ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা: ইসরায়েলের হাতে বিকল্প কী লতাপাতায় ঢাকা ২ কোটি টাকার সেতু, পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি প্রকল্প গরমে কমেছে কাজের গতি নিজেই নিজেকে গড়ছে এআই, শঙ্কা অ্যানথ্রোপিকের বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে সম্মত খরা, বন্যা ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে ভারত, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দিনাজপুরের: সুই-সুতো আর কি-বোর্ডে নির্যাতিত নারীদের নতুন স্বপ্ন পুতিনকে আলোচনায় বসতে জেলেনস্কির খোলাচিঠি রাজশাহী অঞ্চলে তাপপ্রবাহে হাঁসফাঁস দিল্লিতে ‘ককরোচ জনতাপার্টির’ বিক্ষোভ আজ ইসলামী ব্যাংকের কারণেই আরেকটি ৫ আগস্ট ঘটে যেতে পারে বায়ুদূষণে বদলে যাচ্ছে ভ্রূণের জিন জলাবদ্ধতা ও দুর্গন্ধে নাকাল ঘিওর বাজার ছায়ানটে শুরু হলো দুই দিনের নজরুল উৎসব রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে ৬ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ৬ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল মে মাসে মব হামলায় নিহত ৩২: এমএসএফ ‘নতুন পুরাতন মিলিয়ে ভালোই বোর্ড হবে’ শাহজালালের কার্গো শেডে আগুন শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন শিকলবাহায় হত‍্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মরদেহ নিয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম ০২০৪ ব্যাচের বন্ধুদের ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী মায়ানমারে পাচারকালে দেড় হাজার বস্তা সিমেন্ট আটক ৫২ মরুভূমিতে বিকল ট্রাক, পানির অভাবে ৪৯ জনের মৃত্যু মেধা ও ক্রীড়াবান্ধব জাতি গঠনে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের শোডাউন সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের প্রথমবার এআই তৈরি করল ‘সুপার-ভ্যাকসিন’
Nagad desktop

জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার মতো আমাদের গ্রাম

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:২৪ এএম
জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার মতো আমাদের গ্রাম
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

চতুর্থ পর্ব

দেশবরেণ্য লেখক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশের একজন অভিভাবক, বাঙালির বাতিঘর এই শিক্ষাগুরু সবার স্যার। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যেমন অনন্য অবদান রেখেছেন, তেমনি সাহিত্য সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। সেই ছোটবেলায় তার লেখালেখিতে হাতে খড়ি। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি নিয়মিতই লিখছেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, অবসর গ্রহণের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। চব্বিশ বছর ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন। এক শ বাইশ গ্রন্থের রচয়িতা। লেখালেখির জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

