যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের নির্বাচনে ফল জালিয়াতির চেষ্টার অভিযোগে করা মামলা খারিজ করেছেন দেশটির আদালত।
স্থানীয় সময় সোমবার (২৬ নভেম্বর) মামলাটি খারিজ করেন বিচারপতি তানিয়া চুটকান।
এর আগে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এই ফৌজদারি মামলাটি করেছিলেন মার্কিন সরকারের বিশেষ কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথ। তবে সোমবার স্মিথ নিজেই মামলাটি খারিজ করতে আদালতে আবেদন করেন।
পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদ শেষে নিজের কাছে সরকারি গোপন নথি রাখার অভিযোগে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে মামলাটি করা হয়েছিল সেটিও খারিজের আবেদন করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনে জয়ের পর প্রেসিডেন্ট পদে বসলে তার বিরুদ্ধে করা মামলা খারিজ করতে হবে।
কারণ এতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এ কারণেই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা খারিজের আবেদন করেন বলে জানিয়েছেন স্মিথ। তবে তার সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা চলবে বলে জানান তিনি। এতদিন মামলা দুটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে লড়েছেন স্মিথ। যদিও দুই মামলাতেই নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছিলেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুটি প্রধান ফৌজদারি মামলা-
২০২০ সালের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ
২০২২ সালে এই মামলাটি করা হয়। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টার অভিযোগে এই মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল স্মিথকে। পরের বছর স্মিথ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চারটি ফৌজদারি অভিযোগ করেন। যার মধ্যে প্রতারণা এবং সরকারি কাজ বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ওয়াশিংটন ডিসির বিচারক তানিয়া চাটকান এটির বিচার শুরু করেছিলেন। তবে ট্রাম্প তার পক্ষে আইনি সুরক্ষা দাবি করায় বিচার কার্যক্রম পিছিয়ে যায়।
গোপনীয় দলিল মামলা
২০২২ সালে স্মিথ ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মার-এ-লাগোতে গোপনীয় দলিল রাখা এবং সেই দলিল ফেরত দেওয়ার জন্য এফবিআইকে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। এফবিআই ১০০টির বেশি গোপন দলিল উদ্ধার করে এবং ট্রাম্পের আইনজীবীরা আরও চারটি দলিল ফিরিয়ে দেন।
তবে জুলাই মাসে, ফ্লোরিডার বিচারক অ্যাইলিন ক্যানন এই মামলাটিও বাতিল করেন। কারণ তিনি মনে করেন, স্মিথের নিয়োগ সংবিধানবিরোধী ছিল।
কেন নির্বাচন হস্তক্ষেপের মামলাটি বাতিল হচ্ছে?
সরকারি নীতি অনুযায়ী, প্রেসিডেন্সিয়াল ক্ষমতা থাকা অবস্থায় একজন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা যায় না। কারণ তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হলে তার প্রশাসনিক ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করা হবে, যা সংবিধানবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে এই নীতি প্রচলিত রয়েছে। প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করা অসাংবিধানিক বলে মনে করে বিচার বিভাগ।
প্রাক্তন ফেডারেল প্রসিকিউটর নেয়ামা রহমি বিবিসিকে বলেন, ‘এটা সুপ্রতিষ্ঠিত যে একজন বর্তমান প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না।’
স্মিথের দাখিল করা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আইনি পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সংবিধান অনুযায়ী একজন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। যার কারণে তিনি মামলাটি প্রত্যাহার চেয়ে আবেদন করেছেন।’
এই মামলা ভবিষ্যতে আবার কী হতে পারে?
স্মিথের দাখিল করা পিটিশনের শেষ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে করা এই মামলাটি বাতিলের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে এই মামলা বাতিল চাওয়ায় অন্য কোনো মামলা পুনরায় দাখিল করার অধিকারকে নষ্ট করে না।’
এর মানে হচ্ছে, যদি সংবিধানগত বা আইনি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয় তবে মামলাটি পুনরায় দাখিল করা হতে পারে। অনেক আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নতুন কোনো প্রশাসনের সময় এই মামলা পুনরায় দাখিল করা কঠিন হতে পারে।
ট্রাম্পের সহ-অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা চলবে?
ট্রাম্পের সহ-অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকবে। আইনজীবী স্মিথ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ট্রাম্পের সহকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকবে। কারণ তাদের জন্য প্রেসিডেন্টের সাময়িক নিরাপত্তা বা অভিভাবকত্বের কোনো বৈধ দাবি নেই।
ট্রাম্পের অন্যান্য আইনি মামলা
এ ছাড়াও, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরও দুটি রাজ্য মামলা চলছে এবং বিভিন্ন দেওয়ানি মামলা রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে স্টর্মি ড্যানিয়েলস ‘হাশ মানি’ কেস, জর্জিয়ায় নির্বাচন জালিয়াতির অভিযোগ এবং আরও অনেক। ২০২৩ সালের মে মাসে, ট্রাম্পকে ৩৪টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। যার মধ্যে ছিল ব্যবসায়িক রেকর্ড জালিয়াতি করে হাশ মানি বিষয়টি আড়াল করা।
ট্রাম্প ও তার দলের প্রতিক্রিয়া
এই মামলার বাতিল হওয়ার পর ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স এবং ট্রুথ সোশ্যাল-এ জয়োচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। এই মামলাকে ‘রাজনৈতিক হাইজ্যাক’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পোস্টে তিনি ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ স্লোগান দেন।
তার যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেং বলেন, ‘আজকের সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের জন্য একটি বড় জয়।’
ট্রাম্প কী নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন?
গত ৫ নভেম্বর ট্রাম্প নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর তিনিই হচ্ছেন প্রথম আদালতে দোষী সাব্যস্ত অপরাধী প্রেসিডেন্ট। স্টর্মি ড্যানিয়েলস মামলা থেকে হোয়াইট হাউস দখল করার অভিযোগে অভিযুক্ত তিনি।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ক্ষমা পাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে, তবে কি তিনি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন?
যদিও সংবিধান স্পষ্টভাবে বলে না যে একজন প্রেসিডেন্ট নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেন কি পারবেন না। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘আত্ম-ক্ষমা’ বেআইনি হবে না।
কিন্তু এ নিয়ে আইনি বিশ্লেষকদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। ১৯৭৪ সালের এক বিচার বিভাগীয় স্মারকলিপি অনুযায়ী, কেউ তার নিজের ক্ষেত্রে বিচারক হতে পারে না। সূত্র: আল-জাজিরা
তাওফিক/অমিয়/