পঞ্চম অধ্যায় : প্রাচীন বাংলার সামাজিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-১
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
অধ্যাপক সুনীল চক্রবর্তী একজন জাত ব্রাহ্মণ। কিছুদিন হলো তিনি মেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র দেখছেন। কিন্তু উপযুক্ত পাত্র পাচ্ছেন না। ঘটক এক ব্যবসায়ী পাত্রের সন্ধান দেন। কিন্তু তিনি খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন পাত্র বৈশ্য গোত্রের। তাই সুনীল চক্রবর্তী ঘটককে না করে দেন এবং ব্রাহ্মণ গোত্রের পাত্র দেখতে বলেন।
ক) বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক হয়েও অন্যান্য ধর্মের প্রতি কারা শ্রদ্ধাশীল ছিলেন? ১
খ) প্রাচীন বাংলায় মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ধারণা দাও। ২
গ) উদ্দীপকে প্রাচীন বাংলার সামাজিক জীবন ব্যবস্থায় কোন দিকটি ফুটে উঠেছে? ব্যাখ্যা করো। ৩
ঘ) ‘উদ্দীপকের সুনীল চক্রবর্তীর মানসিকতার জন্য প্রাচীন আর্থ সমাজ ব্যবস্থা দায়ী’ পাঠ্যবইয়ের আলোকে উক্তিটির সত্যতা নিরূপণ করো। ৪
উত্তর: ক) বৌদ্ধধর্মের প্রসারকালীন সময়ে মৌর্য সম্রাট অশোক ছিলেন বৌদ্ধধর্মের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। যদিও তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তবু তিনি অন্যান্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তার শাসনামলে তিনি ধর্মের প্রচার ও সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেন। তার শিলালিপিতে দেখা যায়, তিনি অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাদের আচার-অনুষ্ঠানকে সম্মান করেছিলেন।
খ) প্রাচীন বাংলার মানুষের খাদ্যাভ্যাস বৈচিত্র্যময় ছিল এবং তা তৎকালীন পরিবেশ ও কৃষিনির্ভর জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। বাংলার উর্বর ভূমি কৃষিজ ফসলের জন্য উপযুক্ত ছিল এবং তখানকার মানুষের প্রধান খাদ্য ছিল ভাত। এ অঞ্চলে ধান উৎপাদন হওয়ায় ভাত মানুষের প্রধান খাবার হয়ে ওঠে। ভাতের পাশাপাশি মাছ প্রাচীন বাংলার মানুষের খাদ্যতালিকার অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল। নদীমাতৃক বাংলায় মাছ সহজলভ্য হওয়ায় এটি সাধারণ মানুষের প্রিয় খাদ্য হয়ে ওঠে। ইলিশ, শুঁটকি এবং বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ তাদের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মাংসও প্রাচীন বাংলার খাদ্যাভ্যাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছিল। গরু, ছাগল, মুরগির মাংসও তারা খেত। সবজি ও ফলের মধ্যে শাক, কচু, কুমড়া, বেগুন ইত্যাদি প্রচলিত ছিল। এ ছাড়া স্থানীয় গাছের ফল খাওয়ার প্রচলন ছিল।
দুধ এবং দুগ্ধজাত খাবার যেমন- দই, ঘি ইত্যাদি বাংলার মানুষের খাদ্যতালিকায় ছিল। মধু, তিলের তেল এবং নারকেলের তেল ব্যবহৃত হতো রান্নায়। মসলাযুক্ত খাবার তৈরিতে আদা, রসুন, হলুদ, মরিচের ব্যবহার ছিল। খাবার শেষে পান চিবানোর রীতি ছিল, যা আজও প্রচলিত।
এই খাদ্যাভ্যাস বাংলার জলবায়ু, ভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং তা সমাজের ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক অবস্থার পরিচায়ক।
গ) উদ্দীপকে প্রাচীন বাংলার সামাজিক জীবনে জাতপাত বা গোত্রভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের প্রভাব ফুটে উঠেছে। সুনীল চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ গোত্রের মানুষ হিসেবে নিজের মেয়ের জন্য একই গোত্রের পাত্র খুঁজছেন। বৈশ্য গোত্রের পাত্র উপযুক্ত হলেও কেবল গোত্রভেদের কারণে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রাচীন বাংলার সমাজে জাতপাত এবং গোত্রভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সমাজে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র এই চারটি প্রধান শ্রেণি ছিল। এর মধ্যে ব্রাহ্মণদের উচ্চ মর্যাদা দেওয়া হতো এবং তারা সমাজে ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিকভাবে নেতৃত্ব দিতেন। বৈশ্যরা মূলত ব্যবসায়ী এবং কৃষি কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুললেও সামাজিক মর্যাদায় ব্রাহ্মণদের থেকে নিম্নে স্থান দেওয়া হতো।
এই শ্রেণিবিন্যাস মানুষের ব্যক্তিগত জীবন এবং সম্পর্কেও গভীর প্রভাব ফেলত। বিয়ের মতো সামাজিক সম্পর্কও গোত্র বা জাতপাতের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। উদ্দীপকে সুনীল চক্রবর্তীর সিদ্ধান্ত প্রাচীন বাংলার সমাজে এই জাতপাতভিত্তিক ব্যবস্থার প্রতিফলন।
ঘ) উক্তিটি সত্য বলে প্রমাণিত হয়। কারণ, প্রাচীন বাংলার আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণরা জাতপাত এবং শ্রেণিবিন্যাসকে প্রাধান্য দিত। ব্রাহ্মণরা তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থানকে রক্ষা করার জন্য গোত্র বা জাতি অনুযায়ী সম্পর্ক স্থাপন করতেন। এই মানসিকতা প্রাচীন সমাজের আর্থিক এবং ধর্মীয় কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ছিল।
প্রাচীন বাংলার সমাজে জাতপাতভিত্তিক ভেদাভেদ শুধু সামাজিক নয়, আর্থিক অবস্থানেও প্রভাব ফেলত। ব্রাহ্মণরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করতেন এবং তাদের ওপর উচ্চ শ্রেণির মর্যাদা আরোপিত ছিল। বৈশ্যরা ব্যবসা ও কৃষিতে নিযুক্ত থাকলেও তাদের অবস্থান ব্রাহ্মণদের থেকে নিচে ছিল। এই প্রথা শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়, বাংলার সামগ্রিক সমাজ ব্যবস্থায়ও গভীর ছাপ ফেলেছিল।
সুনীল চক্রবর্তীর মানসিকতা তৎকালীন প্রাচীন সামাজিক কাঠামোরই প্রতিফলন। তিনি গোত্রভেদকে এতটাই প্রাধান্য দিয়েছেন যে, উপযুক্ত পাত্র হওয়া সত্ত্বেও বৈশ্য গোত্রের কারণে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কাজেই এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, প্রাচীন বাংলার সমাজে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে জাতপাতের গুরুত্ব ছিল বেশি। তবে এই মানসিকতা আধুনিক সমাজের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য আধুনিক সমাজের অগ্রগতির পথে বড় অন্তরায়। তাই এই মনোভাব পরিবর্তন করে সাম্যের দিকে অগ্রসর হওয়া উচিত।
লেখক : সহকারী শিক্ষক
সাভার অধরচন্দ্র সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
কবীর