তা ম্যাট্রিকটা তো পাস হলো, এবার কী করবেন? ধারেকাছে এমন কোনো কলেজ ছিল না যেখানে তিনি ভর্তি হতে পারেন। মুন্সিগঞ্জে হরগঙ্গা কলেজ স্থাপন অনেক বছর পরের ঘটনা। কলেজে পড়তে হলে সেই কলকাতায় গিয়ে থাকতে হয়। সেটা ছিল অসম্ভব এক কল্পনা। কলকাতায় আত্মীয়স্বজন বলতে এমন কেউ ছিলেন না যিনি ছেলেটিকে তার বাসায় আশ্রয় দিতে পারেন। ছিলেন যারা তারা নিজেরাই ছিলেন প্রায় নিরাশ্রয়। ছোটখাটো কাজকর্ম করতেন, কারণ তাদের লেখাপড়ার সুযোগ ঘটেনি। সবচেয়ে ভালো অবস্থায় ছিলেন যিনি তিনি কাজ জোগাড় করতে পেরেছিলেন আমেরিকান এক কোম্পানিতে, তাও অফিসে নয়, কর্মকর্তার বাসগৃহে। এরা স্বামী-স্ত্রী কলকাতায় থাকতেন, তাদের গৃহে অন্য কেউ ছিলেন না। এদের একজন দেশি কেয়ারটেকার আবশ্যক ছিল। সাহেব ও মেম সাহেবের খাবার-দাবারের জন্য কী কী দরকার কেয়ারটেকার প্রতিদিন সকালে তা জেনে নিয়ে বাজার করতেন, বাবুর্চিকে বুঝিয়ে দিতেন। মাঝে-মধ্যে পার্টি হতো, তখন বিশেষ কী রকমের খাওয়া-দাওয়ার প্রয়োজন তা জেনে নিয়ে তদনুযায়ী আয়োজন করতেন। মোগলাই স্টাইলে তার পদবিটা ছিল খানসামা। নামটি ইংরেজদের দেওয়া; তাদের ভাবসাব ছিল মোগল বাদশাহদের মতোই। বড়দিনের ছুটিতে সাহেব-মেম নিজেদের দেশে চলে যেতেন, আমাদের ওই আত্মীয়টি তখন ছাড়া পেতেন গ্রামে আসার। তা খালি হাতে আসতেন না। বিশেষভাবে যা আনতেন তা হলো দুষ্প্রাপ্য এবং অতিশয় আকর্ষণীয় শুকনো খাবার- স্লাইস করা পাউরুটি, টিনের মাখন, প্যাকেটের বিস্কুট, বয়মে জেলি। এসব সামগ্রীর কিছু কিছু আমাদের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যেত। কলকাতাবাসী আরেক আত্মীয় শুনতাম সুদের ব্যবসা করেন, কল্পনা করতাম তিনি নিশ্চয়ই ভয়ংকর চেহারার কেউ হবেন; কিন্তু যখন গ্রামে এলেন এবং নিজের কন্যাসন্তানটির জন্য নিয়ে এলেন নানা আকৃতির ও শোভার খেলনা, তখন দেখলাম তিনি আমাদের আপনজনদের মতোই স্নেহভরপুর একজন মানুষ। মাতৃ-পিতৃহীন আমার বাবাকে এরা যতই স্নেহ করুন এদের কারও পক্ষেই সম্ভব ছিল না কলকাতার মতো হৃদয়হীন ব্যস্ত শহরে তাকে আশ্রয় দেওয়া। ওদিকে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটিও তো এই সময়েই ঘটে; আমার বাবার অল্পবয়স্ক অভিভাবক ফরহাদ চৌধুরী মারা যান। 
পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্নবিলাসিতা ছেড়ে দিয়ে আব্বা কলকাতায় গিয়ে হাজির হন, কর্মের সন্ধানে। উঠেছিলেন কলিন্স লেনের যে বাসাটিতে গ্রামবাসী কয়েকজন মেস করে থাকতেন সেখানেই। ওঠা মানে মাথাগোঁজার ঠাঁই পাওয়া। এদের কলকাতা কথিত বঙ্গীয় রেনেসাঁসের শহর ছিল না, ছিল সস্তা বাসস্থানের অলিগলি। অনেকটা সেভাবেই থাকতেন, বাংলাদেশের প্রবাসীরা এখন যেভাবে থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে এবং ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন শহরে। 
রোজ সকালে আব্বা গভীর আগ্রহে পত্রিকায় কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখতেন। তার পর রাইটার্স বিল্ডিংসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যালয়ের বারান্দায় ঘোরাফেরা করতেন ভ্যাকেন্সি আছে এমন নোটিশের খোঁজে। এমনি এক দুপুরে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের দোতলায় ১৫-১৬ বছর বয়সী ওই কিশোরটি হাঁটাহাঁটি করছিলেন। গরমের দিন, সকালে হয়তো ভালো নাস্তা খাওয়াও হয়নি, কোথাও চাকরির কোনো সম্ভাবনা দেখেননি, ক্লান্ত হয়ে একটি অফিসের দরজার সামনে নিয়ন্ত্রণ ও জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। একটু হইচই ঘটে; তাকে অফিসের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। অফিসের কর্মকর্তা ছিলেন এক ইংরেজ, তার সঙ্গে আলাপ করছিলেন স্টেটসম্যান পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আর্থার মুর। পরিচর্যায় জ্ঞান ফিরলে তারা দুজনে কিশোরটির সঙ্গে কথা বলেন। তার প্রয়োজনের বিষয়ে জানতে চান। এবং সহানুভূতিশীল আর্থার মুর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বেঙ্গল পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেলের কাছে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টরের পদে কিশোরটিকে নিয়োগ দানের জন্য সুপারিশ করে চিঠি লেখেন। সেকালে পুলিশের চাকরিতে পরীক্ষা ছিল, কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো সুপারিশকে। কেননা, তাতে নিশ্চিত হওয়া যেত যে, প্রার্থীটি নির্ভরযোগ্য। ওদিকে পত্রিকায় সম্পাদকরা তখন বেশ মর্যাদাবান ছিলেন; বিশেষ করে যে পত্রিকা ইংরেজদের মালিকানাধীন সে পত্রিকার সম্পাদক তো বটেই। আব্বার পুরোনো কাগজপত্র তেমন রক্ষিত হয়নি; পোকায় কেটেছে, পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে, রক্ষায় তিনি যে মনোযোগী ছিলেন তাও নয়, যে কয়টি কাগজ আমরা তার মৃত্যুর পরে দেখেছি তার মধ্যে একটি হচ্ছে আর্থার মুরের চিঠির জবাবে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশের অফিস থেকে বেঙ্গল ক্লাব, ক্যালকাটা ঠিকানায় পাঠানো একটি চিঠি, যাতে বলা হয়েছে- প্রার্থী যেন তার জেলার পুলিশ সুপারের কাছে আবেদনপত্র জমা দেন। কাগজপত্রের মধ্যে আরেকটি ছিল ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তার কৃতকার্যকতার টেস্টিমনিয়াল; সেটিতে সই করেছেন স্কুলের হেডমাস্টার সুরেন্দ্র চন্দ্র পাল চৌধুরী। 
