বাংলাদেশের মাধবদীতে শুক্রবার (২২ নভেম্বর) ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ১০ জন নিহত এবং ছয় শতাধিক মানুষ আহত হন। তবে এতে বিজ্ঞানীরা অবাক হননি। তারা বলছেন,বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তুলনামূলক কম মাত্রার ভূমিকম্পও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। পাশাপাশি আরও বড় ধরনের কম্পনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা।
এছাড়া, রবিবার (২৩ নভেম্বর) সকালে মায়ানমারে উপকূলে আঘাত হেনেছে ৫ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প। এই ভূমিকম্প আঘাত হানে। মায়ানমারের পাশাপাশি ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ডেও।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, গত শুক্রবার বাংলাদেশজুড়ে যে ৫.৭ মাত্রার কম্পন অনুভূত হয়েছিল, তার পরবর্তী কম্পন বা আফটারশকই আজকের কম্পনের কারণ হতে পারে।
রবিবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৩৯ মিনিটে অনুভূত এই কম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল দাওই শহরের পশ্চিম-দক্ষিণপশ্চিম দিকে ২৬৭ কিলোমিটার দূরে এবং ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল গবেষক ভূতাত্ত্বিক মাইকেল স্টেকলার নেতৃত্বে ২০০৩ সাল থেকে বাংলাদেশে গবেষণা চালাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ জিপিএস যন্ত্র বসিয়ে তারা পর্যবেক্ষণ করছেন। এতে দেখা গেছে, প্রতি বছর বাংলাদেশের ভূমি প্রায় দুই ইঞ্চি করে উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের এই ভূমিখণ্ড মায়ানমারের নিচে থাকা ভূত্বকের সঙ্গে ধীরে ধীরে ধাক্কা খাচ্ছে, আর তার ফলেই ভূমির গভীরে চাপ তৈরি হচ্ছে। এই চাপ একটি সময় হঠাৎ মুক্ত হলে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
ভূতাত্ত্বিক মাইকেল স্টেকলার জানান, গত ৪০০ বছরে বাংলাদেশে যেহেতু বড় ধরনের কোনও ভূমিকম্প হয়নি। সে কারণে ধারণা করা হচ্ছে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাটির নিচের চাপ জমে আছে। সেক্ষেত্রে ঠিক কতটা চাপ সঞ্চিত হয়েছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও এর বিস্ফোরণ ভয়াবহ হতে পারে।
‘নেচার জিওসায়েন্স’–এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, প্লেট সীমানায় আচমকা ব্যাঘাত ঘটলে ৮.২ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। অনুকূল অবস্থায় তা ৯ মাত্রা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অভূতপূর্ব।
বাংলাদেশ–মিয়ানমার প্লেট সীমা প্রায় ১৫০ মাইল দীর্ঘ। কোথায় ভূমিকম্পের কেন্দ্র হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও ঢাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—বাংলাদেশের অধিকাংশ মাটি নদীনির্ভর পলিতে গঠিত। আর এই নরম ও আলগা পলি ভূমিকম্পে কম্পন বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। বহুতল ভবন নির্মাণে নিয়ম না মানা ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।
স্টেকলারের কথায়, “ঢাকা যেন জেলির বাটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি শহর।”
গত শুক্রবারের ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল নরসিংদীর মাধবদীর কাছে, মাটির ১০ কিলোমিটার গভীরে। এর কম্পনে ঢাকার একটি বহুতলের রেলিং ভেঙে তিন পথচারীর মৃত্যু হয়। বিভিন্ন জেলায় বাড়ির দেয়াল ধসে বা চাপা পড়ে আরও মানুষের মৃত্যু হয়। কলকাতাসহ ভারতের বেশ কয়েকটি এলাকাও কেঁপে ওঠে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতে বড় ধরনের কম্পন হলে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পূর্বাঞ্চলেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সুলতানা দিনা/