ইউক্রেনকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। যুদ্ধ শুরুর পর টানা দুই দিনের মধ্যে এবারই এত বড় মাপে হামলা হলো। গত বৃহস্পতিবার রাজধানী কিয়েভসহ দেশের বিভিন্ন শহরে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, গত বুধবার থেকে রাশিয়া ১ হাজার ৫৬০টির বেশি ড্রোন ছুড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম ভাগেই মস্কো ৬৭০টির বেশি ড্রোন এবং ৫৬টি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ৪১টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৬৫২টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
জেলেনস্কি বলেন, ‘যারা মনে করে যুদ্ধ শেষের দিকে, তাদের কর্মকাণ্ড এমন হতে পারে না। এ হামলার বিষয়ে মিত্রদের নীরব না থাকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষায় সহায়তা অব্যাহত রাখাও জরুরি।’
প্রসঙ্গত এ হামলার আগ দিয়েই ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ অবসানের বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করা হয়। এর আগে গত শনিবার পুতিন বলেছিলেন, যুদ্ধ অবসানের খুব কাছে রয়েছেন তারা। যদিও জেলেনস্কি বরাবরই সেসব দাবি অস্বীকার করে আসছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করে। এরপর থেকে যুদ্ধ চলছেই, যদিও চলতি বছরে যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ অগ্রগতি অনেকটাই থমকে গেছে। হামলার বিষয়ে মস্কোর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান
জেলেনস্কি জানান, রাতের হামলার মূল লক্ষ্য ছিল রাজধানী কিয়েভ। শহরের অন্তত ২০টি স্থানে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় অন্তত তিনজন নিহত এবং দুই শিশুসহ প্রায় ৪০ জন আহত হয়েছেন।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎশ্চিকো বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন। উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। রুশ ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি নয়তলা আবাসিক ভবনের পুরো একটি অংশ ধসে পড়ে। সেখানে জরুরি কর্মীরা কংক্রিট কেটে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছিলেন।
৭৪ বছর বয়সী পেনশনভোগী আল্লা কোমিসারোভা ঘটনাস্থলে রয়টার্সকে বলেন, ‘ওখানে মানুষ ছিল, শিশুরাও ছিল। তাদের কী হয়েছে? পুরো ভবনটাই ধসে পড়েছে।’
চোখের পানি ধরে রেখে তিনি বলেন, ‘আমি কিছু একটা উড়তে শুনেছিলাম। খুব কাছে দিয়ে যাচ্ছিল। তার পর ভয়াবহ একটা শব্দ হলো, আর আমাদের সামনের ভবনটা কেঁপে উঠল।’
মেয়র ক্লিৎশ্চিকো জানান, হামলার কারণে কিয়েভে পানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জেনারেটর চালু করা হচ্ছে। ইউক্রেনের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রুশ হামলার কারণে দেশের ১১টি অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানান, হামলায় ক্রেমেনচুকের জ্বালানি অবকাঠামো, দক্ষিণাঞ্চলীয় ওদেসা অঞ্চলের বন্দর স্থাপনা এবং রেল অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের সময় এই হামলা প্রমাণ করে, ওয়াশিংটনের শান্তি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘কোনো ভ্রম বা অবাস্তব আশা পোষণের সুযোগ নেই। শুধু মস্কোর ওপর চাপই পুতিনকে থামাতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নেতাদের হাতে মস্কোর ওপর যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে, যাতে তারা পুতিনকে অবশেষে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলতে পারেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত শান্তি প্রচেষ্টা খুব বেশি অগ্রগতি আনতে পারেনি। এ অবস্থায়ও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ ফ্রন্টলাইনে তীব্র লড়াই অব্যাহত রয়েছে। সূত্র: রয়টার্স