আব্বা গ্রামে ফিরেছিলেন এ সুসংবাদ নিয়ে যে পুলিশ বিভাগে তার চাকরি হওয়ার আশা আছে। সুপারিশকারী ভদ্রলোক জানিয়েছিলেন যে, শরীর-স্বাস্থ্য, জ্ঞানবুদ্ধি এবং সর্বোপরি সুপারিশের বিবেচনায় আব্বার নিয়োগ না পাওয়ার কারণ নেই। কিন্তু ছেলে পুলিশের চাকরি নেবে শুনে আমার দাদি মোটেই সন্তুষ্ট হননি। ওই কাজ তার ছেলের জন্য বিপজ্জনক হবে বলে তার বিশ্বাস। এক ছেলে চলে গেছে, অবশিষ্টটি বিপদের ঝুঁকি নেবে, চোর-ডাকাত ধরতে রাতবিরাতে বনবাদাড়ে ছোটাছুটি করবে ভেবে তাকে নাকি দুশ্চিন্তাগ্রস্তই দেখা গেছে। 
মায়ের মন বুঝে আব্বা ফেরত গেছেন কলকাতায়। ঘোরাফেরা করে চাকরি পেয়েছেন এক বিদেশি কোম্পানিতে। তাদের ছিল রাবারের ব্যবসা। আসাম, বার্মা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে রাবার উৎপাদন করাত এবং চালান দিত নানা দেশে। সে কাজ কিছুদিন করে, সরকারি চাকরির জন্য পরীক্ষা দিয়ে পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্টে নিয়োগ পান; এবং কিছুদিন পরে যান ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট। ইনকান ট্যাক্সের তখন নাম ছিল সেলস ট্যাক্স, পাশাপাশি ছিল অ্যাগ্রিকালচারাল ইনকাম ট্যাক্স, পরে পাকিস্তান আমলে দুটি একত্র হয়ে নাম নেয় ইনকাম ট্যাক্স। ১৯৬৩-তে অবসর গ্রহণের সময় পর্যন্ত ওই দপ্তরেই ছিলেন। অফিসার ছিলেন না, ছিলেন হেড অফিসের অফিস সুপারিনটেনডেন্ট। 
ঝোপঝাড় ও রোগ-জীবাণুতে পরিপূর্ণ আমাদের ওই গ্রামে কবি জীবনানন্দ দাশ তার রূপসী বাংলায় যে ধরনের গাছ, পাখি, লতাপাতা, ঘাস, নদী, ফসলের কথা বলেছেন সে সবের কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। তবে অসুবিধা ছিল একটাই। সেটা এই যে, সেখানকার মানুষের পক্ষে ওসবের ভেতরে সৌন্দর্য দেখতে পাওয়াটা মোটেই সহজ ছিল না। সবাই ছিলেন ভুক্তভোগী। বর্ষায় যখন নতুন পানি আসত, দেখা যেত খলবল করছে মাছ, কিংবা নৌকা নিয়ে খাল বেয়ে যখন ইছামতী নদীতে পড়া যেত, কিংবা আড়িয়ল বিলের ভেতর দিয়ে যখন নানাবাড়িতে যাওয়া ঘটত, অথবা কোনো আত্মীয়স্বজনের নৌকা যখন বিল পার হয়ে এসে ঘাটে ভিড়ত তখন আমরা নির্মল আনন্দ পেতাম। পাখির, বিশেষ করে ঘুঘুর ডাক খুব মধুর শোনাত। গাছ থেকে আম পড়ে উঠান ভরে যাওয়াতেও সৌন্দর্য ছিল। খুশি হতাম মাছ ধরতে পারলেও। কিন্তু এসব ছিল স্বল্পকালীন। মেলাতেও গেছি, কিনেছি জিনিসপত্র; নদীতে নৌকা বাইচও ছিল উত্তেজনাকর। তবে স্থায়ী ছিল অন্ধকার। এবং বিষণ্নতা। এখন মনে হয় এ বুঝি সেই বিষণ্নতা যা বহন করে জহুরুদ্দীন চৌধুরী একদা এই সীমান্ত-প্রান্তে এসেছিলেন, ছিন্নমূল হয়ে। আর এর মধ্যেই আমি ভয় পেতাম এমন দুঃস্বপ্ন দেখে যে অন্ধকারে বিরাট এক মাঠে হারিয়ে যাচ্ছি। একাকী হয়ে। ভয় ছিল সন্ধ্যার পরে দেখা বাড়ির সামনের বিরাট বটগাছটিকেও। 
১৯৪২ সালেই হবে, তখন বিশ্বযুদ্ধ চলছে; যুদ্ধের ধাক্কায় গ্রামে কিছু পরিবার চলে এসেছে, আব্বার এক চাচাতো বোনও এসেছেন। তারা কলকাতায় ছিলেন। ফুপা কলকাতা পুলিশে কাজ করতেন। আমার ওই ফুপুর দুই ছেলের মধ্যে একজন ছিল আমার বয়সী; তার সঙ্গে ভারি বন্ধুত্ব আমার, আবার ঝগড়াঝাটিও তার সঙ্গেই। তার বড় ভাইটি শেখরনগরের স্কুলে ভর্তি হয়েছেন। খুবই আমুদে মানুষ ছিলেন তিনি। মাতিয়ে রাখতে চাইতেন। কিন্তু কীভাবে সেটা করবেন? উপকরণ তো নেই। তার কাছে একটা ঋণ রয়েছে আমার; তার উদ্যোগেই আমি সাঁতার শিখেছিলাম, আমার ভাইবোনদের কেউই যা শিখতে পারেনি। ওই ভাই- গিনিদা বলতাম আমরা- কাগজে বড় বড় হরফে লিখে আশপাশের গাছে টানিয়ে দিয়েছেন একটা বিজ্ঞপ্তি, ‘আসিতেছে আসিতেছে ম্যাজিক খেলা, পুকুরের পাড়ে ওই গাবগাছ তলা’। সে খেলা সত্যি সত্যি এসেছিল কি না, এসে থাকলেও কী কী চমকপ্রদ জিনিস তিনি প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তার কিছুই মনে নেই; তবে বুঝেছিলাম যে ম্যাজিক দেখাবেন এই ধারণাটা তিনি পেয়েছিলেন চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় গিয়ে, যেখানে আমিও গিয়েছিলাম অন্যদের সঙ্গে; এবং একটি তাঁবুর ভেতরে জাদুর খেলা দেখেছিলাম; সেটুকু ছাড়া অন্য কিছুই স্মরণ করতে পারব না। গ্রামে আনন্দ ছিল না। বরং বিষণ্নতা যে কুয়াশার মতো বিছিয়ে ছিল সেটা স্মরণ করতে পারি। উঠানে নতুন ধান মাড়ানোর সময়ে ব্যস্ততা দেখেছি ঠিকই, কিন্তু খুব একটা আনন্দ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার টাপুরটুপুর শব্দ, বর্ষার পানিতে উঠানে মাছ উঠে আসা, বৈশাখের ঝড়ে আম কুড়ানোর উৎসব, নদীতে মাঝিদের গলা ছেড়ে গান গাওয়া, আড়িয়ল বিলে গিয়ে মাছ ধরার আয়োজন ও শাপলা ফুলের সমারোহ দেখা, বেদেদের নৌকা থেকে সওদাপাতি কেনায় মেয়েদের তৎপরতা, এসব ছিল; তবে ওই যে বললাম সবই ছিল সাময়িক ঘটনা, স্থায়ী ছিল বিষণ্নতা। 
পরের কালে অনেক সময়ে মনে হয়েছে যে, পরিবেশের সমগ্র বিষণ্নতাটা যেন মূর্ত ছিল আমার দাদির চলাফেরায়, কাজকর্ম, এমনকি চেহারাতেও। ছায়া নয়, ছোঁয়া নয়, তারও বেশি। এর মধ্যেই সব কর্তব্য তিনি পালন করতেন। আব্বা থাকতেন রাজশাহীতে, পরিবারের কর্তা ছিলেন বৃদ্ধা ওই মহিলাই। পালক  ছেলেটির সময়মতো বিয়ে দিয়েছেন তিনিই। 

