নানান সমস্যা নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে জয়পুরহাটের মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র। দীর্ঘদিন ধরে এখানে ওষুধের কোনো সরবরাহ নেই। নেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো যন্ত্রপাতি। একই সঙ্গে অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সেবার মান একেবারে ভেঙে পড়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের পুরোনো ভবন জরাজীর্ণ হওয়ায় ঝুঁকি নিয়েই চলছে স্বাস্থ্যসেবা। তাই দ্রুত সমস্যাগুলো সমাধান করে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করার দাবি রোগী ও তাদের স্বজনদের। আর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, একাধিক সংকট থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সমস্যাগুলো সমাধান করলে রোগীদের প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
জানা গেছে, মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৭৯ সালে জয়পুরহাট শহরের ধানমন্ডি এলাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয় সরকারি মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র। এটি জয়পুরহাট মাতৃমঙ্গল হাসপাতাল নামেও পরিচিত। হাসপাতালটি এক সময় ব্যাপক সুনাম কুড়ালেও বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে চিকিৎসাসেবায় ধস নেমেছে। প্রায় আট মাস ধরে এখানে ওষুধের কোনো সরবরাহ নেই। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকায় বন্ধ রয়েছে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা। আর জনবল সংকটসহ অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় দুই বছর ধরে এখানে কোনো অপারেশন হয় না। শুধু নরমাল ডেলিভারি করানো হয়। এ ছাড়া পুরোনো ভবনটি জরাজীর্ণ হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। ভবনের অনেক জায়গায় ফাটল ধরেছে। কিছু জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়ছে। এতে রোগীদের পাশাপাশি হাসপাতালে কর্মরতদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত সমস্যাগুলো সমাধানের দাবি রোগীসহ হাসপাতালটিতে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মীদের।
জয়পুরহাট শহরের সাহেবপাড়ার বাসিন্দা আবদুল আলিম বলেন, ‘আমার স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে এসেছিলাম। তিনবার চেকআপ করালাম, কিন্তু একবারও ওষুধ পাইনি। মেশিন না থাকায় আলট্রাসনোগ্রামও করাতে পারিনি। রক্ত পরীক্ষাও করাতে পারিনি। এক কথায় এখানে ল্যাবই নেই। সরকার যদি দৃষ্টি দেয়, তা হলে হাসপাতালটি আবারও জেগে উঠবে।’
আমতলী এলাকার রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘এই হাসপাতালে আগে যে সেবা পাওয়া যেত, এখন তার কিছুই পাওয়া যায় না। আগে ওষুধ পাওয়া যেত, সিজার হতো- এখন কিছুই হয় না। এখানে ওষুধ লিখে দেয়। সেগুলো বাইরে থেকে কিনে নিয়ে আসতে হয়।’
পাঁচবিবির রতনপুর গ্রামের জোবাইদা খাতুন বলেন, ‘আমার ভাতিজি হাসপাতালে ভর্তি আছে। এখানে ভালো কোনো চিকিৎসা পাচ্ছে না। আমরা গরিব মানুষ, বাইরে থেকে ওষুধ কিনে খেতে হচ্ছে। এ ছাড়া ভবনের অবস্থা খুবই খারাপ। মনে হয় কখন যেন ভেঙে পড়বে। ভবনটি নতুন করে তৈরিসহ সব সমস্যা সমাধান করা হলে হাসপাতালটি আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসবে।’
এক রোগীর স্বজন বালিঘাটা গ্রামের আনিছুর রহমান বলেন, ‘মাতৃমঙ্গল হাসপাতালকে জয়পুরহাটে সবাই ভালো হাসপাতাল নামে চিনত। এখন হাসপাতালের নাম থাকলেও সেবার মান একেবারেই খারাপ। এখানে এলেই শুনি কিছুদিনের মধ্যে সব ঠিক হবে। কিন্তু তা আর হয় না। গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালটিকে কেউ গুরুত্ব দেয় না। এটি ভালো করে চালু করা হোক। অন্যথায় বন্ধ করে দেওয়া হোক।’
হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স চম্পা পারভিন বলেন, ‘হাসপাতালে ওষুধ নেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক নেই। এ জন্য সিজারিয়ান সেকশন থেকে রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছে। আগে রোগীরা অনেক ভিড় করলেও এখন আর রোগী তেমন আসে না। এ ছাড়া ভবনের অবস্থা খুব খারাপ। জনবল কম হওয়ায় দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টাফদের অনেক সময় ডাবল ডিউটি (অতিরিক্ত কাজ) করতে হয়। এতে রোগীদের পাশাপাশি হাসপাতালের স্টাফদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।’
হাসপাতালটির মেডিকেল অফিসার ডা. শাহানা পারভীন বলেন, ‘অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক না থাকায় এখানে দেড় বছর ধরে কোনো অপারেশন করতে পারছি না। জনবল সংকটের কারণে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছি না। ওষুধের সরবারহও নেই। যদি এসব সমস্যার সমাধান করা হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি এসব বিষয়ে দৃষ্টি দেয়- তা হলে আমরা আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারব। এক সময় এই প্রতিষ্ঠানটি অনেক গুরুত্ব বহন করত।’