এয়োদশ পর্ব
বাইরে কোথায় গেছে?
স্যার! স্যার!
তুমি জানো না? এই তো!
জি জি স্যার!
তোমার কাছে আর কোনো নম্বর নেই?
জি না স্যার! আমার কাছে স্যারের একটাই নম্বর স্যার।
তুমি অপারেটর না? কেন তোমার কাছে আর কোনো নম্বর নেই? কেন নেই? এসির নিচে বসে শুধু হাওয়া খাও? উজবুক কোথাকার! তোমাকে কে চাকরি দিয়েছে?
স্যার..
তুমি ওর নম্বর জোগাড় করে পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাকে দেবে। তা না হলে তোমার চাকরি নট!
কথা শেষ করে ধপাস করে টেলিফোনের রিসিভার রাখলেন বৈরম খান। তার পর তিনি তার ব্যক্তিগত গোয়েন্দা শাখার প্রধান মি. ম্যাককে ডাকলেন। মি. ম্যাক পড়িমরি করে বৈরম খানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার মুখাবয়ব দেখেই সে বুঝতে পারল, তিনি ভীষণ রেগে আছেন। কিন্তু রাগের কোনো কারণ সে জানে না। বুঝতেও পারছে না। রাগ কমানোর জন্য তার কি করা উচিত তাও বুঝতে পারছে না। সে চুপচাপ তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বৈরম খান একবার ম্যাকের দিকে তাকাচ্ছেন আরেকবার নিচের দিকে তাকাচ্ছেন। তিনি রাগ কমানোর চেষ্টা করছেন। এক সময় ম্যাক তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। সে বৈরম খানের অনেক গোপন তথ্য জানে। তাই তাকে খুব বেশি ঘাটান না। বরং একটু বেশিই পছন্দ করেন। তার কথার গুরুত্বও দেন। এই সুযোগটাই নিচ্ছে ম্যাক। সে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। কাজের কাজ কিছুই করছে না। গোয়েন্দাগিরি লাঠে উঠেছে। কোনো ব্যাপারেই সে কোনো দায়িত্ব পালন করে না। এসব তথ্য বৈরম খানের কাছে রয়েছে। কদিন ধরেই তিনি ভাবছিলেন, ম্যাককে তিনি ধরবেন। তার তেল কিছু কমাবেন। আজ সেই পুরনো রাগ ঝাড়ার একটি সুযোগ পেলেন বৈরম খান। তিনি রাগান্বিত স্বরেই বললেন, কি ব্যাপার মি. ম্যাক! কদিন ধরে তুমি শাহবাজ খানের ব্যাপারে কোনো তথ্য দিচ্ছ না? ঘটনা কী? ওর কাছ থেকেও টাকা নাও নাকি! তোমারে তো বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ম্যাক কী বলবে তা ঠিক বুঝতে পারছে না। বৈরম খান যা বলেছেন তার মধ্যে এক রত্তি মিথ্যা নেই। তারাও কিছুদিন ধরে শাহবাজ খানের ব্যাপারে কোনো তথ্য পাচ্ছে না। বলা চলে তারা রীতিমতো অন্ধকারে আছে। এ অবস্থায় বৈরম খানকে সে কী বলবে?
ম্যাককে চুপ থাকতে দেখে বৈরম খান চিৎকার দিয়ে উঠলেন। কি ব্যাপার! চুপ করে আছ কেন? শাহবাজের ব্যাপারে তোমার কাছে কোনো তথ্য আছে? সে কী করে না করে তা তুমি জানো?
ম্যাক চুপ করে আছে। তার কাছে এ প্রশ্নের কোনো জবাব নেই। বৈরম খান উত্তেজিত কণ্ঠেই বললেন, এই মুহূর্তে তুমি শাহবাজকে আমার সামনে হাজির করবে! বসে বসে শুধু বেতন খাও! কোনো কাজ করো না! তোমার দায়িত্ব কী ছিল? কেন তোমাকে রাখা হয়েছে? কী করো তুমি? ঘোড়ার ঘাস কাটো?
ম্যাক এক পা-দুই পা করে বিড়ালের মতো পা ফেলে তার সামনে থেকে বিদায় হচ্ছিল। ঠিক তখনই বৈরম খান চেঁচিয়ে বললেন, কোথায় যাচ্ছ? কী জন্য তোমাকে ডেকেছি? এত বড় সাহস তোমার? আমার কথা না শুনেই চলে যাচ্ছ!