চলবে...

বই পরিচিতি মাস্টার বাড়ি

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৫১ পিএম
মাস্টার বাড়ি
বই

মাস্টার বাড়ি

এস. আকরাম হোসেন

শ্রেণি: উপন্যাস

প্রকাশনী: খান প্রকাশনী

প্রকাশকাল: ২০২৫

পৃষ্ঠা: ১৫০, মূল্য: ২৫০ টাকা

এস. আকরাম হোসেন বিখ্যাত কথাশিল্পী আকবর হোসেনের গ্রামের সন্তান গ্রামে বিখ্যাত অনেক মনীষীর জন্ম বিপ্লবী বাঘা যতীন, সাহিত্যিক ললিতকুমার চট্টোপাধ্যায়, কবি শরৎশশী দেবী, শিক্ষাবিদ অধ্যাপক . আজিজুল ইসলাম- গ্রামের নক্ষত্র সন্তান অভিনেতা-কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের পৈত্রিক বাড়ি এখানে এস. আকরাম হোসেনের জন্মভাগ্য ঈর্ষণীয় -গ্রামে জন্মে এস. আকরাম হোসেন লেখক হয়ে-উঠবেন এটাই স্বাভাবিক তিনি কবিতা-গল্প-উপন্যাস লেখেন মুক্তকলাম লেখেন তাঁর লেখাতে দেশভাবনা-সমাজ-সমকাল-অর্থনৈতিক অবস্থা-প্রেম-প্রণয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ সমাজের নানান অসংগতি তিনি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তা সাহিত্যগুণ সমৃদ্ধতায় উপস্থাপন করেন তাঁর ভাষা প্রয়োগের দক্ষতা ঈর্ষণীয় তাঁর উপন্যাসমাস্টার বাড়িপ্রকাশিত হয়েছে এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দদায়ক -উপন্যাসের বিষয়বস্তু-চরিত্র নির্মাণ-সংলাপ- আর্থ-সমাজচিত্র-লেখকের চিন্তা-দর্শন, সর্বোপরি শিল্পমান পাঠকমনে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করবে এবং ভাবাবে পাঠককে মুগ্ধ-আবেশে ধরে রাখার শক্তি আছে বিশেষ করে ভাষাপ্রয়োগের কৌশলে তিনি মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেনমাস্টার বাড়িহৃদয়গ্রাহী সুখপাঠ্য গ্রন্থ হিসেবে পাঠকমনে সহজেই নিজস্ব জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে-বিশ্বাস করি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গ্রামীণজীবনের নানামাত্রিক সামাজিক সমস্যা উপন্যাসটির বিষয়বস্তু গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে সুদের ব্যবসা সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে সুদেও কবলে পড়ে বহু মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছে এসব থেকে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে মুক্ত করে সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য উপন্যাসের নায়ক জিহাদ অক্লান্ত পরিশ্রম করছে এলাকায় সুদের ব্যবসা যারা করে তারা মূলত অসহায় মানুষদের সুদের ফাঁদে ফেলে তাদের রক্ত চুষের নেয় সুদগ্রহণকারী এসব মানুষ সুদেও চক্রাহারে ক্রমশ জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলে গ্রন্থটিতে শুধু সমস্যা তুলে ধরেনি, সমস্যার সমাধানও লেখক তুলে ধরেছেন সেসঙ্গে গ্রামীণ জীবনে প্রেম বিরহ যেমন আছে তেমনি দেশপ্রেমের চিত্র ফুটে উঠেছে এস. আকরাম হোসেনেরমাস্টার বাড়িনিখাদভাবে দেখা অসম্ভবরকমের খাঁটি একটি উপন্যাস আপনাকে অসম্ভব চুম্বক-আকর্ষণে ধরে রাখার অসামান্য শক্তি রয়েছে বইটির পরতে পরতে সহজ সরল ভাষায় সমাজজীবনের অসামান্য বুনন- ‘মাস্টার বাড়িউপন্যাস

বই পরিচিতি কৃষি শব্দকোষ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম
কৃষি শব্দকোষ
বই

কৃষি শব্দকোষ

মৃত্যুঞ্জয় রায়

শ্রেণি: ইংরেজি-বাংলা অভিধান

প্রকাশনী: ঐশ্বর্য প্রকাশ

প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২১

পৃষ্ঠা: ৫০৩, মূল্য: ৯৫০ টাকা

 

পড়তাম ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ইংরাজী ভাষায় কৃষির মতো একটি মাটিময় কাঁচা ফসলের গন্ধমাখা বিষয়গুলো পড়তে গিয়ে কেমন যেন নিরস লাগত, দুর্বোধ্যও কৃষি পড়ে তো মূলত কৃষকদেরই পরামর্শ দিতে হবে, শিক্ষক গবেষক হবে আর কজন? সেজন্য কৃষির মতো একটা বিষয় ইংরাজীতে পড়ার ছিলাম ঘোর বিরোধী কিন্তু না পড়েই তো উপায় ছিল না শিক্ষকরা তো বাংলায় পড়ান না শেষে বাংলায় নোট করা আমিই শুরু করলাম সাথে পেলাম অনেক সুহৃদ বন্ধুদের চাকরি জীবনে এসে ভেবেছিলাম কৃষির পড়াশুনাটা বোধহয় বাংলাতেই চলছে কিন্তু আমার সে ভাবনায় ভুল ছিল আবার কৃষি ইংরাজীতে ফেরত গেছে বাংলা কি দীনহীনের ভাষা? কেবল চাষাভূষার বুলি? এসব কথা ভাবলেই মনটা বিষন্নতায় ভরে ওঠে

উচ্চশিক্ষায় এত বছর পরও কেন আমরা মধুর মতো বাংলা ভাষায় পড়তে পারছি না! পাশ করার পর তাই যা হওয়ার তাই হচ্ছে মুখস্থ বিদ্যায় আর কতটুকু কেদ্দারী করা যায়? ফলে অনেকের পেশাগত দক্ষতার অভাব ঘটছে অনেকটা তাড়না থেকে কৃষির ছাত্রছাত্রী পেশাজীবীদের জন্য লিখলাম বই এটি চাকুরিকালীন সময়ে করা সম্ভব ছিল না বিধায় মনে মনে ভেবেছিলাম, অবসরে যাওয়ার পর কাজটি ধরব অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে পিআরএল- যাওয়ার পর চার মাসের মধ্যে এটি লিখে শেষ করি, পরের চার মাসে এটি প্রকাশিত হয় এতে কৃষি সংশ্লিষ্ট তিন হাজারের বেশি শব্দের ইংরাজী থেকে বাংলা অর্থ সে সম্পর্কে খুব সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে বইটি পাঠক কৃষিজীবীরা সাদরে গ্রহণ করেছেন বলে আমি আনন্দিত

