ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে আমদানিকৃত গাড়ির ওপর শুল্ক বর্তমানে ১১০ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে, যা কমিয়ে ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে ভারত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ভারতের বিশাল বাজার উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে এটি এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। দুই পক্ষ একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (FTA) খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা সম্ভবত আগামীকাল মঙ্গলবারই ঘোষণা করা হতে পারে। ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের পর ভারত ইইউর সঙ্গে চুক্তি করতে জোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ২৭টি দেশের এই জোট থেকে আসা নির্দিষ্ট সংখ্যক গাড়ির ওপর তাৎক্ষণিকভাবে কর কমানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। এই সুবিধা কেবল সেই সব গাড়ির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যেগুলোর আমদানি মূল্য ১৫ হাজার ইউরোর (১৭ হাজার ৭৩৯ ডলার) বেশি। আলোচনার বিষয়ে অবগত দুই ব্যক্তি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছেন।
সূত্রগুলো আরও জানায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শুল্ক আরও কমিয়ে ১০ শতাংশে আনা হবে। এর ফলে ভক্সওয়াগন, মার্সিডিজ-বেঞ্জ এবং বিএমডব্লিউ-র মতো ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের জন্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করা সহজ হবে।
আলোচনার বিষয়বস্তু গোপনীয় হওয়ায় এবং শেষ মুহূর্তে পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকায় সূত্রগুলো নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ইউরোপীয় কমিশন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মাদার অব অল ডিলস
ভারত এবং ইইউ আগামীকাল মঙ্গলবার এই দীর্ঘমেয়াদী মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনার সমাপ্তি ঘোষণা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরপর উভয় পক্ষ বিস্তারিত বিষয়গুলো চূড়ান্ত করবে এবং এই চুক্তিটি অনুমোদন করবে, যাকে ইতোমধ্যে ‘মাদার অব অল ডিলস’ বা সব চুক্তির সেরা বলে অভিহিত করা হচ্ছে।
এই চুক্তির ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে এবং ভারতের টেক্সটাইল ও জুয়েলারির মতো পণ্য রপ্তানি বাড়বে, যা গত আগস্টের শেষ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্কের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
বিক্রির দিক থেকে ভারত বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম গাড়ির বাজার। তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ গাড়ি শিল্প বরাবরই অত্যন্ত সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। বর্তমানে ভারত আমদানিকৃত গাড়ির ওপর ৭০ শতাংশ থেকে ১১০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক ধার্য করে। টেসলা প্রধান এলন মাস্কসহ অনেক শিল্প উদ্যোক্তা এই উচ্চ শুল্ক হারের সমালোচনা করে আসছেন।
সূত্রমতে, নয়াদিল্লি প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ইঞ্জিনচালিত গাড়ির জন্য অবিলম্বে আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৪০ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে। এই খাতকে উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে এটি ভারতের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ। তবে এই কোটার সংখ্যা শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন হতে পারে।
অন্যদিকে, মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা এবং টাটা মোটরসের মতো দেশীয় কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ সুরক্ষার জন্য প্রথম পাঁচ বছর ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়িকে (EV) এই শুল্ক ছাড়ের বাইরে রাখা হবে। পাঁচ বছর পর ইভি-র ক্ষেত্রেও একই ধরনের শুল্ক কমানোর নিয়ম কার্যকর হবে।
বর্তমানে সুজুকি এবং স্থানীয় কোম্পানিগুলোর আধিপত্য
আমদানি শুল্ক কমানোর এই সিদ্ধান্ত ভক্সওয়াগন, রেনল্ট এবং স্টেলান্টিসের পাশাপাশি মার্সিডিজ-বেঞ্জ ও বিএমডব্লিউ-র মতো লাক্সারি গাড়ি নির্মাতাদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করবে। এই কোম্পানিগুলো ভারতে গাড়ি তৈরি করলেও উচ্চ শুল্কের কারণে ব্যবসা খুব একটা বাড়াতে পারছিল না।
কম শুল্কের ফলে গাড়ি নির্মাতারা সস্তায় আমদানিকৃত গাড়ি বিক্রি করতে পারবে। এর ফলে স্থানীয়ভাবে বড় আকারের উৎপাদন শুরুর আগেই তারা ভারতের বাজারে বিভিন্ন মডেলের গাড়ির চাহিদা যাচাই করার সুযোগ পাবে।
বর্তমানে ভারতের বার্ষিক ৪৪ লাখ ইউনিটের গাড়ির বাজারে ইউরোপীয় নির্মাতাদের অংশীদারত্ব ৪ শতাংশেরও কম। এই বাজার মূলত জাপানের সুজুকি এবং ভারতের নিজস্ব ব্র্যান্ড মাহিন্দ্রা ও টাটার দখলে, যারা সম্মিলিতভাবে বাজারের দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের গাড়ির বাজার বার্ষিক ৬০ লাখ ইউনিটে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাই অনেক কোম্পানি ইতোমধ্যেই নতুন বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। রেনল্ট তাদের নতুন কৌশলের মাধ্যমে ভারতে পুনরায় শক্ত অবস্থান গড়ার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে ভক্সওয়াগন গ্রুপ তাদের স্কোডা ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ভারতে পরবর্তী ধাপের বিনিয়োগ চূড়ান্ত করছে। সূত্র: রয়টার্স