ভাবসম্প্রসারণ
জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে,
চিরস্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন নদে?
ভাবসম্প্রসারণ: মানুষ মরণশীল। মানুষ অমর নয়। একদিন সবাইকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।
মৃত্যুই জীবনের অনিবার্য পরিণতি। মৃত্যুকে ঠেকানোর ক্ষমতা কোনো মানুষের নেই। মহান আল্লাহ কোরআনে বলেন, “কুল্লু নাফসিন জাইকাতুল মাউত” (সুরা আল ইমরান, আয়াত: ১৮৫) অর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মানবজীবন নদীর জলের মতো প্রবহমান। নদীর জোয়ার-ভাটার মতো মানুষের জীবনেও সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতন আছে। জাগতিক নিয়মেই জীবন চলে। এটাই প্রকৃতির বিধান। তাই মৃত্যুকে অযথা ভয় পাওয়ার কিছু নেই; বরং এই সত্যকে মেনে নিয়ে মানবজীবনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কর্মগুণে সমাজ-সভ্যতায় নিজের কীর্তির চিহ্ন রেখে যেতে হবে। নিষ্ফল জীবনের অধিকারী মানুষকে কেউ মনে রাখে না। কিন্তু কৃতী লোকের গৌরব জীবনের সীমা অতিক্রম করে তাকে অমরত্ব দেয়। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো অনেকেই সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে এ নশ্বর পৃথিবীতেও মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসার পাত্র হয়ে থাকতে চান।
মানুষের শরীরের মৃত্যু হয়। কিন্তু তার জীবনের পুণ্যকর্ম পৃথিবীতে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে। নশ্বর মৃত্যুও মানুষের জীবনে তখন অবিনশ্বর হয়ে ওঠে।
আরো পড়ুন : একতাই বল বিষয়ক ভাবসম্প্রসারণ লিখন, ২য় পর্ব
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।
ভাবসম্প্রসারণ: নিজের মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পৃথিবীতে কোনো দেশের মানুষকে বাঙালির মতো বুকের রক্ত দিতে হয়নি। ভাষাশহিদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পেয়েছি। তাই তো বাঙালির শোকের, ব্যথার ও আনন্দের এই একুশে ফেব্রুয়ারিকে কোনো মানুষের পক্ষে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।
পৃথিবীর সব দেশেরই জাতীয় জীবনে এমন দু-একটি দিন আসে যা স্বমহিমায় উজ্জ্বল। আমাদের জাতীয় জীবনে এমনি স্মৃতিবিজড়িত মহিমা-উজ্জ্বল একটি দিন একুশে ফেব্রুয়ারি। সারা বিশ্বের বাংলাভাষীদের কাছে এ দিনটি চির স্মরণীয়। একুশে ফেব্রুয়ারির ইতিহাস একদিকে বেদনার, অন্যদিকে আনন্দের। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা বাঙালির মুখ থেকে বাংলা ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল ১৯৪৮ সালে। বাংলার মানুষ সে অন্যায় মেনে নেয়নি। বাংলার দামাল ছেলেরা তুমুল বিরোধিতা করে রাজপথে নেমে আসে। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে বাংলার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে। স্বৈরাচারী পাক-সরকার আন্দোলন দমনের জন্য শুরু করে গ্রেপ্তার, জুলুম, নির্যাতন। এতেও বাংলার দুরন্ত ছেলেদের দমাতে না পেরে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তাদের মিছিলে নির্মমভাবে গুলি বর্ষণ করে। এতে রফিক, শফিক, বরকত, জব্বার, আব্দুস সালামসহ অনেকের রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়। ফলে বাংলা ভাষা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। আবার এই একুশে ফেব্রুয়ারিকে সম্মানের সঙ্গে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ অধিবেশনে ‘International Mother Language Day’ বা ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
যে কারণে একুশে ফেব্রুয়ারির জন্ম হলো তার ইতিহাস যেন আমরা ভুলে না যাই। সমগ্র বাঙালির চেতনায় চিরস্মরণীয় এ সব ভাষাশহিদদের নাম যেন হৃদয়ে গেঁথে রাখি। সত্যি কথা বলতে তাদের ঋণ আমরা কোনোদিন ভুলতে পারব না।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (বাংলা)
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা
কবীর