বই পরিচিতি দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
দীনেশচন্দ্র সেন ও লোককাহিনির মঞ্চ-পরিবাহন
বই

ইউসুফ হাসান অর্ক

শ্রেণি: সমকালীন লোককাহিনি

প্রকাশনী: বাংলা একাডেমি

প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫

পৃষ্ঠা: ১৬৮, মূল্য: ৪৪০ টাকা

 

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী নাট্যমূলক পরিবেশনার অগাধ ভাণ্ডার বিবেচনার ক্ষেত্রে আমাদের মগ্নতায় এখনো দাসত্ব ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নন্দনতত্ত্বের দৌরাত্ম্য রয়ে গেছে সংলাপমূলক দ্বন্দ্ব দৃশ্যায়নের মাধ্যমে তথাকথিতদৃশ্যকাব্যহয়ে উঠলেই তাকে বলা যাবেবিশ্বমানের নাটকীয় কিছু হলো’- ভাবনার বাইরে গিয়ে দেশজ সম্পদের স্বকীয় ঐশ্বর্যের দ্যোতনাকে যে কয়জন মানুষ উপলব্ধি করে উদ্যোগী হয়েছিলেন তার মধ্যে দীনেশচন্দ্র সেন প্রথম সারির তারই হাত ধরে এসব ঐশ্বর্যেরনাগরিকসমাজে প্রবেশ বলা যায় নগরমঞ্চে এদের পরিবাহন সে সময় থেকেই তার পর থেকে নানা মাধ্যমে পরিবাহন প্রক্রিয়া কখনো স্তিমিত, কখনো বা জোরালো গতিতে অব্যাহত রয়েছে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে লোককাহিনিগুলো পরিবাহনের আরেকটি মাত্রা নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করে নগরকেন্দ্রিক থিয়েটার মঞ্চে কাহিনিগুলো ঐতিহ্য প্রণোদিত অথচ নতুন রীতিতে মঞ্চায়িত হতে শুরু করে লোককাহিনি পরিবাহনের পাশাপাশি অভিনয়রীতি নিরীক্ষার এক বি-ঔপনিবেশিক প্রতিভঙ্গি হিসেবে বিবেচনা করা চলে ধরনের উদ্যোগগুলোকে পাশাপাশিসাংস্কৃতিক পরিবাহন’-এর এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবেও এগুলোকে বিবেচনা করা অসমীচীন নয় তাই দীনেশচন্দ্র সেনকে প্রণতি জানিয়ে লোককাহিনি পরিবাহনের এক সমকালিক প্রবণতাকে গ্রন্থে স্বীকৃতি দেওয়া গেছে লোকজ ধারার সাহিত্য পরিবেশনায়ফুইডিটি যে উদার প্রশ্রয়, তাকে গ্রহণ করে নগরকেন্দ্রিক পরিবাহন-প্রক্রিয়া তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে গ্রন্থটিতে লোককাহিনিনির্ভর তিনটি নাট্য প্রযোজনার সমুদয় বিশ্লেষণ থেকে সমকালে লোককাহিনির পরিবাহন নিরীক্ষা বিষয়ে ধারণা অর্জন সম্ভবফোকলোর’, ‘পারফরম্যান্স স্টাডিজনাট্যকলাবিষয়ের শিক্ষার্থী গবেষকদের জন্য তো বটেই, পাশাপাশি বাংলাদেশের নগরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চায় সংশ্লিষ্ট অভিনেতা-নির্দেশকদের জন্যও গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে

গল্প সুন্দর পুরুষ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৫৬ এএম
সুন্দর পুরুষ
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

