কুটুনের মন খারাপ। আজ তার পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। গণিতে কুটুন নম্বর কম পেয়েছে। গণিত বুঝতে তার অসুবিধা হয়। অসুবিধা হয় বলে অঙ্ক করতে ভয় পায়। ভয়ে কখনো কখনো সে অঙ্ক না করে পাশে সরিয়ে রেখে দেয়। তাতে তার গণিতে ফলাফল ভালো হয়নি।
কুটুন বসে আছে ঘরের বারান্দায়। মা এসেছেন। কুটুন ইশকুল থেকে ফিরে কিছু খায়নি। হাতমুখ ধুয়ে বারান্দায় চলে এসেছে। মা বললেন, ‘কুটুন, চলো ছাদে যাই। নতুন বাতাস এসেছে।’
মাথা ঘুরিয়ে কুটুন মাকে দেখতে পেয়েছে। মা কুটুনের মাথায় হাত রাখলেন। আচমকা কুটুনের কান্না পেয়ে গেছে। তবে সে কাঁদেনি। তার মনে প্রবল কৌতূহল দেখা দিয়েছে। মা বলেছেন ‘নতুন বাতাস এসেছে’। বাতাস কেমন করে নতুন হয় সে বুঝতে পারছে না। কুটুন উঠে পড়ল। সে মায়ের সঙ্গে ছাদে গিয়ে দাঁড়াল।
মা বললেন, ‘বাতাস বয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছ?’
কুটুন বলল, ‘নতুন বাতাস এসেছে বুঝলে কীভাবে, মা?’
মা বললেন, ‘তুমি যখন ইশকুলে যাচ্ছিলে তখন কি বাতাস এমন ঠাণ্ডা ছিল?’
কুটুন অবাক হয়ে বলল, ‘না মা। তখন গরম লাগছিল। বাতাসে গরম ভাব ছিল।’
মা বললেন, ‘সেই গরম বাতাস চলে গেছে। সেখানে এসে পড়েছে এখন ঠাণ্ডা বাতাস। তাতেই বুঝেছি নতুন বাতাস এসেছে।’
কুটুনের ভালো লাগছে। মা কী সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বললেন নতুন বাতাস এসেছে তা কীভাবে বোঝা গেছে। মায়ের হাতে ফানুস। মা ফানুস গুছিয়ে রাখলেন। ফানুসের ভেতর যেখানে আগুন জ্বালাতে হয়, মা সেখানে আগুন জ্বালিয়েছেন। মা আর কুটুন হাত উঁচু করে ফানুস উড়িয়ে দিল আকাশে। বাতাসে ভেসে ভেসে ফানুস ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে।
মা বললেন, ‘দেখো কুটুন, আমাদের ফানুস উপরে উঠে যাচ্ছে।’
কুটুন বলল, ‘মা, কত উপরে উঠবে এই ফানুস?’
মা বললেন, ‘অনেক উপরে। ওই মেঘেদের কাছে।’
ফানুস দেখতে ছোট হয়ে যাচ্ছে। ফানুস চলে গেছে মেঘের কাছাকাছি।
মা বললেন, ‘তুমি কি জানো কুটুন, ফানুস কেমন করে ওড়ে?’
কুটুন বলল, ‘ফানুসের ভেতর আগুন থাকে। ফানুসে যে আগুন আছে, সেই আগুনের তাপে ফানুসের ভেতরের বাতাস গরম হয়ে হালকা হয়েছে। হালকা বাতাস ফানুসকে উপরের দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’
মা বললেন, ‘ফানুসে যদি আগুনের শিখা না থাকত তা হলে কি ফানুস উড়তে পারত?’
কুটুন বলল, ‘পারত না, মা। ওই আগুন হচ্ছে ফানুসের ওড়ার শক্তি। তা হলে আগুন না থাকলে ফানুস উড়বে কীভাবে!’
নরম গলায় মা বললেন, ‘তোমার মন খারাপ, বাবা!’
গণিতে কম নম্বর পেয়েছে। মাকে বলা হয়নি। কুটুন বলল, ‘হ্যাঁ মা। পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। গণিতে নম্বর কম পেয়েছি। অঙ্কে খুব ভয় পাই।’
মা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। কুটুন তাকিয়েছে আকাশের দিকে। আকাশে ফানুস দেখা যাচ্ছে। মা বললেন, ‘তোমার ভেতরেও ফানুসের মতো আগুনের শিখা আছে। তুমি যাকে বলেছ শক্তি। তোমার ভেতরের সেই আগুন তুমি জ্বালাওনি বলে তোমার মন খারাপ হয়ে যায়।’
কুটুনের মন ভালো হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সত্যি তার ভেতর ফানুসের মতো আগুন আছে। সেই আগুনকে সে কাজে লাগাতে চায়।
মা বললেন, ‘কোনো একদিন অঙ্কের উত্তর মেলেনি বলে তুমি অংক করতে ভয় পাও। তুমি অংকের বই দূরে সরিয়ে রেখেছ। তাতে তোমার ভেতরের আগুনের শিখা নিভে গেছে। তুমি গণিতে ভালো করতে পারছ না।’
নিজের ভেতর শক্তি অনুভব করছে কুটুন। তার বিশ্বাস হচ্ছে সে চেষ্টা করলেই পারবে। মা বলেছেন তার ভেতর আগুনের শিখা আছে। সেই আগুন হচ্ছে শক্তি। নিজের ভেতরের শক্তিকে কাজে লাগাবে।
মাকে জড়িয়ে ধরেছে কুটুন। মা তার ভেতর নিভে যাওয়া আগুনের শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছেন। এখন থেকে সে আর কিছুতেই ভয় পাবে না। ভয় পেলে নিজের ভেতরের আগুনের শিখা নিভে যায়। আগুনের শিখা নিভে গেলে শক্তি ফুরিয়ে যায়।
মা বললেন, ‘আকাশের তারা কখনো হারিয়ে যায় না। শুধু মেঘ তাদের ঢেকে রাখে। তোমার ভেতরের শক্তিও হারিয়ে যায়নি।’
কুটুন মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা তুমি খুব ভালো। আর কোনো দিন আমার মন খারাপ হবে না। আর কোনো কাজে ভয় পাব না।’
মা কুটুনের কাঁধে হাত রাখলেন। মা আর কুটুন দুজনই তাকিয়ে আছে আকাশে ফানুসের দিকে। কুটুনের চোখ পানিতে ভিজে উঠেছে। কুটুন কাঁদছে আনন্দে।