নদী পারাপারে খুলাঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা রূপসা ঘাট। এই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন ৩০-৩৫ হাজার মানুষ পার হয়ে থাকেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, নজরদারির অভাবে এ ঘাট ব্যবহারকারীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জরাজীর্ণ পন্টুন দিয়ে নৌযানে উঠতে গেলে সবার মধ্যে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।
এ ছাড়া ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী ও মালামাল তোলা এখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। পণ্যপরিবহনে ইজারাদারের লোকজন খেয়ালখুশি অনুযায়ী ভাড়া নির্ধারণ করেন। ভুক্তভোগীরা বলেন, এই ঘাটের ইজারা বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি ঘাট পারাপারে তারা ফেরি ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান।
সর্বশেষ ২৩ জুলাই রাতে পূর্ব রূপসা ঘাটে ট্রলার থেকে নদীতে পড়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়। খুলনা শহর থেকে রূপসা নদী পার হওয়ার সময় ট্রলারে অতিরিক্ত যাত্রী থাকায় অন্যদের ধাক্কায় শিশুটি নদীতে পড়ে যায়। এ সময় তার স্বজনরা চিৎকার করলে মাঝি ট্রলারটি দ্রুত পূর্ব রূপসা ঘাটে ভিড়ায়। কিন্তু সেখানে পন্টুনের সঙ্গে ধাক্কায় আরও এক যুবক নদীতে পড়ে যায়। তখন ট্রলারের যাত্রী রায়হান অতিরিক্ত লোক বোঝাই করার প্রতিবাদ করলে ঘাট মাঝিরা একত্রিত হয়ে তাকে মারধর করে। পরে উপস্থিত লোকজন তাকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে ভর্তি করে।
রূপসা ঘাটে কথা হয় স্কুল শিক্ষক মফিজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রূপসা ঘাটে অতিরিক্ত টোল আদায় যাত্রী হয়রানির ঘটনা সীমা ছাড়িয়েছে। ট্রলারগুলোতে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করা হচ্ছে। নদী পারাপারে ঘাট ও নৌকা মিলিয়ে আসা-যাওয়ায় অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়। সেই সঙ্গে টোল আদায়ের নামে নারী ও শিশুদের টানাটানিতে বিব্রতকর অবস্থা তৈরি করে। কোনো মালামাল নিয়ে ঘাট পার হতে গেলে ইচ্ছামতো টাকা দাবি করে ঘাট ইজারাদার। টাকা না দিলে নাজেহাল হতে হয়।
এ পথের যাত্রী আলতাফ হাওলাদার বলেন, ‘রূপসা ঘাটের ট্রলার-মাঝিরা যাত্রীদের এক ধরনের জুলুম করে। ট্রলারে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা হয়। সন্ধ্যার পর কোনো ট্রলারে আলো থাকে না। অধিকাংশ সময় ৩০ জনের জায়গায় ৩৫ থেকে ৪০ জন যাত্রী উঠানো হয়। প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। নদীতে ভাটার সময় পন্টুন যখন অনেক উঁচু হয় তখনো ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীদের পার হতে হয়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রূপসা নদীর দুই পাশের ঘাটে পন্টুন ও গ্যাংওয়ে (একটি সরু পথ যা সাধারণত জাহাজ থেকে টার্মিনালের মধ্যে যাতায়াতে ব্যবহৃত হয়) ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। একাধিক জায়গায় লোহা খসে তৈরি হয়েছে বড় গর্ত। গ্যাংওয়েটি দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে যাতায়াতকারী প্রায় ৩০-৪০ হাজার মানুষ এ ঘাট দিয়ে পারাপার হয়। ঘাটের পন্টুন-গ্যাংওয়ের বেহাল দশা থাকলেও চলতি মাসের শুরুতে হঠাৎ করেই টোল দ্বিগুণ করা হয়। ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে ঘাট ইজারা বাতিল করে ঘাটটি টোলমুক্ত ও ঘাট পারাপারে ফেরি ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান।
ইজারাদারের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ, টোল বৃদ্ধির প্রতিবাদ ও টোলমুক্ত রূপসা ঘাটের দাবিতে সম্প্রতি পূর্ব রূপসা বাসস্ট্যান্ডে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে ঘাট ব্যবহারকারী জনতা। মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, টোল আদায়ের নামে স্বেচ্ছাচারিতা, চাঁদাবাজি ও হয়রানিতে জনগণ অতিষ্ঠ। পন্টুন ও গ্যাংওয়ে মেরামত না করেই খামখেয়ালিভাবে ইজারাদার যখন-তখন টোলের হার দ্বিগুণ করে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে সাধারণ মানুষকেও হয়রানি করা হয়। ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে ব্যস্ততম রূপসা ঘাট টোলমুক্ত করার দাবি জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘাটটির দখল নিয়ে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও বিআইব্লিউটিএর মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। আগে ঘাট থেকে সিটি করপোরেশন বছরে প্রায় ৬৮ লাখ টাকা টোল আদায় করত। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নেয় বিআইডব্লিউটিএ। তারা ৯ মাসে সংস্থার কোষাগারে জমা দেয় মাত্র ১৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। পরে গত ১ জুন ঘাটটির নিয়ন্ত্রণ নেয় জেলা পরিষদ। তারা মাসে মাত্র ৯৭ হাজার টাকায় খাস আদায়ের জন্য এক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়।
সচেতন নাগরিকদের সংগঠন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘খুলনা নগরীতে আসার অন্যতম প্রবেশপথ রূপসা ঘাটে ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। বাগেরহাট, মোংলা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে বাসে করে যাত্রীরা রূপসা ঘাটে নামেন। এরপর তারা ট্রলারে রূপসা নদী পার হয়ে শহরে আসেন। কিন্তু নদীর দুই পাশে ঘাটের পন্টুন ও গ্যাংওয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তারা সেখানে ভোগান্তিতে পড়েন। এখানে নিয়মিত টোল আদায় করা হলেও পন্টুন-গ্যাংওয়ে মেরামতে কেউ উদ্যোগ নেয় না।
বিআইডব্লিউটিএ খুলনার উপপরিচালক মাসুদ পারভেজ খবরের কাগজকে বলেছেন, পরিচালনার দায়িত্বে থাকাকালে ঘাটটির পন্টুন ও গ্যাংওয়ে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঘাটটি বার্ষিক ইজারা দিতে প্রধান কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছি। এতে সরকারের কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব বলেও উল্লেখ করেছি। তবে এখানে কিছু কিছু সমস্যা রয়েছে। ফলে অনেক কিছু করা যাচ্ছে না।