিক উপস্থাপন এসবই মিথ ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাছাড়া কথাবার্তায়ও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যেমন- ‘মেয়ে হয়েও এত দূর!’ এ ধরনের বাক্য উচ্চারণ বন্ধ হলেই বোঝা যাবে সমাজ বদলে যাচ্ছে।
যদিও বর্তমান সময়ে নারীরা আর আগের মতো প্রান্তিক অবস্থানে নেই- এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এখনো পূর্ণ সমতা অর্জিত হয়নি ঠিকই, তবে সমাজের বহু ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। তারা বাধা ভেঙে এগোচ্ছেন, নিজের কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠা করছেন এবং প্রজন্মকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিচ্ছেন। এর ফলে সমাজে নারীর সক্ষমতাকে নিয়ে যেসব মিথ দীর্ঘদিন ধরে শক্ত হয়ে ছিল, তা ধীরে ধীরে নরম হচ্ছে, ভাঙছে এবং পুনর্নির্মাণ হচ্ছে নতুন বাস্তবতার আলোকে।
/এসএল
.jpg)