ভারতের অন্যতম শান্ত ও অনিন্দ্যসুন্দর পর্যটন এলাকা লাদাখ। ভারতের উত্তরতম প্রান্তে অবস্থিত দেশটির সবচেয়ে শান্ত ও নির্জন এই এলাকা এখন উত্তাল বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ আর কারফিউয়ের মতো উচ্চকিত পরিস্থিতিতে।
লাদাখ-চীন সীমান্তের গালওয়ান ভ্যালিতেই কয়েক বছর আগে ভারতের সঙ্গে চীনের সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘাত হলেও লাদাখের অভ্যন্তরে তার আঁচ আসেনি বললেই চলে। এমনকী পুরো ভারতে অপরাধের হার সবচেয়ে কম লাদাখে। এরকম ‘স্বর্গসম’ লাদাখে বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) যা ঘটে গেলো, সেটির জন্য আসলে প্রস্তুত ছিল না কেউই।
এদিন, অশান্তি আর ক্ষোভ নিয়ে লাদাখের তরুণরা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং লাদাখ হিল কাউন্সিলের সদর দপ্তরে আগুন দেয়। রাস্তায় অজস্র গাড়ি ভাঙচুর করে ও লুঠপাট চালায়। এরপর, কারফিউ অমান্য করে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। এই ঘটনায় চারজনের প্রাণহানি হয়েছে, জখম হয়েছেন ৮০জনেরও বেশি–যার মধ্যে অর্ধেকই পুলিশ বাহিনীর সদস্য।
এমন পরিস্থিতি প্রশ্ন উঠেছে লাদাখের ‘জেন জি’ এভাবে ক্ষেপে উঠলো কেন?
তাহলে, বাংলাদেশ বা নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীই তাদের উৎসাহিত করেছে কি না? এর পেছনে অন্য কোনও শক্তির প্ররোচনা আছে কি?
আলাদা রাজ্যের মর্যাদা এবং ষষ্ঠ তফসিলের মর্যাদার দাবিতে বিক্ষোভকারীরা বিজেপির দপ্তরে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, লাদাখের লেহে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী কঠোরভাবে কারফিউ বাস্তবায়ন করার পর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৫০ জনকে আটক করেছে। লেহে পুলিশের গুলিতে চার বিক্ষোভকারী নিহত এবং অনেকে আহত হওয়ার পর, অভূতপূর্ব এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
এসব সমাধানের জন্য নয়াদিল্লি ইতোমধ্যে লেহে একজন 'বিশেষ দূত' পাঠিয়েছে। এর পাশাপাশি, লেফটেন্যান্ট গভর্নর কবিন্দর গুপ্ত একটি নিরাপত্তা পর্যালোচনা বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন এবং শান্তি রক্ষার জন্য আরও সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান। বৈঠকে মুখ্য সচিব পবন কোতোয়াল, ডিজিপি এসডি সিং জামওয়াল এবং সেনাবাহিনী ও আইটিবিপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া, সরকার জোর দিয়ে বলেছে, উচ্চ-ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটির মাধ্যমে লাদাখি গোষ্ঠীর সাথে আলোচনা ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। সেটি এই অঞ্চলের আকাঙ্ক্ষা পূরণের মঞ্চ হিসেবে এখনো সক্রিয়।
এদিকে, এই অস্থিরতার মধ্যে বিক্ষোভের প্রধান মুখ হিসেবে বিবেচিত জলবায়ু কর্মী সোনম ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে কেন্দ্র সরকার উস্কানিমূলক বক্তৃতার মাধ্যমে সহিংসতা উস্কে দেওয়ার অভিযোগ এনেছে।
তাছাড়া, ওয়াংচুকের পরিচালিত একটি সংস্থার FCRA লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্র। FCRA - বা বিদেশী অবদান (নিয়ন্ত্রণ) আইন - এর অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে দুই মাস আগে দায়ের করা একটি মামলায়।
পক্ষান্তরে, ওয়াংচুক পিটিআইকে জানান, সিবিআইয়ের একটি দল প্রায় ১০ দিন আগে "একটি আদেশ" নিয়ে এসেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে, তারা হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অফ অল্টারনেটিভস লাদাখ (HIAL) -এ FCRA লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
এমনকী ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘটনার পর যে বিবৃতি দিয়েছে তাতেও আঙুল তোলা হয়েছে সুপরিচিত এই লাদাখি অ্যাক্টিভিস্টের দিকে। তিনিই নাকি তার ‘অনশন প্রতিবাদে’র সময় উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন এবং ‘আরব বসন্ত’ ও নেপালের জেন জি-দের প্রসঙ্গ টেনে এনে লাদাখি তরুণদের সহিংসতায় প্ররোচিত করেছেন।
অথচ, এই সহিংসতাকে ‘অর্থহীন’ বলে বর্ণনা করে ওয়াংচুক কিন্তু ইতোমধ্যে তার অনশন কর্মসূচিতে ইতি টেনেছেন।
