ভাবসম্প্রসারণ
জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো
ভাবসম্প্রসারণ: মানুষের সম্মান ও মর্যাদা তার জন্মের দ্বারা নির্ণীত হয় না; বরং তার কর্মের দ্বারাই নির্ণীত হয়। তাই তথাকথিত নিম্নজাতের মানুষ কর্মের দ্বারা সম্মান, মর্যাদা ও গৌরবের অধিকারী হতে পারেন।
পৃথিবীতে মানুষ নানা জাতি, উপজাতি, ধর্ম-বর্ণ ও গোষ্ঠী-গোত্রে বিভক্ত। মনুষ্যসৃষ্ট এ বিভাজন-রীতির কারণে এখানে একশ্রেণির মানুষকে উচ্চ শ্রেণির বা উচ্চ জাতের মানুষরূপে বিবেচনা করা হয়, আর অন্য শ্রেণির মানুষদের নিম্নজাতের মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয়। ধারণা করা হয়, তথাকথিত উচ্চ জাতের মানুষ জন্মগতভাবেই মর্যাদার অধিকারী। আর নিম্নজাতের মানুষ সম্মান ও মর্যাদাহীন। কিন্তু এ ধারণা সর্বাংশে ভুল। কারণ মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তার কর্মের জন্য, জন্মের জন্য নয়। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা তথাকথিত নিম্ন বংশে জন্মগ্রহণ করেও পৃথিবীতে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন। কারণ তারা নিজের কর্মের মাধ্যমে নিজের ও বিশ্ববাসীর কল্যাণ সাধনে সদা প্রস্তুত। কর্মের জন্য তারা জগদ্বাসীর কাছে সমাদৃত হন। মানুষ তাদের মান্য করে এবং মর্যাদা দেয়। বংশ-গৌরবের অমর্যাদা তাদের কর্মের কাছে পদানত। কবি কাজী নজরুল ইসলামের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তিনি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে পৃথিবীতে অমর হয়ে আছেন। আবার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া বাঙালি নারী শিক্ষার ব্যাপারে যে অবদান রেখেছেন তা অতুলনীয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন- শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ফুটবলার ম্যারাডোনা ছিলেন এক সাধারণ দিনমজুরের ছেলে; আর্জেন্টনার রাজধানী বুয়েন্স আইরেসের এক অখ্যাত বস্তিতে তার জন্ম। দার্শনিক ফ্লিয়নথাসের বাবা ছিলেন বাগানের মালী। মক্কাবিজয়ী মুসলিম সেনাপতি জায়েদ ছিলেন এক ক্রীতদাসের ছেলে। কিন্তু উল্লিখিত মনীষীদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে কৃতিত্ব ও সম্মান অর্জনের জন্য বংশগৌরবহীনতা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি। অন্যদিকে উচ্চ বংশে কিংবা ধনীর ঘরে জন্ম নেওয়া অনেক মানুষই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছেন। কারণ, উচ্চ বংশে জন্ম নিলেও তারা নিজের ও জগদ্বাসীর কল্যাণে কিছুই করতে পারেননি।
পৃথিবীতে মানুষকে কর্মের সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। কারণ পৃথিবীতে বংশ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ নয়, করিৎকর্মা ও সৎকর্মশীল মানুষই বেশি সমাদৃত হন।
আরো পড়ুন : ৩টি ভাবসম্প্রসারণ লিখন, ৪র্থ পর্ব
অন্যায় সে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে
ভাবসম্প্রসারণ: অন্যায়কারী এবং অন্যায় সহ্যকারী উভয়েই সম অপরাধে অপরাধী। সময়ের ব্যবধানে তাদের ধ্বংস অনিবার্য।
ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় মানুষের আচরণগত বিপরীতধর্মী দুটি দিক। কেউ কেউ ব্যক্তি বা সমাজ জীবনের বৃহত্তম কল্যাণ ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ভালো ও ন্যায় কাজ করে, আবার কেউ কেউ বিপরীতমুখী হয়। বস্তুত আমাদের সমাজে অন্যায়প্রবণ মানুষ সংখ্যায় কম হলেও তারা বৃহত্তর সুশীল সমাজকে জিম্মি করে রাখে। তারা অন্যকে অহেতুক উৎপীড়ন করে, অন্যের অধিকারে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করে, উচ্ছৃখল আচরণে সামাজিক শৃঙ্খলা নস্যাৎ করে। এরা সমাজের চোখে অন্যায়কারী এবং আইনের চোখে অপরাধী। এদের অপরাধ অবশ্যই দণ্ডনীয়। কিন্তু মানুষ বিবেকবান হিসেবে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকারী হলেও