মায়ের চিকিৎসার জন্য নওগাঁ থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে এসেছেন রাশেদুল ইসলাম। গত এক সপ্তাহ ধরে আইসিইউ শয্যার সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষায় আছেন তিনি। সিরিয়াল একটু এগোলেও এখনো তিনি শয্যা পাননি। আক্ষেপ করে বলেন, ‘অপেক্ষা ছাড়া তো আর কিছু করার নেই। অসুস্থ মাকে চিকিৎসকরা আইসিইউতে নিতে বলেছেন। মা অচেতন অবস্থায় আছেন। প্রতিদিন আসছি। সিরিয়াল কত দেখছি। এখন হয় কেউ মারা গেলে কিংবা সুস্থ হলেই আমরা শয্যা পাবো।’
একই অবস্থা সিরাজগঞ্জ থেকে আসা মরিয়ম খাতুনের। তিনি তার বাবার জন্য আইসিইউ শয্যা খুঁজছেন। তার সিরিয়াল নম্বর ২৭। স্ট্রোক করে তারা বাবা এখন এই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন। তবে উন্নত চিকিৎসার জন্য তার আইসিইউ সেবা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘বাবাকে নিয়ে আমরা চিন্তায় আছি। সিরাজগঞ্জ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা নেই। তাই এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখানেও ফাঁকা নেই। অপেক্ষা করছি। প্রতিদিন কথা বলছি। কিন্তু সিরিয়াল তো অনেক। এখন দেখি কতদিনে পাওয়া যায়। যারা সিরিয়ালে আছেন সবার রোগীরই অবস্থা খারাপ। তাই কিছু করারও নেই।’
শুধু রাশেদুল ও মরিয়ম নন, তাদের মতো অসংখ্য রোগীর স্বজনরা রামেক হাসপাতালে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। একদিকে তারা আইসিইউর একটি শয্যার জন্য লড়াই করছেন, অন্যদিকে রাজশাহী বিভাগের জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ৪৪টি আইসিইউ শয্যা পড়ে আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনাকালে চরম সংকট দেখা দেওয়ায় রাজশাহী বিভাগে ৯৪টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যার বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে আইসিইউ চালানোর দক্ষ জনবলের অভাবে রাজশাহী ও বগুড়া ছাড়া বিভাগের অন্য জেলাতে এই সেবা চালু করা যায়নি। এতে ৪৪টি শয্যা অলস পড়ে আছে। অন্যদিকে আইসিইউ সেবা থাকায় বিভাগের সব জেলার রোগী এই দুই জেলায় ভিড় করছেন। এতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে গিয়ে এ দুই জেলার চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন। পাশাপাশি সংকটাপন্ন রোগীরা তাৎক্ষণিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রজেক্টের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের জন্য বরাদ্দ হওয়া ৯৪টি আইসিইউ-এর মধ্যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ৪০টি, বগুড়ার শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে ১০টি, সিরাজগঞ্জে শহিদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ১০টি, জয়পুরহাট জেলা আধুনিক হাসপাতালে ১০টি, বগুড়ার সরকারি মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ৮টি, সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ৬টি দেওয়া হয়।
তবে রামেক ও শজিমেক হাসপাতাল দুটি ছাড়া বাকিগুলোতে আইসিইউ শয্যাগুলো ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে উত্তরাঞ্চলের এই জেলাগুলোর মুমূর্ষু রোগীর চাপ পড়ছে এই দুই হাসপাতালে। ফলে সংকটাপন্ন রোগীরা সিরিয়াল না পেয়ে সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন।
রামেক হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (আইসিইউ) ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘যতদিন পর্যন্ত জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে আইসিইউ সেবা চালু না হবে ততদিন পর্যন্ত আমাদের হাসপাতালে চাপ কমবে না। এটি ২০০ শয্যা করলেও চাপ কমবে না। তাই যত দ্রুত সম্ভব এই অঞ্চলের জেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ চালু করা দরকার।’
সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার শিমুল তালুকদার বলেন, ‘আমাদের যে আইসিইউ শয্যা দেওয়া হয়েছে এগুলোর অবকাঠামো ছিল না। এগুলো ছয় তলায় বসানো হয়েছে। তবে আইসিইউ পরিচালনার জন্য লোকবল নেই। এ জন্য গুরুতর রোগীদের রাজশাহী কিংবা বগুড়ায় চলে যেতে বলি।’
শহিদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জনবল না থাকায় ১০ শয্যার আইসিইউ বন্ধ রয়েছে। যেহেতু আইসিইউ নেই, তাই কিছু আইসিইউ শয্যা কার্ডিওলজি বিভাগে ব্যবহার করছি।’
সার্বিক বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক জাফরুল হোসেন বলেন, রাজশাহী বিভাগে মোট ৯৪টি বেড ও ভেন্টিলেশন বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছিল। তবে এগুলোর মোট ৫০টি চালু করা হয়েছে। বাকিগুলোর মেশিনসহ আনুষঙ্গিক সব কিছু আছে। কিন্তু জনবলের অভাবে চালু করতে পারছি না।
বাংলাদেশ হাসপাতাল সার্ভিসের পরিচালক ডা. মইনুল আহসান বলেন, ইআরপিপি প্রজেক্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে এক্সটেনশন করার চেষ্টা করছি। আর যদি এটি না বাড়ে তবে অন্য কোনো প্রজেক্টের সঙ্গে যোগ করা হবে।