ডাঙ্কা বিলের ধারেই ছিল বড় একটি বাঁশঝাড়। সেই বাঁশঝাড়ে বাস করত অনেক শেয়াল। তাদের মধ্যে বেশ মোটাতাজা এক শেয়াল ছিল সবার গুরু। নাম ছিল মহেশ। তার হুকুমে বাকি শেয়ালরা চলাফেরা করত এবং শিকার ধরে খেত। শেয়ালরা শিকার ধরে গুরুর জন্য কিছু নিয়ে আসত। গুরু বসে বসে সেই খাবার মজা করে খেত আর ঘুমাত। এভাবে আরাম-আয়েশ করতে করতে সে অনেক মোটা আর স্বাস্থ্যবান হয়ে গেল।
মহেশ কখনো পানিতে নামেনি, সাঁতারও জানে না। চলাফেরাও করতে পারে না ভারী শরীর নিয়ে। কিন্তু বাকিদের হুকুম দিতে এবং তাদের ওপরে খবরদারি করতে খুব পটু। এভবেই চলতে থাকে তাদের দিনকাল।
এক সময় বনের খরগোশ, বনমুরগিসহ ছোট প্রাণী বিলুপ্তি হয়ে গেলে শেয়ালরা রাত হলে ডাঙ্কা বিলের চারপাশে ঘুরে ঘুরে কাঁকড়া ধরে খেতে শুরু করে। কাঁকড়া ধরা মোটেই সহজ কাজ না। কাঁকড়া পানিতে থাকে। হঠাৎ করে পানির কিনারে এলে ধরে ফেলতে হয়। সারা দিন অপেক্ষা করে একটা-দুটো কাঁকড়া পাওয়া যায়। সেখান থেকে দু-চারটি আবার মহেশের জন্য নিয়ে যেতে হয়। মাঝে মাঝে খাবার কম হলে মহেশ শেয়ালদের ওপর ক্ষেপে যায়। বকাবকি করে।
এভাবে চলতে চলতে সব শেয়াল অনাহারে-অর্ধাহারে শুকিয়ে যেতে লাগল। একদিন সবাই ডাঙ্কা বিলের ওপারে গিয়ে বড় এক গজার মাছের কাছে মহেশের অত্যাচারের কথা বলল। শুধু কি তাই! গজার মাছের কাছে অনুরোধ করল তাদের সাহায্য করার জন্য।
গজার মাছের মাথা অনেক মোটা আর দাঁতগুলো বড় এবং ধারালো। সব শুনে গজার মাছ বলল, তোমাদের একটি বুদ্ধি দিচ্ছি। সবাই গিয়ে মহেশকে বলবে, রাতে বিলের পানিতে এক জলপরী ভেসে উঠেছিল। সে বলেছে তোমাকে বিলের মোটা মোটা নাদুসনুদুস কাঁকড়া দিয়ে আপ্যায়ন করাবে। তার পর তোমাকে পিঠে তুলে বিলের পানিতে ঘোরাবে।
সবাই মহেশের কাছে গিয়ে সেভাবেই বলল। পরের রাতে সব শেয়াল মহেশকে সঙ্গে নিয়ে ডাঙ্কা বিলের কাছে গেল। মহেশ বিলের কিনারে যেতেই গজার মাছটি ভেসে উঠে বলল, ও মহেশ দাদা, তোমার গুণের কথা শুনে আমি মুগ্ধ।
মহেশ ফিসফিস করে বলে উঠল, এটা তো গজার মাছের মতো লাগছে।
এক শেয়াল বলল, আরে না না! এই জলপরীর অনেক ক্ষমতা। সে একেক সময় একেক রূপ ধারণ করে। আজ গজার মাছের রূপ ধারণ করেছে। সে প্রতিরাতে আমাদের কাঁকড়া ধরে দিয়ে সহযোগিতা করে।
মহেশ বলল, আচ্ছা! ঠিক আছে। জলপরীকে বলো, আমাকে পিঠে তুলে সারা ডাঙ্কা বিল ঘোরাতে।
শুনে এক শেয়াল বলল, ও পরী দিদি, মহেশ দাদাকে পিঠে তুলে একটু বিলটা ঘুরে দেখাও না। ঘোরানো শেষ হলে আমাদের কাঁকড়া ধরে দেবে, যাতে সবাই মিলে মজা করে খেতে পারি।
গজার বলল, বেশ বেশ তাই হবে।
এর পর সে বিলের একেবারে কিনারে গিয়ে পিঠ জাগিয়ে দিয়ে বলল, এবার পিঠে উঠে শক্ত করে আমার গলা ধরে বসো মহেশদা।
মহেশ একলাফে গজার মাছের পিঠে চড়ে শক্ত করে ধরে বসে পড়ে।
এবার গজার মাছ মহেশকে নিয়ে ডাঙ্কা বিলের মাঝে চলে আসে। সেখানে অনেক গজার মাছ থাকে। মহেশকে এক ঝটকায় পিঠ থেকে পানিতে ছুড়ে মারে। শেয়াল মহেশ চিৎকার করে বলতে থাকে, ডুবে গেলাম! ডুবে গেলাম!
গজার বলে, নিরীহদের অত্যাচার করার মজা বোঝাচ্ছি।
এর পর সেখানে থাকা সব গজার মাছ মহেশকে খেতে শুরু করে।