গল্প : বিলাসী
প্রশ্ন: বিলাসী গল্পের মূলভাব লেখ।
উত্তর: মূলভাব: ভারতীয় বাঙালি সমাজে বিংশ শতাব্দীতেও প্রগতি কিংবা সুশিক্ষার প্রচার-প্রসার হয়নি তার প্রমাণ ‘বিলাসী’ গল্পটি। কারণ এ গল্পে জাতিভেদ প্রথায় আক্রান্ত সনাতন হিন্দু সমাজে যে নির্মমতা, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা, মূর্খতা দেখা যায়; তার তুলনায় তখনকার ইউরোপ-আমেরিকায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বিশ্বের দেশে-দেশে তখন জাতীয় জাগরণ, স্বাধীনতা সংগ্রাম, শ্রমিক শ্রেণির উজ্জীবন ঘটছিল। অথচ সে সময় ভারতীয় বাঙালি সমাজ অন্নপাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে ব্যস্ত! এভাবেই সমাজের, রাষ্ট্রের পিছিয়ে থাকার, পরিবর্তনহীনতার চিত্র ‘বিলাসী’ গল্পের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সেকালে চার-ক্রোশ হাঁটা বিদ্যার তেজে যারা গ্রামের মোড়ল বা মাথা হতেন তাদেরই একজন মৃত্যুঞ্জয়ের খুড়া বা চাচা। মৃত্যুঞ্জয়ের আপনজন কেউ না থাকায় খুড়া লোলুপ দৃষ্টি দিয়েছিলেন মৃত্যুঞ্জয়ের বিশাল সম্পত্তির ওপর। খুড়ার ষড়যন্ত্রেই সমাজে মৃত্যুঞ্জয়কে একঘরে হয়ে থাকতে হয়েছিল। নিঃসঙ্গ মৃত্যুঞ্জয় অসুখে মৃতপ্রায় হলে সমাজের কেউ এগিয়ে আসেনি। উচ্চবর্ণের কায়স্থ মৃত্যুঞ্জয়কে বাঁচাতে এগিয়ে আসে অনেক দূরের মালোপাড়ার এক বৃদ্ধ মালো ও তার মেয়ে বিলাসী। তিল তিল সেবায় বিলাসী মৃত্যুঞ্জয়কে বাঁচিয়ে তুললে মৃত্যুঞ্জয় তার সেবার প্রতিদান দিয়েছিল তাকে বিয়ে করে। এমন একটি মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে সে সময় বিলাসীর ভালোবাসার চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই ছিল না। কিন্তু সমাজ দেখল অনেক বড় পাপ ঘটে গেছে, আর সে পাপ প্রায়শ্চিত্তহীন ‘অন্নপাপ’। এ পাপে মৃত্যুঞ্জয় সমাজের কাছে দোষী হলে দোষের শাস্তি পেতে হয় বিলাসীকে। বাঙালি সমাজ জানে যার গায়ে জোর নেই তার গায়েই হাত তোলা যায়। গ্রামবাসী খুড়ার নেতৃত্বে বিলাসীকে নির্মম প্রহার করে মৃত্যুঞ্জয়ের বাড়ি থেকে বিতাড়িত করলে মৃত্যুঞ্জয় তার ২০-২৫ বিঘা সম্পত্তির মমতা করেনি; বরং সে তার জীবন সঁপে দিয়েছিল বিলাসীর ভালোবাসা, জীবন ও সমাজ-সংস্কৃতির কাছে। সাপুড়ে জীবন গ্রহণ করে সুখে থাকা মৃত্যুঞ্জয়-বিলাসীকে সহ্য করতে পারেনি অন্নপাপের সংস্কারাচ্ছন্ন বাঙালি সমাজ। সাপের কামড়ে মৃত্যুঞ্জয় মারা গেলেও গ্রামবাসী ভেবেছে অন্নপাপের কারণেই সে মারা গেছে। এমনি রোগাক্রান্ত, ঘুণেধরা মৃতপ্রায় সমাজকে যারা ভৌতিক-অলৌকিক শাস্ত্রের বিধিবিধানে যুগ যুগ ধরে টিকিয়ে রেখেছে, তারা তেলাপোকার মতো টিকে থাকতেই গর্বিত। ফলে অধর্ম-অপদেবতার বিধানে অজ্ঞতার ঘন অন্ধকার ভেদ করে ভারতীয় বাঙালি সমাজে তখনো মানবমুক্তির আলো পৌঁছায়নি। তাই এ গল্প শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্বাভাবিক বর্ণনাভঙ্গিতে সমাজকে ব্যঙ্গের খোঁচায় রক্তাক্ত করার এক নীরব প্রতিবাদ। একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় বাঙালি সমাজ এখনো বিবাহকে বৈদিক মন্ত্রের চুক্তি বলেই মনে করে। যে সমাজে মানুষের মনের চেয়ে, বিবেকের চেয়ে, মানবিকতার চেয়ে অন্ধ ধার্মিকতা, মনগড়া কুসংস্কারাচ্ছন্নতা এবং মূর্খতার প্রাধান্য থাকে; সে সমাজ তেলাপোকার মতো টিকে থাকতেই সন্তুষ্ট থাকবে। মৃত্যুঞ্জয়-বিলাসী এ গল্পে জাতিভেদ প্রথার বিপরীতে দাঁড়িয়ে পরাজিত হলেও অল্প বিদ্যায় অন্যদের মতো ভয়ংকর হয়ে ওঠেনি। মৃত্যুঞ্জয়-বিলাসী বিরুদ্ধ সমাজ-ব্যবস্থার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে আত্মদান করে অনন্য এক মানবিক মানুষের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
কবীর