বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) গভীর নলকূপ বরাদ্দ দেওয়ার কথা কৃষকের সেচের জন্য। কিন্তু চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বিএডিসির গভীর নলকূপ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে স্রেফ ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য। সেচের বিষয়টি এখানে একেবারেই গৌণ। নলকূপগুলো এমন জায়গায় বসানো হয়েছে, যা কোনোভাবেই সেচকাজে ব্যবহার উপযোগী নয়। অথচ একেকটি নলকূপ স্থাপনে সরকারের খরচ হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টাকা।
সংস্থাটির ‘চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। নলকূপ ছাড়া খাল খনন, কালভার্ট ও পাাইপের মাধ্যমে সেচব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে প্রকল্পে।
ইতোমধ্যে শতাধিক গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এসব নলকূপ বরাদ্দের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকৃত কৃষিজমিতে গভীর নলকূপ বসানো হলে শুষ্ক মৌসুমে সেখানে চাষাবাদ হতো। কৃষকরা বিষয়টি তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। যারা নলকূপ পেয়েছেন, তারা সবাই বিত্তবান এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বলে জানা গেছে।
খবরের কাগজের এই প্রতিবেদক কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নে অনুসন্ধান করতে গিয়ে অন্তত আটটি গভীর নলকূপের সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো পুরোপুরিই ব্যক্তিগত কাজের জন্য স্থাপন করা হয়েছে। অনুসন্ধানে গভীর নলকূপ স্থাপনে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র চোখে পড়ে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের হাজিরঘোনা এলাকার মো. জসিমের বাড়িতে বসানো হয়েছে বিএডিসির একটি গভীর নলকূপ। হাজার ফুট গভীরের নলকূপের পানি পাইপ দিয়ে নিজের ঘরে নিয়ে প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহার করছেন তিনি।
তার পাশের বাড়ীর শিলখালী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইব্রাহিমের বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছে আরেকটি গভীর নলকূপ। একই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আলীচান মাতবরপাড়ার জারুলবনিয়ার ইবতেদায়ি মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক মৌলভি জাকারিয়ার বাড়িতে বসানো হয়েছে আরও একটি গভীর নলকূপ।
একই ওয়ার্ডের সবুজপাড়ার পানির ছড়া এলাকার মোহাম্মদ জকিরের বাড়িতে বসানো হয়েছে গভীর নলকূপ।
আলীচান মাতবরপাড়ার পরে জারুলবুনিয়ার কাছাকাছি আবদুল কাদেরের খামারবাড়িতে বসানো হয়েছে আরও একটি নলকূপ।
খামারবাড়ির পাশে সারা বছর পানি থাকার কারণে জমির মালিকরা সেখানে ধান চাষ করেন না। সেখানে কচু চাষ হয়। খামারবাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালে ১২ মাসই পানি থাকে।
জারুলবুনিয়া দক্ষিণ জুম ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আসগর আলীর (সাহাদাত হোসেন) বাড়িতে পাহাড়ের ওপর স্থাপন করা হয়েছে আরও একটি নলকূপ।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের পেটান মাতবরপাড়ার আবু তাহেরের ও পহরচান্দা ফাজিল মাদ্রাসার অফিস সহকারী মৌলভি ইব্রাহিমের বাড়িতেও নলকূপ দেখা গেছে। প্রতিটি নলকূপ এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যা আশপাশের মানুষের সেচকাজে ব্যবহারের সুযোগ নেই। প্রতিটি নলকূপের সঙ্গে একটি করে এক হাজার লিটার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন পানির টাংকি দেওয়া হয়েছে। সেসব টাংকিও তারা বাড়িতে নিয়ে গেছেন। শুধু শিলখালী ইউনিয়ন নয়, অন্যান্য এলাকায়ও সেচের নলকূপ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নলকূপ পাওয়া আবদুল কাদের হলেন চেয়ারম্যান কামালের চাচা। জসিমের পরিবারের লোকজন নির্বাচনের সময় কামালের জন্য কাজ করেছেন। তারই পুরস্কার হিসেবে তিনি নলকূপ পেয়েছেন। জানতে চাইলে হাজিঘোনার জসিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘তিনি বর্তমানে নলকূপের পানি বাড়ির কাজে ব্যবহার করলেও যখন প্রয়োজন হবে তখন সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেবেন। নিজেও সেচ দিয়ে জমি চাষ করবেন।’ নলকূপ কার সুপারিশে পেয়েছেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নলকূপ দেওয়ার খবর শুনে তিনি আবেদন করেছেন।’
