রাজধানীর মৌচাক এলাকায় বেসরকারি সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বেজমেন্টে পার্কিংয়ে থাকা একটি গাড়ির ভেতর থেকে দুজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এখনো ওই দুই ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তবে দুই ব্যক্তির মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারছে না তাদের পরিবার। পরিবার দাবি করছে, ২৫ লাখ টাকার দ্বন্দ্বে তারা খুন হয়েছেন।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. গোলাম ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে পাঠানো হয়েছে। গতকাল স্বজনরা লাশ নিয়ে গেছেন। এখন ২৫ লাখ টাকার দ্বন্দ্বে তারা খুন হয়েছেন, নাকি গাড়ির গ্যাসের কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে; এই সন্দেহকে সামনে রেখে এই ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে।
ওসি আরও জানান, আমরা জানতে পেরেছি আমেরিকা যাওয়ার জন্য এদের একজন একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে টাকা দিয়েছিলেন। এর পেছনে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
২৪ ঘণ্টা পর উদ্ধার হওয়া লাশ পচে যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি একটি ক্লু-লেস মামলা। রহস্য উদঘাটনে মাঠে কাজ করছে পুলিশ। ফোনের কল লিস্ট, সিসিটিভি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
গতকাল সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের মূল গেট থেকে বেশ কয়েক পা হেঁটে বেজমেন্টে ঢুকতে হয়। হাসপাতালের বেজমেন্টে অ্যাম্বুলেন্সসহ বেশ কয়েকটি গাড়ি রয়েছে। অপরিচিত কাউকে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। কয়েকটি পানির কল ও বসার জন্য বেঞ্চ ও ফ্যান রয়েছে সেখানে।
বেজমেন্টে দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ড মোকলেস খবরের কাগজকে বলেন, ২৪ ঘণ্টারও বেশি এখানে পড়ে ছিল সাদা রঙের টয়োটা ফিল্ডার এক্স মডেলের একটি গাড়ি। পরে আমাদের সন্দেহ হয়। পুলিশকে খবর দেই। পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে।
এরা হলেন জাকির হোসেন (২৮) ও মিজানুর রহমান (৪৪)। গত ১১ আগস্ট দুপুরে হাসপাতালের বেজমেন্টে থাকা গাড়িটি থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করে রমনা থানার পুলিশ। নিহতদের বাড়ি নোয়াখালীর চাটখিলে। পরিবারের অভিযোগ, তাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, এখন পর্যন্ত এটি হত্যা বলে প্রমাণ করার মতো কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি।
পুলিশ বলছে, প্রাইভেটকারটি ভাড়ায় চালিত। তারা গত ১০ আগস্ট ভোরে ওই হাসপাতাল থেকে একজন রোগী নিতে ঢাকায় আসেন। পরে গাড়িটি হাসপাতালের বেজমেন্টের পার্কিংয়ের রাখার পর আর বের হয়নি। এমন পরিস্থিতি দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দেয়।
২৫ লাখ টাকা লেনদেনের বিরোধ?
গতকাল ঢামেক হাসপাতালের মর্গে লাশ নিতে এসে স্বজনরা অভিযোগ করেন, এটি পরিকল্পিত হত্যা। এদিকে লাশ দুটির ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে জানিয়েছেন রমনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আওলাদ। তিনি বলেন, লাশ দুটির ময়নাতদন্ত চলছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. কাজী গোলাম মোকলেছুর রহমান খবরের কাগজকে জানান, লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চলছে।
জাকিরের পরিবার জানায়, দুই বছর আগে আমেরিকা যাওয়ার জন্য পল্টনের একটি ট্রাভেল এজেন্সিকে দালালের মাধ্যমে ২৫ লাখ টাকা দেন জাকির। আমেরিকা পাঠাতে ব্যর্থ হলেও এজেন্সি টাকা ফেরত দেয়নি। চলতি মাসের ১০ আগস্ট টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর পরদিনই উদ্ধার হয় জাকির ও তার বন্ধুর লাশ।
জাকিরের বাবা মো. আবু তাহের বলেন, টাকা ফেরতের দাবিতে চাপ দেওয়ায় আগেও জাকিরকে মারধর করা হয়েছিল। তাদের ধারণা, ট্রাভেল এজেন্সি সংশ্লিষ্টরাই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
মিজানুরের ভাগনে জানান, মিজানুর মাছের খামারের ব্যবসা করত, কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না। জাকির প্রাইভেটকার চালাতেন এবং প্রায়ই মিজানুরকে সঙ্গে নিতেন। শনিবার রাতে তারা গাড়ির মালিক ও মালিকের স্ত্রীর ভাইকে (শ্যালক) নিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন। তার শ্যালক সেদিন রাতে বিদেশে গেছেন। পরদিন গ্রামের এক রোগীকে হাসপাতালে দেখে ফেরার কথা ছিল তাদের। এরপর কী ঘটেছে, কেউ জানে না।
গাড়ির মালিক জানান, গত রবিবার ভোরে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক আত্মীয়কে দেখতে আসেন। পরে একা চলে গেলেও চালক জাকির ও মিজান গাড়িতেই ছিলেন।