পঞ্চদশ পর্ব
সিচুয়েশন রুমের নেতা অবাক হয়ে তার কথা শুনছিলেন। তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, বলবেন, আপনার স্বাতি নক্ষত্র তো এখনো চন্দ্রের লাইনে এসে পৌঁছায়নি, তার আগেই মৌনতা ভাঙলেন যে বড়? তবে একজন প্রাজ্ঞ স্ট্র্যাটেজিস্টের সঙ্গে তাকে জড়ানো তার বিবেকে বাঁধল, তার চেয়ে বড় কথা বিদেশি বোদ্ধার কথা প্রমাণ করতেই বুঝিবা, সবকয়টি ওয়াকিটকিতে একযোগে খবর এল, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজলা ও শনিরআখড়ায় ভয়াবহ সংঘর্ষ শুরু হয়েছে, ভস্মীভূত হাইওয়ের টোল প্লাজা।
পনেরো
নেতা রুকুকে বলল, তারা ঢাকার দক্ষিণ প্রবেশমুখ সাইনবোর্ডে যাবে। এখানে যে এতগুলো মাদরাসা গড়ে উঠেছে রুকুর ধারণা ছিল না। এটাকে বলা হয় মাদরাসাপাড়া। আর এটি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার প্রবেশমুখ। বিপ্লবীরা এ এলাকায় কেন ঘাঁটি গেড়েছে শোনার পর রুকু আস্তে আস্তে বুঝতে পারছে।
পথে আসতে আসতে নেতা বলে, আজ ব্লকেডের দিন। আজ প্রমাণ করতে হবে আগের জামানার মতো এটি শুধু হরতাল ডেকে কাজ শেষ করা নয়। সরকার যাই ভাবুক না কেন, আমাদের মূল নজর দিতে হবে ঢাকার প্রবেশপথগুলোয় সরকার কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়। বিশেষ করে ‘ঢাকা ঘেরাও’ কর্মসূচির সময় যেন কার্যকরভাবে পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়া যায়, সে দিকটি পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। আরও একটি কথা, ঢাকার ভেতরের আন্দোলন সংগঠনের দায়িত্ব এখন ট্রেডিশনাল দলগুলোর। তাদেরও আজকে পরীক্ষা হয়ে যাবে, আমরা যখন বাইরে থেকে ঢাকা মার্চ করব তারা ভেতর থেকে ঢাকা কতটুকু অচল করতে পারে।
রুকুর মন রাজনৈতিক দলগুলোর কথা শুনে উশখুশ করে। নেতা তা বুঝতে পেরে বলে,
-সরকারের পেটুয়া বাহিনী শিক্ষার্থীদের ঢাকা শহর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সব বন্ধ। এ অবস্থায় দলগুলো এগিয়ে এসেছে। শহরের প্রতিটি অলিগলিতে তাদের নেটওয়ার্ক আছে। প্রয়োজনে সশস্ত্র প্রতিরোধের রসদও তাদের আছে। সবচেয়ে বড় কথা, এটা তো এখন আর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নেই, এটা এখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার, তাদের বাদ দিয়ে তো এ দেশে রাজনীতি হবে না, তবে তাদেরও নবতর উপলব্ধির উত্তরণ হয়েছে। যা তারা যুগ যুগ ধরেও পারেনি, স্বৈরাচারের সেই পতন শিক্ষার্থীরাই আসন্ন করে তুলেছে। কাজেই তারা শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে, জনতাকে বাদ দিয়ে নিজেদের মতো করে আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না। আমার মতে স্বৈরাচার উৎখাতের আন্দোলনে এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাওয়া হবে।
মাদরাসায় আসার পথে নতুন নতুন পথ দিয়ে পথ চলছিল তারা। ও বলছিল, মাদরাসার মেয়েদের সঙ্গে আপাতত থাকবে রুকু। ওখান থেকেই যেখানে যখন প্রয়োজন বের হবে দুজন।
ধোলাইপাড় থেকে দনিয়া বাসস্টপে ঢাকা চট্টগ্রাম রোডে উঠল দুজন। বিড়বিড় করে কী সব হিসাব করছিল সে। রুকুর মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল।
একটু পর হাইওয়ে থেকে আবার নেমে গেল তারা।
এখানে জীবনযাত্রা অনেকটা স্বাভাবিক। একটি চায়ের দোকানে ফুলুরি ভাজা হচ্ছে। নেতা মনে মনে বলে, মা শীতকালে মাছ দিয়ে ফুলুরি রাঁধতেন। মাছ বাদ দিয়ে ফুলে ওঠা ফুলুরি খাওয়ার জন্য ভাইবোনদের ঝগড়া লেগে যেত। সেই কতদিন!