অপর নলকূপের মালিক মৌলভি ইব্রাহিম নিজের বাড়িতে নলকূপের পানি ব্যবহারের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আগে তাকে দূর থেকে পানি এনে পান করতে হতো। এখন বাড়িতে নলকূপ বসানোর ফলে তাকে আর পানি টানতে হয় না। ভবিষ্যতে এই নলকূপের পানি দিয়ে তিনি কিছু জমিও চাষ করবেন বলে জানান। কীভাবে নিজের বাড়িতে গভীর নলকূপ বরাদ্দ পেলেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বিএডিসির উপসহকারী প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক তার পূর্বপরিচিত।’
জানতে চাইলে বিএডিসির উপসহকারী প্রকৌশলী মোজাম্মেল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সুপারিশে নলকূপগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য গভীর নলকূপ এভাবে বরাদ্দ দেওয়া যায় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নলকূপগুলো ব্যক্তির নামেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে আশপাশের লোকজন ব্যবহার করবে।’ পানির টাংকি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হয়তো নিরাপত্তার স্বার্থে তারা তা বাড়িতে নিয়ে গেছেন।’
জানতে চাইলে শিলখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামাল হোছাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘তিনি তালিকা দিয়েছিলেন এক বছর আগে। তার ইউনিয়ন পরিষদে একটি এবং কয়েকটি বাগানে নলকূপ দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। কারও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য সুপারিশ করেননি। তিনি এখন এলাকায় থাকেন না। তাই এসবের খোঁজখবরও রাখেননি।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, শিলখালী ইউনিয়নের আশপাশে যেসব নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে তার কোনোটিই যথাযথ জায়গায় স্থাপন করা হয়নি। অনেক নলকূপ বসানো হয়েছে এমন জায়গায়, যেখানে জমি নেই বরং পাহাড়ের ঢালু বা কচুখেতের পাশে। যেখানে সারা বছরই স্বাভাবিকভাবে পানি থাকে।
শিলখালীর একাধিক কৃষকের অভিযোগ, প্রকৃত কৃষিজমিতে গভীর নলকূপ বসানো হলে শুষ্ক মৌসুমে সেখানে চাষাবাদ হতো। এখন নলকূপগুলো ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যবহারের জন্য বসানো হয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্ত করে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
একজন কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা জনপ্রতিনিধি, তারা নিজের আত্মীয়দের নামে এসব সুবিধা এনে বাড়িভিটায় বসিয়ে দিয়েছেন। আমাদের জমিতে পানি নেই, আর ওদের রান্নাঘরের পেছনে গভীর নলকূপ বসানো হয়! অথচ গ্রীষ্মে খাল ও নদীতে জোয়ারের মাধ্যমে লবণ-পানি ঢোকে। তা সেচ দিয়ে জমিতে দেওয়ার সুযোগ নেই। তখন তাদের একমাত্র ভরসা গভীর নলকূপ। সেটাও এখন বসতবাড়িতে গেছে। যারা নলকূপ পেয়েছেন, তারা সবাই বিত্তবান এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী।’
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য চট্টগ্রামের কালুরঘাট শিল্প এলাকায় বিএডিসির অফিসে গেলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি। অফিসের অন্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্প পরিচালক অফিসের কাজে ঢাকায় গেছেন। পরে প্রকল্প পরিচালকের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে অফিসে থাকা সহকারী প্রকৌশলী তমাল দাশসহ অন্যরা অনিয়মের বিষয়টি অস্বীকার করেন।