পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই বাংলাদেশ ও নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ ঘিরে বড় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছেন শুভেন্দু অধিকারী। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থলসংযোগ হিসেবে পরিচিত এই করিডরের কৌশলগত ১২০ একর জমি দেশটির সীমান্তরক্ষা বাহিনীর (বিএসএফ) কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে তার সরকার। এর ফলে করিডরটি আবারও আলোচনায় এসেছে। ভারতীয় গণমাধ্যমের দাবি, দীর্ঘদিন আটকে থাকা সড়ক ও রেল প্রকল্প এগিয়ে নিতে এবং এই অঞ্চলে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়াতেই নেওয়া হয়েছে এই পদক্ষেপ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ব্যক্তিগতভাবে বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে শিলিগুড়ি করিডরের জমির কাগজপত্র বিএসএফের কাছে জমা দিয়েছেন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার দীর্ঘদিন ধরেই এই জমি চাচ্ছিল। কিন্তু আগের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার এটিকে একটি ‘ফেডারেল’ বা কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপের বিষয় হিসেবে দেখত এবং বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছিলেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এখন এই জটিলতা কেটে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার এই এলাকায় মহাসড়ক ও রেলওয়ে অবকাঠামো জোরদার করবে, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে মূল ভারতের যোগাযোগ বাড়াবে। ফলে এটি দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর দ্রুত চলাচলেও বড় সুবিধা দেবে।
গত ৯ মে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার মাত্র ১১ দিনের মাথায় শুভেন্দু অধিকারী কেন্দ্রীয় সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ দাবিটি পূরণ করলেন। নতুন রাজ্য সরকার জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ (এনএইচএআই) এবং এনএইচআইডিসিএলের কাছে সড়কের সাতটি অংশ হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছে, যার মধ্যে শিলিগুড়ি করিডরের ভেতরের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশও রয়েছে।
১২০ একর জমির কৌশলগত গুরুত্ব
বিজ্ঞপ্তি জারি করা এই ১২০ একর জমি শিলিগুড়ি করিডরের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কেন এই জায়গার নিয়ন্ত্রণ নিতে এত মরিয়া ছিল, তা নিয়ে আলোচনা রয়েছে। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে এই অঞ্চলের প্রধান প্রধান সড়ক প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর ধরে আটকে ছিল। ফলে রাস্তা চওড়া করা, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত বা নতুন অবকাঠামো গড়ার কাজ এগোতে পারছিল না। অথচ সামরিক বাহিনী এবং ভারী যুদ্ধ সরঞ্জাম সহজে যাতায়াতের জন্য এখানে উন্নত মহাসড়ক থাকা জরুরি। কৌশলগত কারণেই এখন সিকিম ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে যাতায়াত ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে চাইছে দিল্লি। এর পাশাপাশি এই এলাকায় রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণেরও বড় পরিকল্পনা রয়েছে।
ভূগর্ভস্থ রেললাইনের পরিকল্পনা
ইন্ডিয়া টিভি জানায়, জরুরি পরিস্থিতিতেও যোগাযোগ সচল রাখতে শিলিগুড়ির এই করিডরের ভেতর দিয়ে একটি ভূগর্ভস্থ রেললাইন নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো- যেকোনো যুদ্ধাবস্থা বা জরুরি পরিস্থিতিতেও যেন উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ সচল থাকে। এই গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো সরাসরি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে থাকলে তা দেশটির সেনাবাহিনীর সামরিক প্রস্তুতি ও পরিচালনায় বড় ধরনের সুবিধা এনে দেবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিলিগুড়ির এই জমি কেন্দ্রের হাতে দেওয়া কেবল একটি কৌশলগত পদক্ষেপই নয়, এটি দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগ দূর করে উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যকে সুরক্ষিত রাখবে। ভারতের রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এরই মধ্যে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে একটি ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ রেললাইনের ঘোষণা দিয়েছেন, যা এই ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডরের নিচ দিয়েই যাবে।
শিলিগুড়ি করিডর ঠিক কোথায় অবস্থিত?
ভৌগোলিক দিক থেকে শিলিগুড়ির পশ্চিমে নেপাল সীমান্তে অবস্থিত ‘পানিটঙ্কি’ এবং পূর্বদিকে বাংলাদেশ সীমান্তে রয়েছে ‘ফুলবাড়ী’। শিলিগুড়ি করিডরটি মূলত এই দুটি পয়েন্টের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত। এটি মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া। করিডরটি নেপাল ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তকে স্পর্শ করে প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এই সংকীর্ণ বা সরু অংশটিই ভারতের উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্য- অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরাকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এমনকি সিকিম যাওয়ার একমাত্র রাস্তাও এই অঞ্চলের ওপর দিয়েই গেছে। অঞ্চলটি সড়ক ও রেলপথ, উভয় মাধ্যমেই যুক্ত।
প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড নিয়ে ভারতের অবস্থান ও নিরাপত্তা শঙ্কা
১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে প্রতিবেদনে বলা হয়, সে সময় যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন ভারতীয় বাহিনী ওই অঞ্চলের অনেক গভীরে প্রবেশ করেছিল। ভারত চাইলে তখন বাংলাদেশের কিছু অংশ নিজের দাবি করতে পারত, কিন্তু ভারত কখনোই পরিস্থিতির অপব্যবহার করার চেষ্টা করেনি। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই করিডরকে দুর্বল এলাকা হিসেবে দেখে প্রতিপক্ষ কিছু দেশ। এ ছাড়া দিল্লি দাঙ্গার সময় শরজিল ইমাম এই করিডর অবরোধের আহ্বান জানিয়েছিলেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।