সামনে আর একটি দোকানে খাজা এবং আমিত্তি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। একটি পথ কুক্কুরের পাশে একজন ছিন্নবস্ত্র ভিখারি খাজা কী আমিত্তির লোভে দাঁড়িয়ে আছে।
চায়ের দোকানের পাশে একজন বৃদ্ধ খাঁচায় বন্দি একটি টিয়ে পাখি নিয়ে উদাস বসে আছেন। খাঁচার ওপর লেখা, আপনার ভাগ্য গণনা করুন; মানুষ মিথ্যা বলতে পারে, কিন্তু পাখিরা মিথ্যা বলে না।
এরকম মারাত্মক বিজ্ঞাপনের পরও ভাগ্য গোনার কোনো কাস্টমার ভিড় করেনি। নেতা মনে মনে বলে, যে দেশের এ দৈন্যদশা তার মানুষের ভাগ্য তো এমনিতেই স্পষ্ট। তা গোনার জন্য পাখির দরকার নেই।
তারা হাঁটতে হাঁটতে ফ্লাইওভারে উঠার র্যাম্পের কাছে চলে আসে। ব্লকেডের কারণে ফ্লাইওভার নির্জন। কিছুক্ষণ পরপর হুইসল বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি চলে যাচ্ছে। সামনে টোল প্লাজার লোকেরা সাপ-লুডু ‘খেলিতেছে’।
রুকুকে নিয়ে নেতা ‘আবার খাব’ নামের একটি রেস্টুরেন্টে ঢোকে। এখানে পরিবার বসার জন্য ফ্যামিলি কেবিন আছে। মোটামুটি আধাঘণ্টা ধরে খাওয়া যায়, সেরকম খাবার অর্ডার দেওয়া হলো। খাদ্য পরিবেশিত হলে কেবিনের পর্দা টাঙিয়ে দিল নেতা, তারপর চুপিসারে জানালা গলে বেরিয়ে পড়ল। বলল,
-ঠিক আধা ঘণ্টা পর আসব। খাও আর জানালার ঝিলমিল দিয়ে হাইওয়েতে দেখো।
রুকু দেখে র্যাম্পের নিচে ইতোমধ্যে একদল মানুষ জড়ো হয়েছে। তার বুঝতে বাকি থাকে না, এগুলো পূর্বে পরিকল্পনা করা।
নেতা জনতার কাছে যেতে যেতে তা ফুলে-ফেঁপে বহতা নদীর মতো স্ফীত হয়েছে। তারা র্যাম্প দিয়ে হাইওয়েতে উঠতে চায়।
টহল পুলিশের দলনেতা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে সবাইকে গ্রেপ্তার করা হবে। এখন ব্লকেড চলছে।
জনতার পক্ষ থেকে নেতা বলল,
-আমরা স্থানীয় সরকারি দলের সমর্থক, ব্লকেড ভাঙার জন্য জড়ো হয়েছি, যাতে লোকজন বোঝে ব্লকেড চলছে না। আপনি ওপরের মহলে বলেন।
পুলিশের ওয়াকি-টকি সচল হয়ে ওঠে। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পুলিশের সম্মতিতে পুরো দল নিয়ে নেতা হাইওয়েতে ওঠে আসে। মুহূর্তেই কিছু সংবাদ মাধ্যমের টিভি ক্যামেরা জ্বলে ওঠে, ‘বিরোধীদের ডাকা ব্লকেড অচল করে ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়েতে জনতার ঢল’ -সরকারি ল্যাসপেন্সার সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ বহুদূরের রেস্টুরেন্টে বসা রুকুর কানেও বাজতে থাকে।