‘অ, মাও, শ্মশান থুইয়া..’
সত্যিই এবার বিগড়ে যায় মীনাক্ষীর গলা, মেয়ের প্রতি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ওই মাইয়া, মড়া আছে শ্মশানে? বইয়া থাহুম।’
‘মনে অয় দ্যাশে মড়া কইমা গেছে।’ কথা শেষ করে হাসে সপ্তদশী মেয়ে শচী। অপ্রয়োজনীয় হাসি। এমন হাসির কোনো অর্থ খুঁজে না পেয়ে মীনাক্ষীর রাগ হয়, ‘এ্যাই মাইয়া হাসনের কী হইল? রূপ খুলতাছে তর। মাইয়া, ঐ রূপের বড়াই তর বাপেও করতো।’ 
চুপ মারে রূপবতী শচী। শ্মশান ঘাটের পাশেই অপেক্ষায় ছিল মা আর মেয়ে। জগৎসংসারে মা ছাড়া কেউ নেই ওর। মাকে কষ্ট দেওয়া কী ঠিক! প্রশ্ন জাগে। নিস্তেজ গাং ধরে তাকায়। মনে মনে ভাবে একজন পুরুষকে তো মন দেওয়া হয়ে গেছে। তাকে মা কী মেনে নেবে–এমন প্রশ্নও শচীকে ভাবায়। চৈত্রেরকাল বলে গরমটা খুব তেজি ছিল। কিন্তু হঠাৎ ফুরফুরে হাওয়া আর মরারোদে আদুরে আদুরে হয়ে উঠল সেই রৌদ্রতেজ। এখানেই বাড়িঘর, ঠিকানা। বেড়ে উঠেছে মীনাক্ষীর একমাত্র মেয়ে শচীও। 
শবদেহ এলে শ্মশানপুরোহিতের ডাক পড়ে। শাস্ত্রীয় বিধান দেওয়া হয়। ভোর-সকালে এ বাড়িতে একটা চক্কর দেওয়া নিয়ম যেন তার। কখনো কখনো খবর দিতে হয়, রামচন্দ্র পুরোহিত আসেন, শাস্ত্রীয় আচারপালিত হয়। এরপর মৃতের সৎকার। নানা কাজকর্ম শেষে অর্থকড়ি মেলে। এদিয়েই সংসার চলে মীনাক্ষী আর শচীর। সপ্তাহ দুয়েক ধরে শবদেহ কম আসছে। আয়রুজি কম। ঘরে চাল-তেল নেই।
‘এমুনডা হইতাছে কী কারণে?’ পুরোহিত রামচন্দ্রের কাছে হেতু জানতে চেয়েছিল মীনাক্ষী। সঠিক জবাব নদিতে পারেননি উঠানে জলচৌকিতে বসা রামচন্দ্র। বিড়ি টানেন আর ধোঁয়া ছাড়েন ওপরের দিকে।
প্রসঙ্গ পাল্টায় মীনাক্ষী। পেছনের পাড়ায় রামচন্দ্রের ঘর। তার একমাত্র সন্তান অনন্ত। সবাই ডাকে ছোট ঠাকুর। অনন্তের ব্যাপারে রামচন্দ্রকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘দিনকাল যেমুন পড়ছে। নয়া নয়া অসুখ ধরা পড়তাছে। পোলাডা য্যান সাবধানে থাহে!’
‘আমার পোলা মানুষ হয় নাই, জানোয়ার হইছে। রেপ কেইসের মামলায় হে পয়লা নম্বর আসামি। আর আমি সর্বস্বান্ত।’ একটু থামেন রামচন্দ্র। খানিকটা গর্ব তার চোখমুখে। ‘হুনো, পোলা ছিল আগুনের গোল্লা। এসএসসি-ইন্টারমিডিয়েটে জিপিএ ফাইভ পাইছিল। ইস্কুলের মাস্টরেরা কইল সার্থক জনম আমার। হে নাকি ডাক্তর- এনজিনিয়ার অইব। ওহ্, মাই, হেই পোলা ডাক্তরি পরীক্ষায় চান্স পাইল না, এনজিনিয়ারিংয়ে না। বাড়িতে আইয়া খালি কান্দে।’ আবার থামেন রামচন্দ্র। ‘বিড়িটা নিইব্যা গ্যাছে। গ্যাসলাইট লগে নাই? দিয়াশলাই আছে?’
ঘর থেকে গ্যাসলাইটার এনে হাতে দেয় মীনাক্ষী। রামচন্দ্র বিড়ি ধরিয়ে বললেন, ‘পোলারে হ্যাসকালে কইলাম, ঢাকায় ভর্তি হ। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়। ভার্সিটি থেইকা পাস দিলেও দাম আছে। এহনতো কলেজ-ভার্সিটি বন্ধ। পোলার কামাই খাইমু এমন আশা আর করি না।’ সরল-স্বীকারোক্তির পরে সাবধান-সতর্ক করে রামচন্দ্র বললেন, ‘কিছুদিন থেইকা নাকি তোমার বাড়ি আসতেছে। সাবধানে থাইকো।’
“হ আসে। পোলাডা বিষ্ণুর মতো চেহারা, কতো সুন্দর। আর কী য্যান সুন্দর গানের গলা। ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার গান গাইল। মিডা গলা। সুন্দর ভাষায় কথা কয়। সিনেমার নায়কের মতন ভাষা। আমার মাইয়া শচীর লগে কথা কয়। ম্যালা কথা কয়।” তৃপ্তিমাখা কণ্ঠ মীনাক্ষীর।
‘কী অত কথা?’ উত্তরের জন্য নারীমুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন রামচন্দ্র। 
‘যাই কন, পোলা নাই আমার। আমি বুজি। পোলা অইল বংশের খুডা। মরতে অইবো না! মুখে আগুন দিবো ক্যাডা? মুখাগ্নি করব ক্যাডা?’ 
রামচন্দ্র চলে গেলে স্নানে আসার পর থেকেই আজ সাম্প্রতিক স্মৃতিকথা মনে উদয় হচ্ছিল মীনাক্ষীর। নদীর জলে গলা পর্যন্ত ডুবে আছে ও। কানে বেজে উঠল স্বামীর আরও নানা কথা। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে বলত, ‘কেমুন সুর্মাটানা তুমার চক্ষু, অতো সৌন্দর্য ক্যান তুমার মুখে।’ কী উন্মাদনা ছিল স্বামীর। মায়ার মানুষ ছিল, আদরমাখা গলা। হঠাৎ মরে গেল। চিতাতে রাখা শবদেহে আগুন ধরাতে ধরাতে মরে গেল স্বামী। লোকে বলল, ‘অ্যাতো মদ গিলেছে যে, মাগনা মদে মরেছে।’ ডাক্তার বলল, ‘হার্ট অ্যাটাকে।’ সবগুলো শব্দ একে একে মনে পড়ল মীনাক্ষীর। ‘তোমার সুয়ামি মদে মরেছে।’ কেউ যেন তাকে কানে কানে বলে যাচ্ছে এসব। এরপর বিধবা হওয়ার শব্দটি আড়াল করা হয়। রামচন্দ্রের পরামর্শ ছিল, শাঁখ না ফেলার, সিঁদুর না মোছার। মানুষ নানাকথা বলবে, শ্মশানে বিধবাদের কর্ম তো হতেই পারে না। মৃত্যু মানুষের হবেই, সকলেরই। আত্মা ও অন্তর পরিষ্কার রাখলেই অন্তরাত্মা পবিত্র। সেখানেই ঈশ্বর, প্রভু। তুমি চাইলে তুমিও সৃষ্টিকর্তাকে পাবে। মানুষকে তুমি তুষ্ট করলেই স্বয়ং প্রভু তুষ্ট। আত্মা খুশি তো জগৎখুশি। রামচন্দ্রের বিচক্ষণতা তাকে আস্থাশীল করে তোলে, কখনো বা মনে হয় এই লোকটিই তীর্থস্থানের পূজারি। 
দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে শচীর দিকে একপলক তাকিয়ে ফের মাথা ভেজাতে শ্মশান ঘাটে আরও কয়েকটি ডুব দেয় মীনাক্ষী। শরীর ভেজা তবু পানি ছিটাবে। টলটল পানি নদীতে, স্বচ্ছ কালো জল যেন। নিজের হৃষ্টপুষ্ট শরীর দেখে। বুক সামলাতে কাপড় টানে। দেহ নিয়ে কল্পনা করাও পাপকর্ম। এরপর সূর্যের দিকে তাকায়। নিরুত্তাপ সূর্য। বেলা গড়িয়ে বিকেল কিনা। 
উপশহর এলাকায় থিতু হয়ে থাকা শ্মশান ঘাটের অদূরের বাড়িটিতেই জীবনের বড় সময় ধরে আছে মীনাক্ষী। বিয়ের পর কত কিছু বদলে গেছে এখানকার। আগে ছিল নদী। এখন মাটি ভরে ভরে নদীভরাট হয়ে শুকিয়েছে। দূরের দিকে ছোটখাটো খাল। পাশে থাকা কচুরিপানা ভর্তি খালটার এখন অস্তিত্ব নেই। আর দখলবাজদের অত্যাচারে স্রোতধারা নদী হয়েছে সরু। নাম জানা না জানা সারসার গাছ ছিল পাড় ঘেঁষে। এসবের কিছু আছে তবে বড়গাছগুলো রাতের অন্ধকারে অনেকদিন আগেই কেউ কেটে নিয়ে গেছে। হিন্দুদের শ্মশানের জায়গা দখল হয়ে কাঠচিড়াইয়ের কারখানা। জমজমাট দোকান আনোয়ার টি স্টল লেখা। খানিকটা দূরে হোমিওপ্যাথির দাওয়াইয়ের দোকান ছিল, এটি এখন হয়েছে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের দোকান।
