গল্প : বিলাসী
(২২ ডিসেম্বর প্রকাশের পর)
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: ‘এমন করে মানুষ ঠকায়ো না’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘বিলাসী’ গল্পের ওপরের উক্তিতে সাপুড়েদের লোক-ঠকানো শিকড় বিক্রির ব্যবসা আর না করতে মৃত্যুঞ্জয়কে উদ্দেশ্য করে এ কথা বিলাসীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল।
বিলাসী জানত সাপ ধরার কাজটি ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ। স্বামী মৃত্যুঞ্জয়কে এ কাজে সে নানাভাবে বাধা দিয়েছিল। তা ছাড়া এ কাজে প্রতারণা ছিল; সাপুড়েদের শিকড় বিক্রির ব্যবসাটি সম্পূর্ণ লোক-ঠকানো। শিকড় দেখে সাপ কখনো পালায় না। বিলাসী মৃত্যুঞ্জয়কে নিষেধ করেছিল এ কাজ না করতে। কারণ তাদের সংসারে অভাব ছিল না। বিলাসী সৎ মানসিকতার অধিকারী হওয়ায় স্বামীকে লোক-ঠকানো শিকড় বিক্রি পেশা তথা সাপ ধরা থেকেই বিরত রাখতে চেয়েছিল।
প্রশ্ন: ‘বিষহরির দোহাই বুঝি-বা আর খাটে না।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘বিলাসী’ গল্পের ওপরের উক্তিতে সাপের কামড়ে মৃত্যুঞ্জয় মুমূর্ষু দশায় উপনীত হলে কোনো তন্ত্রমন্ত্রে যে তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হচ্ছিল না, সেটি বোঝাতেই এ কথা বলা হয়েছে।
সাপ ধরার জন্য মনসা দেবীর মন্ত্র, বিভিন্ন গাছের শিকড়, মাদুলি-কবজ প্রভৃতির ব্যবহার হতো। গোখরা সাপের কামড়ে মুমূর্ষু মৃত্যুঞ্জয়কে বাঁচাতে এসব কিছুর প্রয়োগ করা হয়। এসব যে অর্থহীন, লোক-দেখানো, ভণ্ডামি, মৃত্যুঞ্জয় বমি করার পরেই তা প্রমাণিত হয়। মনসা দেবীর নামে মন্ত্রতন্ত্র বা বিষহরির আজ্ঞায় মৃত্যুঞ্জয়কে সাপের বিষ থেকে বাঁচানো যায়নি। সাপুড়েদের কর্মকাণ্ড যে এক প্রকার প্রতারণামূলক পেশা, অবৈজ্ঞানিক, বাস্তবতাহীন, ‘বিলাসী’ গল্পে মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু সেটিই প্রমাণ করে।
আরো পড়ুন : বিলাসী গল্পের ৪টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৬ষ্ঠ পর্ব, এইচএসসি পরীক্ষার বাংলা ১ম পত্র
প্রশ্ন: ‘সাপের বিষ যে বাঙালির বিষ নয় তাহা আমিও বুঝিয়াছিলাম।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘বিলাসী’ গল্পের ওপরের উক্তিতে সাপের বিষের ভয়াবহতা আর বাঙালির কথার অকার্যকারিতা প্রসঙ্গে ন্যাড়ার কণ্ঠে এ ব্যঙ্গাত্মক অনুভূতি ব্যক্ত হয়েছে।
মৃত্যুঞ্জয় সাপের কামড়ে মারা গেলে ন্যাড়ার সাপ ধরার শখ চিরতরে মিটে যায়। কারণ বাঙালির মুখের কথার মতো সাপের বিষ অর্থহীন নয়, অর্থাৎ ওসব তন্ত্রমন্ত্র, বিষহরির আজ্ঞা, তাবিজ-কবজ দিয়ে সাপের বিষ নামানো যায় না। মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যুতে ন্যাড়া কঠিন বাস্তবতা অনুভব করে। সাপের বিষ যার গায়ে একবার প্রবেশ করেছে সে বুঝেছে, বিষহরির অর্থহীন কথায় সে বিষ নামানো সম্ভব না। বাঙালির কুসংস্কারাচ্ছন্ন, আচার-প্রথাসর্বস্ব জীবনকে ব্যঙ্গ করে গল্প-কথক ন্যাড়া বাঙালি-জীবনের অর্থহীন আস্ফালনকে এভাবে প্রকাশ করেছেন।
প্রশ্ন: ‘অন্নপাপ। বাপ রে! এর কি আর প্রায়শ্চিত্ত আছে।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘বিলাসী’ গল্পে মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যুর কারণ যে প্রায়শ্চিত্তহীন অন্নপাপ, খুড়া এবং গ্রামবাসীর অনুভূতিতে সে কথাই ব্যক্ত হয়েছে।
কায়স্থ মৃত্যুঞ্জয় ছোট জাতের বিলাসীকে বিয়ে করেছিল, এমনকি তার হাতে ভাত পর্যন্ত খেয়েছিল। সনাতন হিন্দু-সংস্কারে এ ঘটনা অন্নপাপ, যার ক্ষমা হয় না। তাই মৃত্যুঞ্জয় সাপের কামড়ে মারা গেলে গ্রামের মানুষ আক্ষেপ করেনি, অবাক হয়নি; কারণ তারা যেন জানতই এমন ফল হবেই! তাদের বিশ্বাসে সাপের কামড় উপলক্ষ মাত্র; মৃত্যুঞ্জয় মারা গেছে প্রায়শ্চিত্তহীন অন্নপাপে। অল্পবিদ্যার ভয়ংকর প্রভাব আর কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের রুগ্ণদশা সেকালে দূর করার সাধ্য যে কারও ছিল না, উল্লিখিত উক্তিতে তারই প্রমাণ মেলে।
প্রশ্ন: ‘তাহার হৃদয় জয় করিয়া দখল করার আনন্দটাও তুচ্ছ নয়, সে সম্পদও অকিঞ্চৎকর নহে।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘বিলাসী’ গল্পের ওপরের উক্তিতে নিম্নবর্ণের বিলাসী কর্তৃক কায়স্থ মৃত্যুঞ্জয়ের হৃদয়-জয় করার তাৎপর্য প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে।
সেকালের সনাতন হিন্দুসমাজ জাতিভেদ প্রথায় অমানবিক এক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। মানবিকচেতনার কোনো মূল্য সেখানে ছিল না। ‘বিলাসী’ গল্পে সাপুড়ে বিলাসী কায়স্থ-নিঃসঙ্গ-একঘরে মৃত্যুঞ্জয়কে সেবা-যত্নে অসুখ থেকে সারিয়ে তোলে। মৃত্যুঞ্জয় বুঝেছিল বিলাসী-ই তার প্রকৃত জীবনসঙ্গী হতে পারে। তাই জাতিভেদ ভুলে মৃত্যুঞ্জয় তাকে বিয়ে করলে গ্রামের লোক এ বিয়ে মানতে পারেনি। কুসংস্কারে বন্দি গ্রামবাসীর কাছে বিলাসীর সেবা কিংবা হৃদয়ধর্মের কোনো গুরুত্বই ছিল না। বিয়ে যে সমাজে কেবল একটি শাস্ত্রীয় চুক্তিমাত্র, সে সমাজ মৃত্যুঞ্জয়-বিলাসীর পরস্পরের হৃদয়জয়কে সামান্য মূল্যও দিতে পারার অনুভূতি বা যোগ্যতা অর্জন করেনি।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ, ঢাকা
কবীর