মিছিল সামনে যেতে যেতে হাইওয়ের বিভিন্ন পয়েন্টে মোতায়েন পুলিশের দল, শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন হাসিমুখে দাঁড়িয়ে তাদের অভিবাদন জানায়। নেতা পুলিশ ও অন্য বাহিনীর প্রতিটি স্থান নোট করে। ঢাকার বাইরে থেকে কাফেলা নিয়ে ঢাকা ঘেরাওয়ের সময় এসব জায়গা অচল করতে হবে।
ছোট্ট দলটি টোল প্লাজার সামনে আসার আগেই নেতা হাইওয়ে থেকে নেমে পড়ে। এখানে র্যাম্প দিয়ে নতুন আরেকটি দলকে ওঠানো হয়। সবকিছু ঘড়ির কাঁটা ধরে নিষ্পন্ন হয়।
কিছুক্ষণের মধ্যে টোল প্লাজায় মুহুর্মুহু বোমা, ককটেল এসে পড়তে থাকে। দুটি দলই হাইওয়ে থেকে দ্রুত সটকে পড়ে।
ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারিদিক। পুলিশকে বলা হলো, সরকারি সমর্থকদের উপর ব্লকেড পক্ষ হামলা চালিয়েছে। কিন্তু কে সরকারি কে বিরোধীদল- পুলিশ ধোঁয়া ও শব্দের মধ্যে ঠাহর করত পারল না।
এখন হাইওয়ে খাঁ খাঁ করছে। আগুন জ্বলছে টোল প্লাজায়। ফায়ার ব্রিগেডের দুটি গাড়ি আগুন নেভাতে ব্যস্ত। সরকারপন্থি সাংবাদিকদের লাইভ সম্প্রচারে পুরো দেশ জানল, ঢাকায় ব্লকেড চলছে। ব্লকেডের বিরুদ্ধে সংবাদ করতে গিয়ে তারা যে ব্লকেডের প্রচার করল জোরেশোরে তা বোঝার ক্ষমতা যদি এই রিপোর্টারদের থাকত! আফসোস করল নেতা।
কিন্তু তার হাতে সময় ছিল কম। বোমাবাজির পর হাইওয়ের নিচের সব কর্মব্যস্ততা অবসিত হয়ে গেছে। টিয়া পাখির গণক, ফুলুরির দোকানদার সবাই কোথায় যেন লহমায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
আধ ঘণ্টা আগে আর আধ ঘণ্টার পরের মধ্যে কত পার্থক্য! ত্রস্তে গলির মধ্যে ঢুকতে ঢুকতে নেতার মনে এ উপলব্ধি হলো, এমন করেই একদিন চোখ বন্ধ হলেই এই জীবন্ত পৃথিবীর মর্মর চিরদিনের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাবে। কেমন সে নিস্তব্ধ পৃথিবী! যদি একবার সে পৃথিবী থেকে ঘুরে আসা যেত; যদি একবার!
জানালা টপকে কেবিনে ঢুকে নেতা দেখল, রুকু ভয়ে জড়ো হয়ে আছে।
দোকানের ঝাপ ফেলে দেওয়া হয়েছে। দুজন পর্দা ঠেলে কেবিনের বাইরে এল। দোকানদার বললেন, সন্ত্রাসীরা টোলপ্লাজায় বোমা হামলা করেছে। আপনারা এখানে নিরাপদ।
- কিন্তু আমাদের যে বহুদূরের পথ।
- তাহলে পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়ে যান।
ধন্যবাদ বলে দুজন পেছন দুয়ার দিয়ে বাহির হয়ে এল। বোমা কাণ্ডের পর চারিদিকে কবরের নিস্তব্ধতা। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর একজন রিকশাওয়ালা পাওয়া গেল। কিন্তু সাইনবোর্ড পর্যন্ত দাম চাইল ১০০ টাকা। নেতা ৫০ টাকা বললে, রিকশাওয়ালা নির্বিকার বলল, একদাম।
রুকু ফিসফিসিয়ে বলল, একটা রিকশা পাওয়া গেছে ভাগ্যের জোরে, এখানে দরদাম করার কি যুক্তি আছে?
