চতুর্থ পর্ব
দেশবরেণ্য লেখক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাদেশের একজন অভিভাবক, বাঙালির বাতিঘর এই শিক্ষাগুরু সবার স্যার। শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি যেমন অনন্য অবদান রেখেছেন, তেমনি সাহিত্য সমৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তিনি অসামান্য ভূমিকা রাখছেন। সেই ছোটবেলায় তার লেখালেখিতে হাতে খড়ি। ৮৯ বছর বয়সেও তিনি নিয়মিতই লিখছেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, অবসর গ্রহণের পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। চব্বিশ বছর ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকাটি সম্পাদনা করছেন। এক শ বাইশ গ্রন্থের রচয়িতা। লেখালেখির জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
তা ম্যাট্রিকটা তো পাস হলো, এবার কী করবেন? ধারেকাছে এমন কোনো কলেজ ছিল না যেখানে তিনি ভর্তি হতে পারেন। মুন্সিগঞ্জে হরগঙ্গা কলেজ স্থাপন অনেক বছর পরের ঘটনা। কলেজে পড়তে হলে সেই কলকাতায় গিয়ে থাকতে হয়। সেটা ছিল অসম্ভব এক কল্পনা। কলকাতায় আত্মীয়স্বজন বলতে এমন কেউ ছিলেন না যিনি ছেলেটিকে তার বাসায় আশ্রয় দিতে পারেন। ছিলেন যারা তারা নিজেরাই ছিলেন প্রায় নিরাশ্রয়। ছোটখাটো কাজকর্ম করতেন, কারণ তাদের লেখাপড়ার সুযোগ ঘটেনি। সবচেয়ে ভালো অবস্থায় ছিলেন যিনি তিনি কাজ জোগাড় করতে পেরেছিলেন আমেরিকান এক কোম্পানিতে, তাও অফিসে নয়, কর্মকর্তার বাসগৃহে। এরা স্বামী-স্ত্রী কলকাতায় থাকতেন, তাদের গৃহে অন্য কেউ ছিলেন না। এদের একজন দেশি কেয়ারটেকার আবশ্যক ছিল। সাহেব ও মেম সাহেবের খাবার-দাবারের জন্য কী কী দরকার কেয়ারটেকার প্রতিদিন সকালে তা জেনে নিয়ে বাজার করতেন, বাবুর্চিকে বুঝিয়ে দিতেন। মাঝে-মধ্যে পার্টি হতো, তখন বিশেষ কী রকমের খাওয়া-দাওয়ার প্রয়োজন তা জেনে নিয়ে তদনুযায়ী আয়োজন করতেন। মোগলাই স্টাইলে তার পদবিটা ছিল খানসামা। নামটি ইংরেজদের দেওয়া; তাদের ভাবসাব ছিল মোগল বাদশাহদের মতোই। বড়দিনের ছুটিতে সাহেব-মেম নিজেদের দেশে চলে যেতেন, আমাদের ওই আত্মীয়টি তখন ছাড়া পেতেন গ্রামে আসার। তা খালি হাতে আসতেন না। বিশেষভাবে যা আনতেন তা হলো দুষ্প্রাপ্য এবং অতিশয় আকর্ষণীয় শুকনো খাবার- স্লাইস করা পাউরুটি, টিনের মাখন, প্যাকেটের বিস্কুট, বয়মে জেলি। এসব সামগ্রীর কিছু কিছু আমাদের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে যেত। কলকাতাবাসী আরেক আত্মীয় শুনতাম সুদের ব্যবসা করেন, কল্পনা করতাম তিনি নিশ্চয়ই ভয়ংকর চেহারার কেউ হবেন; কিন্তু যখন গ্রামে এলেন এবং নিজের কন্যাসন্তানটির জন্য নিয়ে এলেন নানা আকৃতির ও শোভার খেলনা, তখন দেখলাম তিনি আমাদের আপনজনদের মতোই স্নেহভরপুর একজন মানুষ। মাতৃ-পিতৃহীন আমার বাবাকে এরা যতই স্নেহ করুন এদের কারও পক্ষেই সম্ভব ছিল না কলকাতার মতো হৃদয়হীন ব্যস্ত শহরে তাকে আশ্রয় দেওয়া। ওদিকে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটিও তো এই সময়েই ঘটে; আমার বাবার অল্পবয়স্ক অভিভাবক ফরহাদ চৌধুরী মারা যান।
পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্নবিলাসিতা ছেড়ে দিয়ে আব্বা কলকাতায় গিয়ে হাজির হন, কর্মের সন্ধানে। উঠেছিলেন কলিন্স লেনের যে বাসাটিতে গ্রামবাসী কয়েকজন মেস করে থাকতেন সেখানেই। ওঠা মানে মাথাগোঁজার ঠাঁই পাওয়া। এদের কলকাতা কথিত বঙ্গীয় রেনেসাঁসের শহর ছিল না, ছিল সস্তা বাসস্থানের অলিগলি। অনেকটা সেভাবেই থাকতেন, বাংলাদেশের প্রবাসীরা এখন যেভাবে থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে এবং ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন শহরে।
রোজ সকালে আব্বা গভীর আগ্রহে পত্রিকায় কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখতেন। তার পর রাইটার্স বিল্ডিংসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক কার্যালয়ের বারান্দায় ঘোরাফেরা করতেন ভ্যাকেন্সি আছে এমন নোটিশের খোঁজে। এমনি এক দুপুরে রাইটার্স বিল্ডিংয়ের দোতলায় ১৫-১৬ বছর বয়সী ওই কিশোরটি হাঁটাহাঁটি করছিলেন। গরমের দিন, সকালে হয়তো ভালো নাস্তা খাওয়াও হয়নি, কোথাও চাকরির কোনো সম্ভাবনা দেখেননি, ক্লান্ত হয়ে একটি অফিসের দরজার সামনে নিয়ন্ত্রণ ও জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। একটু হইচই ঘটে; তাকে অফিসের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। অফিসের কর্মকর্তা ছিলেন এক ইংরেজ, তার সঙ্গে আলাপ করছিলেন স্টেটসম্যান পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আর্থার মুর। পরিচর্যায় জ্ঞান ফিরলে তারা দুজনে কিশোরটির সঙ্গে কথা বলেন। তার প্রয়োজনের বিষয়ে জানতে চান। এবং সহানুভূতিশীল আর্থার মুর স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে বেঙ্গল পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেলের কাছে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টরের পদে কিশোরটিকে নিয়োগ দানের জন্য সুপারিশ করে চিঠি লেখেন। সেকালে পুলিশের চাকরিতে পরীক্ষা ছিল, কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো সুপারিশকে। কেননা, তাতে নিশ্চিত হওয়া যেত যে, প্রার্থীটি নির্ভরযোগ্য। ওদিকে পত্রিকায় সম্পাদকরা তখন বেশ মর্যাদাবান ছিলেন; বিশেষ করে যে পত্রিকা ইংরেজদের মালিকানাধীন সে পত্রিকার সম্পাদক তো বটেই। আব্বার পুরোনো কাগজপত্র তেমন রক্ষিত হয়নি; পোকায় কেটেছে, পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে, রক্ষায় তিনি যে মনোযোগী ছিলেন