অনেক সময় নানা কারণে তারা দিনের পর দিন অন্যায় সহ্য করে যায়। এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সৎ সাহস তাদের থাকে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের এ প্রতিবাদহীন নির্লিপ্ততা প্রকারান্তরে অন্যায়কারীকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। দিন দিন বাড়ে অন্যায়কারীর শক্তি-সাহস। তখন সাধারণ মানুষ মেরুদণ্ডহীনের মতো মুখ বুজে থাকতে বাধ্য হয়। জগতের শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ বিধাতার প্রতিনিধিরূপে ন্যায়-অন্যায় মূল্যায়নের মাধ্যমে অন্যায় কাজ ও অন্যায় চিন্তা থেকে বিরত থাকবে। ক্ষমাশীলতা মানুষের একটি মহৎ গুণ। কিন্তু ক্ষমারও একটা বিশেষ সীমা থাকা প্রয়োজন। অন্যায়কারীকে ক্ষমা করার মাঝে কোনো মহত্ত্ব নেই। নেই কোনো কৃতিত্ব। যারা এদের ক্রমাগত ক্ষমা করে, প্রশ্রয় দেয় তাদের অপরাধও কম নয়। কেননা অন্যায়কারীর মতোই অন্যায়কে প্রশ্রয়দানকারীও সমান অপরাধে অপরাধী। তাই মনীষী গ্যাটে বলেন, ‘যখন তোমার পাশে কোনো অন্যায়- অবিচার সংঘটিত হয়, তুমি যদি সেই অন্যায়ের বিরোধিতা না করো, তাহলে তুমি তোমার কর্তব্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে।’ হজরত মুহাম্মদ (সা.) কখনোই অন্যায় সহ্য করেননি। তিনি কাফেরদের অন্যায়ের প্রতিরোধে পাহাড়ের মতো কঠিন ছিলেন। তাই তো তিনি বলেছেন, ‘কারও অন্যায় করা দেখলে প্রথমে তাকে হাত দিয়ে বাধা দাও, সম্ভব না হলে তাকে মুখ দিয়ে বাধা দাও, তাও সম্ভব না হলেও তাকে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করো। তবে এটি (তৃতীয় ধাপটি) নিম্নস্তরের ঈমানের পরিচয় হবে।’
মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয়
আড়ালে তার সূর্য হাসে
ভাবসম্প্রসারণ: অবিরাম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নানা বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে মানুষকে অগ্রসর হতে হয়। মেঘাচ্ছন্ন আকাশে মেঘের অন্তরালে সূর্য ঢাকা পড়লে তাতে বিব্রত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এটা ক্ষণিক বাধা ছাড়া আর কিছুই নয়।
মানুষের জীবন হলো সুখ ও দুঃখ দিয়ে গাঁথা এক বিচিত্র মালার মতো। নিরবচ্ছিন্ন সুখ কিংবা দুঃখ কোনো মানুষের জীবনে স্থায়ী হয় না। মানুষের জীবনে যখন দুঃখের অমারাত্রি, দুঃখ-বেদনা আসে তখন অসহ্য বোধ হয়। মনে হয় সে দুঃখ-রজনির বুঝি শেষ নেই। কিন্তু অবশেষে তার দুঃখ-বেদনার অমারাত্রির অবসান হয়। পূর্ব দিগন্তে উদিত হয় সুখের সূর্য। কিন্তু সে সুখও তার ভাগ্যে চিরস্থায়ী হতে পারে না। নদীর জোয়ার ভাটার মতো তার জীবনে আবার আসবে দুঃখ, দুঃখের পর সুখ। কখনো কখনো আবার মানুষের জীবনের আকাশে জমাট বাঁধে দুঃখ এবং আপদ-বিপদের ঘন কালো মেঘ। মাথার ওপর ভেঙে পড়ে ঝড়ঝঞ্ঝা-বজ্রপাত। অসহায় মানুষ সে ঘোর বিপদের কালো মেঘ দেখে ভয়ে বিহ্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই ঝটিকাসংকুল ভয়াল অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তার সুখের সূর্য। অচিরে সেই কালো মেঘ কেটে গিয়ে দেখা যায় সূর্যের মুখ। বিপদ কেটে গিয়ে দেখা দেয় নতুন সূর্যোদয়। কাজেই দুঃখ-কষ্ট, বিপদ সাময়িক। তা দেখে মানুষের ভয় পাওয়া বা বেদনায় ভেঙে পড়া উচিত নয়। ইতিহাস সাক্ষী ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি জাতি পাকিস্তানিদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করলেও পরে বাংলাদেশ ঠিকই স্বাধীনতা অর্জন করে।
মানুষের পার্থিব জীবন সংঘাতপূর্ণ, কিন্তু তথাপিও এখানে হতাশ হওয়ার কিছু নেই; বরং ধৈর্য না হারিয়ে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যেতে পারলেই মানুষের জীবন হয়ে উঠবে সার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (বাংলা)
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা
কবীর