দুই বছর ধরে গাজায় ইসরায়েলের অবিরাম বোমাবর্ষণ, অবরোধ ও সামরিক আগ্রাসন বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বহু দেশে এই অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। খোদ জাতিসংঘও ইসরায়েলের বর্বরতাকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেছে। গত মাসে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্তে প্রথমবারের মতো বলা হয়, ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে। তবে ইসরায়েল সরকার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। গতকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণধর্মী এক প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে।
এদিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একের পর এক বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে সর্বশেষ গত শনিবারও ইউরোপজুড়ে বড় বড় শহরে লাখ লাখ মানুষ বিক্ষোভ-মিছিল করেছেন। যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে এসব বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে খোদ ইসরায়েলেও।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মাসে ইসরায়েলের প্রায় ১৫০ জন নাগরিকের একটি দল গাজার সীমান্তে পদযাত্রা করে। তারা কেউই সেনা নন; বরং সরকারের নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কিছু প্রতিবাদকারী। অধিকাংশই ইসরায়েলি ইহুদি। তারা বলছেন, গাজায় যে অবরোধ এবং হামলা চালানো হচ্ছে, তা তাদের দেশের নামেই করা হচ্ছে এবং তারা সেই অন্যায়ের অংশ হতে চান না।
তাদের দাবি ছিল- এই অবরোধ ও সামরিক আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান ছিল, ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে বয়কট করা হোক এবং একঘরে করে দেওয়া হোক।
এই আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাপির স্লুজকার আমরান বলেন, ‘আমরা জানি, আমাদের সরকার এই যুদ্ধ বন্ধ করবে না। তাই আমরা চাই, বিশ্বের অন্য দেশগুলো আমাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিক, আমাদের বিচ্ছিন্ন করুক।’ তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের সঙ্গে খুব কম মানুষ আছে, এটা লজ্জার। কিন্তু তবুও আমাদের নিজের সমাজকে চ্যালেঞ্জ করে যেতেই হবে। মানুষ যেন চোখ খুলে দেখে যে, আমরা কী করছি- আমরা গাজায় গণহত্যা করছি। এটা মানতেই হবে।’
তবে ইসরায়েলে ভিন্ন চিত্রও রয়েছে। সেখানে অধিকাংশ মানুষ এখনো ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার ধাক্কা থেকে বের হয়ে আসেননি। ওই দিন ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস ইসরায়েলে হামলা করে। এতে ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫০ জনের বেশি জিম্মি হন। এখনো ৪৮ জন জিম্মি রয়েছেন গাজায়, যাদের মধ্যে ২০ জনকে জীবিত বলে মনে করা হয়। এরপর হামলা শুরু করে ইসরায়েল। সেই হামলা রূপ নেয় ধ্বংসযজ্ঞে। হামলায় গত দুই বছরে ৬৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তবে গাজার মানুষদের দুর্দশা বা মানবিক বিপর্যয় নিয়ে অনেক ইসরায়েলি ভাবতে চান না, বরং তাদের মনে ক্ষোভ, প্রতিশোধস্পৃহা এবং অস্বীকার প্রবণতা কাজ করছে।
গাজার সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে ইসরায়েলের সদরোত শহর। এখানে রয়েছে একটি উঁচু পাহাড়ি এলাকা, যেখান থেকে গাজার অনেক অংশ দেখা যায়। এই জায়গাটি এখন অনেক ইসরায়েলির জন্য একধরনের ‘বিনোদন কেন্দ্র’ হয়ে উঠেছে। মানুষ সেখানে ভিড় করছে গাজা দেখতে, সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ উপভোগ করতে। কেউ কেউ দূরবীন দিয়ে গাজার দিকে তাকিয়ে থাকছে, কেউ সেলফি তুলছে, আবার কেউ পপকর্ন খাচ্ছে। অনেকেই এটিকে ‘সদরোত সিনেমা’ নামে ডাকছে।
রাফায়েল হেমো নামে এক দর্শনার্থী বলেন, ‘গাজায় এখনো কিছু দালান দাঁড়িয়ে আছে দেখে আমার খারাপ লাগছে। আমি চাই ইসরায়েল পুরোটা গুঁড়িয়ে দিক। এখানে কোনো আরব যেন না থাকে। আমরা যা সহ্য করেছি, তার পরে গাজার কিছুই আর বাকি রাখা উচিত নয়।’
তবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ নিয়মিতই হচ্ছে। প্রতি শনিবার হাজার হাজার মানুষ তেলআবিবের রাস্তায় নেমে আসেন। কিন্তু সেই বিক্ষোভের প্রধান দাবি হলো- জিম্মিদের মুক্তি।
হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আকর্ড সেন্টার’-এর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৬২ শতাংশ ইসরায়েলি মনে করেন, ‘গাজায় কোনো নিরপরাধ মানুষ নেই।’ এই মনোভাব তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে দেশটির গণমাধ্যম।
লন্ডনের সেন্ট জর্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. আয়ালা পানিয়েভস্কি বলেন, ‘‘৭ অক্টোবরের পর ইসরায়েলের প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো এক ধরনের ‘অমানবিকীকরণ প্রচার’ শুরু করে। বিশেষ করে চ্যানেল ১২-তে ফিলিস্তিনিদের কষ্ট দেখানো বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে শুধু ইসরায়েলি সেনাদের দৃশ্য দেখানো হয়।’
পানিয়েভস্কির গবেষণায় দেখা যায়, যুদ্ধের প্রথম ছয় মাসে চ্যানেল ১২-তে গাজা নিয়ে যত রিপোর্ট হয়েছে, তার মাত্র ৩ শতাংশ রিপোর্টে ফিলিস্তিনিদের কষ্ট বা মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র দেখানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘জনগণ সবসময় যাদের ওপর আস্থা রাখে, সেই মিডিয়া যখন কোনো নির্দিষ্ট বিষয় দেখায় না, তখন জনগণ ধরে নেয় যে, ওটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এভাবে একটা বিশাল বিভাজন তৈরি হয়, বাইরের দুনিয়া যা জানে, ইসরায়েলিরা তার কিছুই জানেন না।’
তবে সব মিডিয়া একই রকম নয়। দীর্ঘদিনের পত্রিকা হারেৎজ গাজার মানবিক বিপর্যয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। এর জন্য সেই পত্রিকার সাংবাদিকদের নিয়মিত হুমকি, ঘৃণাচিঠি এবং সামাজিকভাবে অপমানের শিকার হতে হয়।
পত্রিকার জেরুজালেম প্রতিনিধি নীর হাসন বলেন, ‘যখন আমরা গাজার সেনাসদস্যদের স্বীকারোক্তিমূলক বয়ান ছাপি, তখন সবচেয়ে বেশি হুমকি পাই। কারণ, এই সত্যটা কেউ অস্বীকার করতে পারে না।’
তিনি বলেন, ‘অক্টোবর ৭-এর ট্রমা শুধু একটি দিক। অন্য দিকটি হলো বহু বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের অমানবিকভাবে দেখানো। অনেক দশকের দখলদারত্ব ও বৈষম্যের ফলাফল আজকের এই পরিস্থিতি।’
পানিয়েভস্কি আরও বলেন, ‘‘অনেক আগে থেকেই সরকার মিডিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করে এসেছে। ‘দখলদারত্ব’ শব্দ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়, তার বদলে সরকার-সমর্থিত ভাষা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর ফলে গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে রিপোর্ট কমতে থাকে।’
এ বিষয়ে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস ২০২৫ সালের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বলে, ‘ইসরায়েলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বৈচিত্র্য ও নিরপেক্ষতা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সংকুচিত হয়েছে।’
বিশ্বজুড়ে যেখানে গাজার মানুষদের না খেয়ে মারা যাওয়ার ছবি ভাইরাল হয়, সেখানে ইসরায়েলে এসব ছবি নিয়ে হাসাহাসি হয়। একটি জনপ্রিয় শব্দ সেখানে হলো ‘প্যালিউড’- যার মানে হলো ‘প্যালেস্টাইন+ হলিউড’। অর্থাৎ, তারা বিশ্বাস করে এসব দৃশ্য বানানো বা মিথ্যা।
জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি অপুষ্টিতে মারা গেছেন। আগস্টে গাজার একাংশে দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করা হয়েছে।
জুলাই মাসে ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট এক জরিপ করে। সেখানে দেখা যায়, ইহুদি ইসরায়েলিদের মধ্যে ৭৯ শতাংশ গাজার দুর্ভিক্ষ নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নন। অন্যদিকে, আরব ইসরায়েলিদের ৮৬ শতাংশ এই অবস্থায় ভীষণভাবে বিচলিত।