তাও নয়, যে কয়টি কাগজ আমরা তার মৃত্যুর পরে দেখেছি তার মধ্যে একটি হচ্ছে আর্থার মুরের চিঠির জবাবে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশের অফিস থেকে বেঙ্গল ক্লাব, ক্যালকাটা ঠিকানায় পাঠানো একটি চিঠি, যাতে বলা হয়েছে- প্রার্থী যেন তার জেলার পুলিশ সুপারের কাছে আবেদনপত্র জমা দেন। কাগজপত্রের মধ্যে আরেকটি ছিল ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তার কৃতকার্যকতার টেস্টিমনিয়াল; সেটিতে সই করেছেন স্কুলের হেডমাস্টার সুরেন্দ্র চন্দ্র পাল চৌধুরী।
আব্বা গ্রামে ফিরেছিলেন এ সুসংবাদ নিয়ে যে পুলিশ বিভাগে তার চাকরি হওয়ার আশা আছে। সুপারিশকারী ভদ্রলোক জানিয়েছিলেন যে, শরীর-স্বাস্থ্য, জ্ঞানবুদ্ধি এবং সর্বোপরি সুপারিশের বিবেচনায় আব্বার নিয়োগ না পাওয়ার কারণ নেই। কিন্তু ছেলে পুলিশের চাকরি নেবে শুনে আমার দাদি মোটেই সন্তুষ্ট হননি। ওই কাজ তার ছেলের জন্য বিপজ্জনক হবে বলে তার বিশ্বাস। এক ছেলে চলে গেছে, অবশিষ্টটি বিপদের ঝুঁকি নেবে, চোর-ডাকাত ধরতে রাতবিরাতে বনবাদাড়ে ছোটাছুটি করবে ভেবে তাকে নাকি দুশ্চিন্তাগ্রস্তই দেখা গেছে।
মায়ের মন বুঝে আব্বা ফেরত গেছেন কলকাতায়। ঘোরাফেরা করে চাকরি পেয়েছেন এক বিদেশি কোম্পানিতে। তাদের ছিল রাবারের ব্যবসা। আসাম, বার্মা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরে রাবার উৎপাদন করাত এবং চালান দিত নানা দেশে। সে কাজ কিছুদিন করে, সরকারি চাকরির জন্য পরীক্ষা দিয়ে পাবলিক হেলথ ডিপার্টমেন্টে নিয়োগ পান; এবং কিছুদিন পরে যান ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট। ইনকান ট্যাক্সের তখন নাম ছিল সেলস ট্যাক্স, পাশাপাশি ছিল অ্যাগ্রিকালচারাল ইনকাম ট্যাক্স, পরে পাকিস্তান আমলে দুটি একত্র হয়ে নাম নেয় ইনকাম ট্যাক্স। ১৯৬৩-তে অবসর গ্রহণের সময় পর্যন্ত ওই দপ্তরেই ছিলেন। অফিসার ছিলেন না, ছিলেন হেড অফিসের অফিস সুপারিনটেনডেন্ট।
ঝোপঝাড় ও রোগ-জীবাণুতে পরিপূর্ণ আমাদের ওই গ্রামে কবি জীবনানন্দ দাশ তার রূপসী বাংলায় যে ধরনের গাছ, পাখি, লতাপাতা, ঘাস, নদী, ফসলের কথা বলেছেন সে সবের কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। তবে অসুবিধা ছিল একটাই। সেটা এই যে, সেখানকার মানুষের পক্ষে ওসবের ভেতরে সৌন্দর্য দেখতে পাওয়াটা মোটেই সহজ ছিল না। সবাই ছিলেন ভুক্তভোগী। বর্ষায় যখন নতুন পানি আসত, দেখা যেত খলবল করছে মাছ, কিংবা নৌকা নিয়ে খাল বেয়ে যখন ইছামতী নদীতে পড়া যেত, কিংবা আড়িয়ল বিলের ভেতর দিয়ে যখন নানাবাড়িতে যাওয়া ঘটত, অথবা কোনো আত্মীয়স্বজনের নৌকা যখন বিল পার হয়ে এসে ঘাটে ভিড়ত তখন আমরা নির্মল আনন্দ পেতাম। পাখির, বিশেষ করে ঘুঘুর ডাক খুব মধুর শোনাত। গাছ থেকে আম পড়ে উঠান ভরে যাওয়াতেও সৌন্দর্য ছিল। খুশি