নেতা একবার বলতে চাইল, দরদাম ছাড়া উঠে গেলে রিকশাওয়ালাকে পরে পুলিশ জিজ্ঞাসা করলে বলবে, এক দম্পতিকে ১০০ টাকা হাকলেও বিনা তর্কে রিকশায় ওঠে পড়ে। এতে পুলিশের সন্দেহ বাড়বে।
কিন্তু কিছুই বলল না সে। বলল,
-৮০ টাকা দিই মামা?
-চলুন।
রিকশায় যেতে যেতে দুজন দেখল ঢাকা শহরের এ প্রান্ত বিরান নগরে পরিণত হয়েছে। রিকশাওয়ালা হাজী লতিফ কলেজ বাঁয়ে রেখে তামিরুল মিল্লাত মাদরাসার গেটে এসে বললেন, আর যাওয়া যাবে না।
- কারণ?
-সামনে পুলিশ ব্লক দিয়েছে।
নেতা রিকশাওয়ালাকে বিদায় দিয়ে মাদরাসায় ঢুকল। রুকু অবাক হয়ে দেখল, এ মাদরাসাই ছিল তাদের গন্তব্য। ও সাইনবোর্ডের কথা তাকে আর রিকশাওয়ালাকে কেন বলল বুঝতে পারল না।
এই প্রথম মুখ খুলল নেতা, বলল, যতদূর সম্ভব কারও সন্দেহ উদ্রেক না করার জন্য কেন আর কোনো রিকশা না থাকা সত্ত্বেও দরাদরি করেছিল, কেন দারুল মিল্লাত গন্তব্য হলেও সাইনবোর্ডের কথা বলেছিল ইত্যাদি। রুকু বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেল, কিন্তু বেশি সময় পেল না আরও বিস্মিত হওয়ার। মাদরাসার ছাত্রীরা তাকে ইতোমধ্যে জড়িয়ে ধরছিল।
এটি তামীরুল মিল্লাত মহিলা মাদরাসা। ছাত্রীদের বাহুবন্দি থেকে রুকুর ইচ্ছা হলো ওদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য বলে, এ মাদরাসার নাম হওয়া উচিত ছাত্রী মাদরাসা; ওরা তো এখনো মহিলা হয়নি। কিন্তু কিছুই বলা হয় না।
যেতে যেতে নেতা বলে যান, এ কয়দিন এ মাদরাসাই হবে রুকুর ঠিকানা। এখানেই প্রয়োজনে ও দেখা করবে, এখান থেকেই আগস্ট এর প্রথম দিনগুলোতে ওকে ঢাকায় গিয়ে সমন্বয় করতে হবে আর সবচেয়ে বড় কথা মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ঘোষণা হলে এখান থেকেই চট্টগ্রাম রোডের কোনো এক স্থানে গিয়ে কাফেলাকে নেতৃত্ব দিয়ে রুকুকে ঢাকায় ঢুকতে হবে। নেতা নিজে উত্তর দিকের মার্চ টু ঢাকা এবং ঢাকার ভেতরের অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেবে।
বলতে বলতে রুকুর চোখের ওপর অন্য হুজুরদের সঙ্গে নেতা বেরিয়ে যায়।
ততক্ষণে রুকুকে মাদরাসার ছাত্রীরা তার জন্য নির্ধারিত কক্ষে নিয়ে এসেছে। তেঁতুল আর পুদিনার রসের ড্রিংক পরিবেশন করে ওরা। একজন দেয় তার মায়ের পাঠানো ছাইন্যা পিঠা। বাইরে থেকে অন্য ছাত্রীদের সুললিত কণ্ঠের তেলাওয়াত ভেসে আসতে থাকে।
চলবে...
আরও পড়ুন