আকারে ছোট হয়ে আসছে শ্মশান। বিয়ের সাড়ে ১৮ বছরে অনেক বদলে গেছে দুনিয়া। মেয়ে স্কুল বাদ দিয়েছে গত সন। মা-মেয়ের ছোট সংসার। দুশ্চিন্তা ছিল না শচীর জন্য। কিন্তু মেয়ের প্রতি সেই মুগ্ধভাবটা আর যেন নেই এখন। 
স্নান সেরে নদীর পাড়ে ওঠে মীনাক্ষী। গামছা জড়িয়ে নেয় বুকে। এদিক-ওদিক তাকায়। পিঠছেঁড়া ব্লাউজ বদলায়। স্বামী গত হওয়ার পর থেকে সতীত্ব টিকিয়ে রাখতে একযুগ ধরে পৃথিবীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে মীনাক্ষীর। হিন্দু-মুসলমান পুরুষরা একসঙ্গে মিলেমিশে গিলে খেতে চায় শরীরটা। জাতপাত যায় না। তখন ছোটগোত্রের প্রশ্নও ওঠে না। কাঁখে এক কলস পানি নিয়ে ঘরমুখো হাঁটতে শুরু করে। অদূরেই ছাপরাঘর। ঠিকানা বলতেই এই ভিটে-বাড়ি। চোট্ট এক চিলতে উঠান। বাড়ির কোণে একজোড়া হাঁস। হেলেদোলে দূর্বাঘাসে খাবার খোঁজে। মুহূর্তেই মনোযোগ সরে যায়, কণ্ঠে বিরক্তি ঝরে মীনাক্ষীর, হাঁসগুলোর ওপর সকল রাগ। ‘দিনভর গাঙে খাইলে–হেরপরও পেট ভরে না!’ 
ঘরে ঢুকতে যাবে তখনই মীনাক্ষীর মনে কী যেন নড়ে উঠল। শচীর দিকে চোখ নেচে বেড়ায়। কোনোদিন না হলেও আজ হঠাৎ কঠিনতর ভাবনায় মন বিষিয়ে ওঠে। বিয়ে দেওয়া চাই মেয়েটার। 
‘মাও, কী হইচে?’
মায়ের জবাব না পেয়ে শচীর চোখে-মুখে অকারণ হাসি।
মীনাক্ষীর কণ্ঠ কঠিন, ‘ওই মাইয়া হাসস ক্যান? বয়স অইতাছে না। বিয়া দিতে অইব না তোরে? ট্যাকা পামু কই, ক্যাডা দিব?’
মিঠে করে হেসে শচী বলল, ‘ট্যাকা দেওনের মাইনষের অভাব অইব?’
‘কইলি কী? মাইয়ার সাঅস, কী?’ গোখরা সাপের মতো ফুঁসে ওঠে মীনাক্ষী। 
এখন বিকেল। চুপ মেরে ঘরের বারান্দায় মাটিতেই বসে পড়ে শচী। লম্বা ডাগর হাত দুটি নাচায়। টানাটানা চোখে তাকিয়ে থাকে। একটু পর বলে, ‘মাও, যাইগা লও এ্যাইহান থেইকা।’
মীনাক্ষী ঘাড় ঘুরিয়ে বড়বড় চোখে তাকায়। ‘মাইয়া, কী কইলি তুই?’
‘হ, ঠিক কইচি। দিনকাল বদলাইছে না? শ্মশানে কেউ পইড়া থাকে, কও?’
গামছা দিয়ে চুল শুকোচ্ছিল মীনাক্ষী। মুখ ঘুরিয়ে তীব্র আপত্তিমাখা কণ্ঠে বলল, ‘কই যামু, কই যামু?’
‘ভাল্লাগে না।’
‘কইলি অইব? এ্যাইডা তর বাপের ঠিকানা, এ্যাইখানেই রুটি-রুজি। আমাগো ঘরবাড়ি।’ 
‘ভাল্লাগে না, সমাজ নাই, জ্ঞাতিগোতী নাই। ক্যাডা আছে, এ্যাইখানে?’ 
চমকে ওঠে মীনাক্ষী। কয়েক মাস থেকেই মেয়ের কথাবার্তা, আচরণ, পোশাক পরার কায়দা, চলাচল সবকিছুর একটা পরিবর্তন লক্ষ করছিল। মেয়ের কথায় ভীষণ বিরক্ত হয়ে মীনাক্ষী বলে, ‘যাগা তুই, যেইদিকে চোখ যায়, যা! আমারে মুক্তি দে।’
‘হ, যামু।’ 
মোবাইলে চটুল বাজনা আর গান বেজেই চলেছিল। মীনাক্ষী অনুমান করে নিশ্চয়ই শচীর কর্ম। ছোট ঠাকুরের সঙ্গে মেশামেশি করে মেয়ের মাথা গেছে। চঞ্চলতা বেড়েছে। লাউয়ের ডগার মতো হাত নেড়ে হাতপাখার বাতাস খায় শচী। 
আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কাপড় বদলা, আমার লগে আয়।’ 
তাৎক্ষণিক জবাব দেয় না শচী। 
বালিশের তলায় থাকা কভারের রং ওঠা, গ্লাসভাঙা, ছোট মোবাইল ফোনটি হাতে এনে কোমরে গুঁজে নেয় মীনাক্ষী। দৃষ্টিতে পড়তেই কাপড়ের ছেঁড়া অংশ ঘুরিয়ে গুছিয়ে পরে। নিজের সাজগোজ বলতে সরিষার তেল মাথার চুল লেপ্টে মাখা। গায়ে আঁটসাঁট হয়ে থাকা ব্লাউজটি টেনেটুনে ঠিক করে। এরপর মুখে জর্দাপান ঢুকিয়ে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী কই, আমার লগে আয়।’
‘এহন, কই যামু?’
‘তর ডানা মেলছে না, পাখা ছাটুম। পায়ে বেড়ি লাগামু।’
শচী জানে কোথায় যাবে মা। এখন পাশের ভাঙাহাটে যাবে। কমদামের ছোট মাছ, বাসি লাউ, পচা কচুরলতি আনতে যাবে। 
ঘণ্টাখানেক পর বাজার সেরে ঘরে ফিরে মীনাক্ষী। বিকেল গড়িয়ে গেছে কখন, খেয়াল নেই। দরজায় পা রেখেই মীনাক্ষী ডাক পাড়ে মেয়েকে, ‘শচী, অরে শচী?’
অবাক হয় শচীর আওয়াজ না পেয়ে। 
‘শচী গেলি কই?’
চারদিকেই যেন নিস্তব্ধতা। শুধু মাথার ওপর দিয়ে একজোড়া কাক ওড়ে গেছে।
‘শচী?’
ঘরের কোণে কাঁথা জড়ানো বস্তুর দিকে তাকায় মীনাক্ষী। চুলগুলো দেখে অনুমান হয় শচীই হবে। কেউ কী কাঁথার ভেতর ওর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। চৈত্রকালে কাঁথা কেন! চোখের ভুল হতে পারে। নানান জিজ্ঞাসা মনে তার। 
উঠানের কাপড় তুলে ঘরে আনতে যাবে তখনই কেউ যেন মীনাক্ষীকে ফাঁকি দিয়ে কুঁড়েঘর থেকে বের হয়েই দৌড় দেয় সড়কের দিকে। নিমিষে চলে যাওয়া মানবটির গড়ন যেন পরিচিত।
‘ক্যাডা? ক্যাডা যাও?’ মীনাক্ষীর উচ্চকণ্ঠ।
পরিষ্কার চোখে ধরা পড়ে যে, এ লোকটি অনন্ত, ছোট ঠাকুর; রামচন্দ্র ঠাকুরের ছেলে। বুঝতে কষ্ট হয় না, কী হয়েছে। কেন এসেছিল ছোট ঠাকুর। 
হাতের ঝাড় রেখে ঘরে ঢোকে মীনাক্ষী। ‘ছোড ঠাকুর ক্যান আইছিলো, শচী?’ 
ছোট ঠাকুরের সঙ্গে লুকোচুরি খেলার সময়ে মা এসে পড়েছে; এমন মুখভঙ্গি করে কিংবা এটা বোঝাতেই শচী বলল, ‘লুকাইন্যা খেইল খেলছিলাম।’
ভীষণ চমকে গিয়ে অবাক হয়ে দেখল মেয়েকে। এলোমেলো চুল আর ঘর্মাক্ত কিশোরীর চোখ-মুখের দিকে তাকিয়ে নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারে এই লুকোচুরির 
অর্থ কী। এরপর জোরে জোরে কেঁপে কেঁপে চিৎকার 
করে মীনাক্ষী বলল, ‘শচী, নিজের এমন সর্বনাশ করলি ক্যান?’
মাথা নিচু করে নিরুত্তর থাকে শচী। অতীব সুন্দরী মেয়ের এমন মুখভঙ্গি অসহ্য ঠেকে। মীনাক্ষী খেয়াল করে দরদর ঘাম মেয়ের শরীরে। এই ঘাম পশুর ওপর নৃশংস ছুরি চালানো রক্তের মতোই মনে হয় মীনাক্ষীর।