এই মনোভাবের পেছনে শুধু মিডিয়া নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক ধারা কাজ করছে বলে মনে করেন ইসরায়েলের পার্লামেন্টের সাবেক স্পিকার আভরাহাম বার্গ। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। পাঠ্যবই, মিডিয়া ও সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে নাগরিকদের শেখানো হয়েছে – যদি আমি তোমাকে না দেখি, তবে তুমি নেই।’ তিনি বলেন, ‘আজ অবস্থাটা এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে, আমাদের মতো মানুষদের এখন চরমপন্থি অবস্থান নিতে হচ্ছে, যাতে কোনো রকম ভারসাম্য সৃষ্টি হয়।’
ইউরোপজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও চলমান যুদ্ধ বন্ধের প্রতিবাদে ইউরোপজুড়ে বড় বড় শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ-মিছিল করেছেন। যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে এসব বিক্ষোভ হয়। গত শনিবার স্পেনের দ্বিতীয় বৃহৎ শহর বার্সেলোনা ও রাজধানী মাদ্রিদে যে বিক্ষোভ হয়েছে কয়েক সপ্তাহ আগেই তার ডাক দেওয়া হয়েছিল। তবে ইতালির রোম ও পর্তুগালের লিসবনে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয় গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী নৌবহর ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’কে ইসরায়েল আটক করার পর।
ইসরায়েলি বাহিনী ভূমধ্যসাগরে থাকতেই নৌবহরটি আটক করেছে। ইসরায়েলের নৃশংস হামলা ও দুর্ভিক্ষে বিপর্যস্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ইসরায়েলি অবরোধ ভাঙার চেষ্টা হিসেবে এ নৌবহর বার্সেলোনা থেকে রওনা দিয়েছিল। নৌবহর থেকে আটক ৪৫০ মানবাধিকারকর্মী ও অন্যদের মধ্যে ৪০ জনের বেশি স্পেনের নাগরিক। তাদের মধ্যে বার্সেলোনার একজন সাবেক মেয়রও রয়েছেন। এর আগে, শুক্রবার গাজার জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইতালিতে এক দিনের সাধারণ ধর্মঘটে ২০ লাখের বেশি মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন।
গত কয়েক সপ্তাহে স্পেনে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশটির সরকার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চরম দক্ষিণপন্থি সরকারের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করছে। গত মাসে একটি সাইক্লিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ইসরায়েলি একটি দল স্পেনে গিয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা সেখানে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন। এতে প্রতিযোগিতার আয়োজন ব্যাহত হয়।
ওই সময় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গাজায় চলমান যুদ্ধকে ‘জাতিহত্যা’ বলে আখ্যা দেন এবং আন্তর্জাতিক সব ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলি দলের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানান।
ইউরোপজুড়ে যখন এই বিক্ষোভ-সমাবেশ চলছিল সে সময়ে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস বলেছে, তারা গাজা যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাব আংশিকভাবে মেনে নিতে রাজি আছে।
বার্সেলোনার টাউন হল কর্তৃপক্ষ বলেছে, সেখানে শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা পুলিশের।
বিক্ষোভে অংশ নিতে অন্য একটি শহর থেকে ১ ঘণ্টা যাত্রা করে বার্সেলোনা এসেছেন ৬৩ বছর বয়সী মারিয়া জেসুস পাররা। মারিয়া বলেন, ‘১৯৪০-এর দশকে (ইউরোপে যেমন) দেখেছিলাম, তেমন একটি জাতিহত্যা এবার আমরা চোখের সামনে ঘটতে দেখছি, এও কীভাবে সম্ভব? এখন আর কেউ এটা বলতে পারবে না যে, সেখানে কী ঘটছে, তারা সেটা জানতেন না।’
ম্যানচেস্টারে একটি সিনাগগে প্রাণঘাতী হামলার পর পুলিশ লন্ডনে গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ স্থগিত করার অনুরোধ করেছিল। কিন্তু অনুরোধ উপেক্ষা করে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সমর্থনে লন্ডনে গতকাল একটি বিক্ষোভ-মিছিল বের হয়। পুলিশ মিছিল থেকে অন্তত ৪৪২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। দ্য গার্ডিয়ান তার প্রতিবেদনে এই সংখ্যা ৫০০ বলে জানিয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গাজায় চলমান যুদ্ধকে ‘জাতিগত হত্যা’ বলে আখ্যা দেন ও আন্তর্জাতিক সব ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ইসরায়েলি দলের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স, আল-জাজিরা