প্রসঙ্গত, এই সোনাম ওয়াংচুকের আদলেই বলিউডের সুপারহিট ছবি ‘থ্রি ইডিয়টসে’র ‘র্যাঞ্চো' (ভূমিকায় আমির খান) চরিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন রাজ কুমার হিরানী। পরিবেশবাদী ও সমাজকর্মী হিসেবে গোটা ভারতে তিনি একটি শ্রদ্ধেয় নাম। কিন্তু এখন দেশের সরকার সরাসরি তার সঙ্গে সংঘাতে নামছে এবং হামলার জন্য পরোক্ষভাবে তাকেই দায়ী করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে খবর পাওয়া গিয়েছে, সোনাম ওয়াংচুকের প্রতিষ্ঠানে বিদেশি অর্থায়ন কারা করছে এবং তাতে নিয়ম ভাঙা হয়েছে কি না, ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই সেটির তদন্ত শুরু করেছে। এমনকী চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি কেন পাকিস্তান সফরে গিয়েছিলেন, খতিয়ে দেখা হচ্ছে সেটাও।
সোনাম ওয়াংচুকের প্রতিষ্ঠান ‘হিমালয়ান ইনস্টিটিইট অব অল্টারনেটিভস লাদাখ’ বা ‘হিয়াল’-কে একটি জমির বরাদ্দ দিয়েও লাদাখের প্রশাসন গত মাসে তা আচমকা বাতিল করে দেয়, যা নিয়ে ওই সময় তুমুল বিতর্ক হয়েছিল।
লাদাখের আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি দুটো।
প্রথমত, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে একটি পূর্ণ অঙ্গরাজ্যের মর্যাদা পাওয়া। দ্বিতীয়ত, লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের (সিক্সথ শিডিউল) আওতায় নিয়ে আসা, যাতে আদিবাসীপ্রধান রাজ্য হিসেবে এটি তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে পারে এবং ‘স্বশাসিত’ অঞ্চল হিসেবে কিছু বিশেষ অধিকার পায়।
বছরপাঁচেক আগেও লাদাখ ছিল জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের একটি অংশ। ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে যখন সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করে ভারত সরকার কাশ্মিরের বিশেষ স্বীকৃতি কেড়ে নেয়, তখন কাশ্মীরের থেকে লাদাখকে বিচ্ছিন্ন করে সেটিকে একটি আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল।
এরপর গত বছর জম্মু ও কাশ্মীরে ভোট হয়েছে এবং তারা তাদের একটি নিজস্ব বিধানসভাও পেয়েছে, কিন্তু লাদাখ রয়ে গেছে সেই আগের অবস্থাতেই।
লাদাখকে আলাদা রাজ্য ঘোষণার দাবিতে যে দুটি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে লড়ছে, তারা হলো ‘লেহ অ্যাপেক্স বডি’ (ল্যাব) আর কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (কেডিএ)। লাদাখের জনসংখ্যার অর্ধেক বৌদ্ধ আর অর্ধেক মুসলিম (প্রধানত শিয়া)। আর এই আন্দোলনে কিন্তু বৌদ্ধ ও শিয়ারা হাতে হাত মিলিয়েই লড়ছেন।
নিজেদের দাবি পূরণে সরকারকে চাপ দেওয়ার লক্ষ্যে ল্যাব’র জনা পনেরো সদস্য গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ৩৫ দিনের অনশন ধর্মঘট শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই আন্দোলন শুরু হওয়ার ঠিক দু’সপ্তাহের মাথায় (মঙ্গলবার ২৩ সেপ্টেম্বর) ল্যাব’র সদস্য দুজন অনশনকারীকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। আর এর পর থেকেই তথাকথিত ‘জেন জি’-দের মধ্যে তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ল্যাব তখন দাবি করে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে তাদের সঙ্গে রফা আলোচনায় বসতে হবে। দিল্লির তরফে সেই প্রস্তাবিত বৈঠকের তারিখ দেওয়া হয় ৬ অক্টোবর, মানে অনশনকারীরা অসুস্থ হয়ে পড়ার বারো দিন পরে। এতেই আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আন্দোলনকারীরা, তারা রাজপথে নেমে ভাঙচুর ও সহিংসতা শুরু করে দেয়।
কেন্দ্রীয় সরকার এখন বলছে, তারা ‘ল্যাব’র দুটো দাবি বিবেচনা করতে রাজি। যেগুলো হলো, লাদাখে আলাদা পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন করা যাতে সেখানে কর্মসংস্থানের সুরাহা হয়, এবং লাদাখে লোকসভার পার্লামেন্টারি আসনের সংখ্যা একটা থেকে বাড়িয়ে দুটো করা।
কিন্তু আলাদা অঙ্গরাজ্যের স্বীকৃতি এবং ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি নিয়ে কেন্দ্র একেবারেই নীরব–যা লাদাখি তরুণদের শাসক দল বিজেপির ওপর প্রবল ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
সুলতানা দিনা/