কবিতা জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়!

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৪২ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়!
খবরের কাগজ গ্রাফিক্স

আমরা কি বেঁচে আছি?
বেঁচে নেই আমাদের ভালোবাসাও!
কে বলেছে ভালোবাসা একবার
হয়। কতো গভীর সম্পর্কও একদিন
হয়ে যায় ফিকে।
হয়তো কিছু একটা আঁকড়ে ধরে
বাঁচার চেষ্টা ভালো থাকার অভিনয়।
এভাবে জীবন একদিন শেষ হয়ে
যায়। জীবন বহতা নদীর মতো 
বয়ে চলে অবিরাম।
যেখানে তার উৎপত্তি সে ফিরে
আসে না কখনো সেখানে, প্রতিনিয়ত
ছুটে চলে সাগরের পানে মিশবে বলে।
কিছু ভালোবাসা চরম ভুল।
সুনামির চেয়েও ভয়ংকর, আবেগ
কিংবা কিছুটা মোহ। মোহ কেটে
গেলে সব শেষ। মনের হদিস কেউই
জানে না। মনের বন্ধ দরজা আর
খোলা যায় না একজীবনেও। কিছু
স্মৃতিও একদিন বিস্মৃতির আড়ালে
চলে যায়। জীবনের সকাল, দুপুর,
সন্ধ্যা! রাত্রি শেষে আর জীবনের
সকাল হয় না, যত আকুতি জানানো
হোক না-কেন। জীবনের কিছু পথে দুবার
হাঁটা হয় না এবং  যায়ও না। মানুষ সময়ের
সাথে বদলে যায়। এভাবে চলতে
চলতে জীবন একদিন শেষ হয়ে যায়।