হতাম মাছ ধরতে পারলেও। কিন্তু এসব ছিল স্বল্পকালীন। মেলাতেও গেছি, কিনেছি জিনিসপত্র; নদীতে নৌকা বাইচও ছিল উত্তেজনাকর। তবে স্থায়ী ছিল অন্ধকার। এবং বিষণ্নতা। এখন মনে হয় এ বুঝি সেই বিষণ্নতা যা বহন করে জহুরুদ্দীন চৌধুরী একদা এই সীমান্ত-প্রান্তে এসেছিলেন, ছিন্নমূল হয়ে। আর এর মধ্যেই আমি ভয় পেতাম এমন দুঃস্বপ্ন দেখে যে অন্ধকারে বিরাট এক মাঠে হারিয়ে যাচ্ছি। একাকী হয়ে। ভয় ছিল সন্ধ্যার পরে দেখা বাড়ির সামনের বিরাট বটগাছটিকেও।
১৯৪২ সালেই হবে, তখন বিশ্বযুদ্ধ চলছে; যুদ্ধের ধাক্কায় গ্রামে কিছু পরিবার চলে এসেছে, আব্বার এক চাচাতো বোনও এসেছেন। তারা কলকাতায় ছিলেন। ফুপা কলকাতা পুলিশে কাজ করতেন। আমার ওই ফুপুর দুই ছেলের মধ্যে একজন ছিল আমার বয়সী; তার সঙ্গে ভারি বন্ধুত্ব আমার, আবার ঝগড়াঝাটিও তার সঙ্গেই। তার বড় ভাইটি শেখরনগরের স্কুলে ভর্তি হয়েছেন। খুবই আমুদে মানুষ ছিলেন তিনি। মাতিয়ে রাখতে চাইতেন। কিন্তু কীভাবে সেটা করবেন? উপকরণ তো নেই। তার কাছে একটা ঋণ রয়েছে আমার; তার উদ্যোগেই আমি সাঁতার শিখেছিলাম, আমার ভাইবোনদের কেউই যা শিখতে পারেনি। ওই ভাই- গিনিদা বলতাম আমরা- কাগজে বড় বড় হরফে লিখে আশপাশের গাছে টানিয়ে দিয়েছেন একটা বিজ্ঞপ্তি, ‘আসিতেছে আসিতেছে ম্যাজিক খেলা, পুকুরের পাড়ে ওই গাবগাছ তলা’। সে খেলা সত্যি সত্যি এসেছিল কি না, এসে থাকলেও কী কী চমকপ্রদ জিনিস তিনি প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তার কিছুই মনে নেই; তবে বুঝেছিলাম যে ম্যাজিক দেখাবেন এই ধারণাটা তিনি পেয়েছিলেন চৈত্রসংক্রান্তির মেলায় গিয়ে, যেখানে আমিও গিয়েছিলাম অন্যদের সঙ্গে; এবং একটি তাঁবুর ভেতরে জাদুর খেলা দেখেছিলাম; সেটুকু ছাড়া অন্য কিছুই স্মরণ করতে পারব না। গ্রামে আনন্দ ছিল না। বরং বিষণ্নতা যে কুয়াশার মতো বিছিয়ে ছিল সেটা স্মরণ করতে পারি। উঠানে নতুন ধান মাড়ানোর সময়ে ব্যস্ততা দেখেছি ঠিকই, কিন্তু খুব একটা আনন্দ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার টাপুরটুপুর শব্দ, বর্ষার পানিতে উঠানে মাছ উঠে আসা, বৈশাখের ঝড়ে আম কুড়ানোর উৎসব, নদীতে মাঝিদের গলা ছেড়ে গান গাওয়া, আড়িয়ল বিলে গিয়ে মাছ ধরার আয়োজন ও শাপলা ফুলের সমারোহ দেখা, বেদেদের নৌকা থেকে সওদাপাতি কেনায় মেয়েদের তৎপরতা, এসব ছিল; তবে ওই যে বললাম সবই ছিল সাময়িক ঘটনা, স্থায়ী ছিল বিষণ্নতা।
পরের কালে অনেক সময়ে মনে হয়েছে যে, পরিবেশের সমগ্র বিষণ্নতাটা যেন মূর্ত ছিল আমার দাদির চলাফেরায়, কাজকর্ম, এমনকি চেহারাতেও। ছায়া নয়, ছোঁয়া নয়, তারও বেশি। এর মধ্যেই সব কর্তব্য তিনি পালন করতেন। আব্বা থাকতেন রাজশাহীতে, পরিবারের কর্তা ছিলেন বৃদ্ধা ওই মহিলাই। পালক ছেলেটির সময়মতো বিয়ে দিয়েছেন তিনিই।
চলবে...