ম্যাক মাথা নিচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। কোনো টুঁ শব্দটিও করছে না। বৈরম খান বললেন, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে শাহবাজকে আমার সামনে হাজির করবে। আর সে কোথায় কী করে; না করে সব বের করো। পুরো তথ্য আমাকে দেবে। না পারলে তোমাদের একটাকেও আমি ছাড়ব না। তুমি আমাকে এখনো চিনতে পারনি। আমি এত দিন কিছু বলিনি। স্রেফ ধৈর্য ধরে ছিলাম। আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। তুমি অনেক অন্যায় করেছ। আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। আর কাউকে আমি ক্ষমা করব না। আমার ছেলের কিছু হলে আমি তোমাকে ফাঁসিয়ে দেব। এবার আমার চোখের সামনে থেকে যাও।
ম্যাক আর দাঁড়াল না। সে গুটি গুটি পায়ে বাইরের দিকে চলে গেল। সে বিষয়টা নিয়ে গোয়েন্দা শাখার লোকদের সঙ্গে আলাপ করল। তাদের বৈরম খানের হুমকির কথা জানাল।
বৈরম খানের হুমকির কথা শুনে গোয়েন্দা শাখার সবাই তৎপর হয়ে উঠল। তারা শাহবাজ খানের ব্যাপারে তথ্য নিতে শুরু করল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা জানতে পারল, দুই তেলবাজকে ধরলেই শাহবাজ খানের সব তথ্য জানা যাবে।
ম্যাক দুই তেলবাজকে গোপনে তার আস্তানায় ডেকে নিল। তাদের দুজনকে পিছমোড়া করে বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল।
তৈল মিলন ও তেলবাজ তুষার ভালো করেই জানে, তাদের কাছ থেকে শাহবাজ খানের ব্যাপারে কোনো তথ্য ফাঁস হলে তারা বাঁচতে পারবে না। তাই তারা পণ করেছিল, তাদের ওপর যত ঝড় আসুক তা তারা সহ্য করবে। কিন্তু কোনো তথ্য দেবে না। তারা উল্টো ম্যাককে তেলমারা শুরু করল। যাতে তাদের ওপর খুব বেশি চড়াও না হয় সেজন্য ম্যাকের মন ভজানোর চেষ্টা করতে লাগল। দুই তেলবাজের পাল্লায় পড়ে ম্যাকের বেদিশা অবস্থা। সে গোয়েন্দাগিরির নানা কৌশল খাটিয়েও কোনো তথ্য বের করতে পারল না। সে কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে বৈরম খানের কাছে ছুটে গেল। তার কাছে গিয়ে দুই তেলবাজ সম্পর্কে বিস্তারিত বলল। সব শোনার পর বৈরম খান বললেন, ঠিক আছে। তুমি ওদের আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি দেখি ওরা কত বড় তেলবাজ!
ম্যাক দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে তার আস্তানা থেকে দুই তেলবাজকে সঙ্গে নিয়ে বৈরম খানের বাসায় যায়। বৈরম খান সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। তার পা দুটি সামনের দিকে ছড়ানো। হঠাৎ দেখলেন দুজন লোক তার পায়ে সালাম করল। তার পর পায়ের কাছেই বসে রইল।
বৈরম খান বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। এরা কারা তা বোঝার চেষ্টা করছেন। মুহূর্তের মধ্যেই দুই তেলবাজের কথা তার মনে পড়ল। তিনি ম্যাককে উদ্দেশ করে বললেন, এরাই তাহলে দুই তেলবাজ?
জি স্যার।
বৈরম খান দুজনের দিকেই তাকালেন। সঙ্গে সঙ্গে দুই তেলবাজ নিজেদের পরিচয় দিল। দুই তেলবাজের নাম শুনে বৈরম খান বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে বললেন, ‘তৈল মিলন’ কিংবা ‘তেলবাজ তুষার’ কোনো মানুষের নাম হতে পারে! হায় খোদা! এ আমি কোন দুনিয়া দেখছি!
এ সময় তৈল মিলনের এক কথায় আরও অবাক হলেন বৈরম খান। তৈল মিলন তাকে উদ্দেশ করে বলল, স্যার আপনি আমার বাপের মতো। আপনি আমাদের দেখবেন স্যার। আপনি না দেখলে আমরা কোথায় যাব স্যার?
বৈরম খান মনে মনে বললেন, এরা তো দেখছি সত্যিই বড় তেলবাজ! আমার সমান যার বয়স সেও বলে, আমি নাকি তার বাপের মতো! এদের কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। বরং এদের কাজের বিষয় নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।
বৈরম খান দুই তেলবাজকে উদ্দেশ করে বললেন, এমপির অফিসে আপনারা কী কাজ করেন?
তৈল মিলন বলল, স্যারের সঙ্গেই থাকি স্যার। স্যার যা করতে বলে তাই করি।
তার মানে আপনাদের সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই!
তেলবাজ তুষার আমতা আমতা করে বলল, আমাদের সবই করতে হয় স্যার!
হুম বুঝেছি। তার মানে কিছুই করতে হয় না! আচ্ছা, আপনাদের পদবি কী?
দুই তেলবাজ একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। কী বলবে তা নিয়ে ভাবে। তার পর তৈল মিলন বলে, তেলবাজি স্যার।
বৈরম খান বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, মানে!
জি স্যার। তেলবাজি করাই আমাদের চাকরি।
তেলবাজি করতে হলে তো সারাক্ষণ স্যারের সঙ্গে থাকতে হয়; তাই না?
তৈল মিলন বলল, জি স্যার।
তাহলে বলেন, আপনাদের স্যার কোথায়?
তেলবাজ তুষার বলল, আজকের খবর জানি না স্যার।
অবস্থা বেগতিক দেখে তৈল মিলন অন্য একটা প্রসঙ্গ টেনে বলল, স্যার আমি প্রধানমন্ত্রীর একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে পিএম কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। পিএম আপনার খুব প্রশংসা করলেন। শুনে খুব ভালো লাগল স্যার। আমরা আপনার প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পেরে গর্বিত স্যার।
প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসার কথা শুনে অন্যরকম হয়ে গেলেন বৈরম খান। তার মনটা আনন্দে নেচে উঠল। প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসার কথা শুনলে কার না ভালো লাগে! তিনি মনে মনে বললেন, এই তেলবাজকেই তো আমার দরকার! আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি সে মিথ্যা বলছে। তার পরও মন ভালো করার জন্য সময়মতো মিথ্যা বলতে পারাটাও একটা যোগ্যতা।
বৈরম খান ম্যাককে উদ্দেশ করে বললেন, এদের এখন নিয়ে যাও। কাল কিংবা পরশু আবার আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি এদের সঙ্গে আবার কথা বলব।
চলবে...
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন-
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২