চব্বিশের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনামলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।
ইতোমধ্যে বিএনপি চেয়াম্যান ও প্রধামন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ক্ষমতায় আসার এক মাস পূর্ণ হয়েছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে যে সরকার ক্ষমতায় আসে, ভারতের চোখে সেটি ছিল একটি ‘অনির্বাচিত’ সরকার। সেই যুক্তিতেই দিল্লি ঢাকার সঙ্গে ‘এনগেজমেন্ট’ কার্যত স্থগিত রেখেছিল। সে সময় ভারতের ঘোষিত অবস্থান ছিল, আগে বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসুক- আর সেটা যে দলেরই সরকার হোক না কেন, তাদের সঙ্গে ‘ডিল’ করতে দিল্লির কোনো আপত্তি নেই।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি গরিষ্ঠতা অর্জন করে এককভাবে সরকার গঠন করে বিএনপি। বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পরই প্রথম যে বিশ্বনেতারা তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান, তাদের মধ্যে ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। শুধু তাই নয়, সে দিন বিকেলে তিনি টেলিফোনেও তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেমন ‘ইন্ডিয়া ফ্যাক্টর’ অস্বীকার করা যাবে না, তেমনি ভারতের রাজনীতিতে- বিশেষ করে পূর্ব সীমান্তের রাজ্যগুলিতে বাংলাদেশও বরাবরই একটি আলোচিত ও প্রাসঙ্গিক ইস্যু। ফলে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বাস্তবতা ‘’ না কি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাধ্যবাধকতা‘’ কোন বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বেশি প্রভাব ফেলে সেটাও দেখার বিষয়।
এই পটভূমিতে ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আগামী দিনে কোন পথে যেতে পারে, এ রকম পাঁচটি সূচক বা লক্ষণ কী কী হতে পারে?
ভিসা কার্যক্রম কি স্বাভাবিক হবে?
বাইরের যে দেশটি থেকে সবচেয়ে বেশি বিদেশি পর্যটক ভারতে যান বেশ কয়েক বছর ধরে সেই স্থানটি ছিল বাংলাদেশের দখলে। প্রতিবছর ২০ লাখের বেশি মানুষ ভারতে চিকিৎসা, পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য বা কেনাকেটা-সহ নানা কারণে ভারতে গিয়েছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের অগাস্টে ভারত বাংলাদেশে তাদের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার ফলে সেই পরিসংখ্যান কমে আসে।
বাংলাদেশে গত দেড় বছরে ভারত শুধুমাত্র কিছু মেডিকেল, ইউরোপগামী ও ওয়ার্ক পারমিট-প্রত্যাশী বাংলাদেশি নাগরিকের ভারতে এসে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসে ভিসার আবেদন করতে কিছু সংখ্যক ডাবল এন্ট্রি ভিসা দিয়েছে। তবে এই ধরনের ভিসার সংখ্যাও আগের তুলনায় ছিল একেবারেই কম।
তবে গত এক মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত একাধিক ভারতীয় কূটনীতিক প্রকাশ্যেই বলেছেন, ভারত এবারে ধীরে ধীরে ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার পথে এগোবে এবং পর্যটন ভিসা দেওয়াও শুরু করবে। যদি সেটা আগামী কিছুদিনের মধ্যে হয়, তাহলে বোঝা যাবে ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সহজ করতে যাচ্ছে।
তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কোথায়?
যখন কোনো দেশের নতুন সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান দায়িত্ব নেন, তখন তিনি তার প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে কোন দেশ বেছে নেন, সেটা ওই সরকারের পররাষ্ট্রনীতি বা কূটনীতির অগ্রাধিকার নিয়ে অবশ্যই একটা জোরালো বার্তা দেয়। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম দ্বিপাক্ষিক বিদেশ সফরে কোথায় যান, সেটাও ঠিক এই কারণেই দেখার বিষয় হবে। তিনি যদি প্রথম সফরে দিল্লিতে আসেন, তাহলে বোঝাই যাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যে ভারতবিরোধিতার তকমা, সেটা থেকে বেরোনোর চেষ্টা করছে।
তবে তারেক রহমান যদি সত্যিই ভারত সফরে আসেন, সেটা মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ-সহ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পরে হবে। দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রে আপাতত এমনই আভাস।
ভারতের ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফরে যাবে?
গত বছরের আগস্টে তিনটি ওয়ান ডে ও তিনটি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক খেলতে ভারতীয় ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফরে যাওয়ার কথা ছিল - যে সফর শেষ মুহুর্তে বাতিল করা হয়। কয়েক দিন পরেই ভারতে শুরু হচ্ছে আইপিএল। ফলে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরে যেতে হলে আগামী জুনের আগে তা সম্ভব নয়। চলতি বছরে সেই প্রস্তাবিত সফরটি আদৌ রিশিডিউলড হবে কি না এবং ভারতীয় বোর্ড বাংলাদেশকে দেওয়া তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে কি না – সেটা এখনো পুরোপিুরি নিশ্চিত নয়। ভারত যদি তাদের কথা রাখে - তাতেও বোঝা যাবে দুই দেশের সম্পর্ক ইতিবাচক দিকেই যাচ্ছে।
কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি হবে?
গত দেড় বছরের ওপর ধরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ। কলকাতা-ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী এক্সপ্রেস, কলকাতা ও খুলনার মধ্যেকার বন্ধন এক্সপ্রেস বা কমলাপুর-নিউ জলপাইগুড়ির মধ্যে চলাচলকারী মিতালি এক্সপ্রেসের চাকাই রেললাইনে গড়ায়নি ২০২৪ সালের জুলাই থেকে।
আন্তর্জাতিক বাস পরিষেবাও তখন থেকেই বন্ধ। যদিও অতি সম্প্রতি ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে ঢাকা পর্যন্ত বাস চলাচল আবার খুব সীমিত আকারে শুরু হয়েছে।
ভারত আর একটি যে কানেক্টিভিটি প্রকল্পের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে, সেটি হলো আগরতলা ও আখাউড়ার মধ্যে রেল সংযোগ স্থাপন। এই রেললাইন তৈরি হলে কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড দিয়ে সরাসরি আগরতলায় ট্রেনে যাওয়া যাবে মাত্র কয়েক ঘণ্টায়। এই প্রকল্পের অতি সামান্য অংশের কাজই বাকি। এখন তারেক রহমানের সরকারের আমলে এই অসমাপ্ত প্রকল্পটি শেষ হয় কি না, এবং হলে কত তাড়াতাড়ি হয়- সেটা অবশ্যই দেখার বিষয় হবে।
এখন সেই কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলোর কী গতি হয় এবং দুই দেশের মধ্যে ট্রেন-বাস চলাচল আবার কবে শুরু হয় - সেটাও দুই সরকারের মধ্যে সম্পর্কের রূপরেখা নিয়ে স্পষ্ট একটা বার্তা দেবে।
গঙ্গা জল চুক্তির নবায়ন কবে?
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে যে গঙ্গা জল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার ৩০ বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছরের ডিসেম্বরেই। এখন এই অতি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি কোন শর্তে নবায়ন হবে – আগের আকারেই সেটি বহাল থাকবে না কি দুই দেশই চুক্তির শর্তে পরিবর্তন চাইবে – সেই আলোচনাও কিন্তু থমকে আছে বহুদিন ধরে।
এখন তারেক রহমান ও নরেন্দ্র মোদি সরকারের মধ্যে যদি সেই আলোচনা শুরু হয়, তাহলে সেটা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেবে। - সূত্র: বিবিসি বাংলা