মধ্যপ্রাচ্যের সংকটময় পরিস্থিতিতে এবার ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট সিনেটররা।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ১৩ জন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা একটি চিঠিতে সই করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থা অ্যাক্সিওস এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে।
ওই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে গতকাল সোমবার লাইভ প্রতিবেদনে আল-জাজিরা জানায়, এ পদক্ষেপটি গাজায় ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটায়।
এর আগে বিশ্বের তিনটি প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশ— ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডা ssফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়া ইতোমধ্যে ১৪০টিরও বেশি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সম্প্রতি সিনেটে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপন করেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ব্রায়ান শ্যাটজ। এতে আল-আকসা অঞ্চলসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ গঠনের লক্ষ্যে ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিলটিতে বলা হয়, ‘ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়ে তাদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে।’
এই বিলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চকক্ষ সিনেটের ৫১ জন ডেমোক্র্যাট সদস্যের মধ্যে ৪৯ জন ভোট দেন, যা দলটির ঐক্যবদ্ধ অবস্থানেরই প্রমাণ। শ্যাটজ বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, দ্বিরাষ্ট্র সমাধানই হলো টেকসই শান্তির পথ। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন- দুটি রাষ্ট্র পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবে- এটিই আমাদের প্রত্যাশা।’
তবে এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান ও জো ম্যাঞ্চিন। ফেটারম্যানের অফিস থেকে জানানো হয়, তিনি দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে থাকলেও মনে করেন, হামাসকে নিষ্ক্রিয় না করা পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। অন্যদিকে ম্যাঞ্চিন বলেন, ‘যদি ফিলিস্তিনি জনগণ আন্তরিকভাবে ইসরায়েলের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে আমি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রথম সমর্থকদের একজন হব।’
এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি রো খান্নার নেতৃত্বে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ১৩ জন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান। এই চিঠিতে লেখা হয়, ‘এই মর্মান্তিক মুহূর্তটি বিশ্ববাসীর সামনে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে নিয়ে এসেছে।’
চিঠির স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন চেলি পিংগ্রি, নাইডিয়া ভেলাজকুয়েজ, জিম ম্যাকগভর্ন, গ্রেগ ক্যাসার, লয়েড ডগেট, ভেরোনিকা এসকোবার এবং আন্দ্রে কারসনের মতো প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট নেতারা।
গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত হামলা এবং অবরোধে এখন পর্যন্ত ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক আহ্বান উপেক্ষা করে দখলদার বাহিনী ২০২৩ সাল থেকে একের পর এক বর্বর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। অঞ্চলজুড়ে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয়ের সংকট।
এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটদের নতুন করে সমর্থন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও এখনই বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তন হচ্ছে না, তবে এই অবস্থান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে- ইসরায়েলের একক আধিপত্য নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রীয় অধিকার রক্ষার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের এই অবস্থান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক মনোভাবের সরাসরি বিরোধিতা। কারণ তিনি সম্প্রতি একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক মহলের দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের প্রধান মিত্র হলেও বাইডেন প্রশাসন এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এখন দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে জনমত স্পষ্ট হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরও গুরুত্ব পাবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সূত্র: আল-জাজিরা, টাইমস অব ইসরায়েল