যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা আধিপত্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি করেছে চীন ও রাশিয়া। বেইজিংয়ে গতকাল বুধবার ঐতিহাসিক চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের শীর্ষ বৈঠকে ওই অবস্থান তৈরি হয়েছে। দুই নেতা বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও ‘জঙ্গলের আইন’ বা জোর যার মুল্লুক তার–এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের পরপরই পুতিন সেখানে যান। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন মিসাইল ফিল্ড গঠন এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি বাতিলের কঠোর সমালোচনা করেন। বর্তমান ভঙ্গুর ও বিশৃঙ্খল বিশ্ব পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করতে বেইজিং ও মস্কো একসঙ্গে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।
বৈঠক শেষে গতকাল চীন ও রাশিয়া একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে। বিবৃতিতে ট্রাম্পের ঘোষিত ১৭৫ বিলিয়ন ডলারের ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় আমেরিকার মিডওয়েস্টে একটি নতুন মিসাইল ক্ষেত্র তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পাশাপাশি দুই নেতা গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিরও সমালোচনা করেন। ট্রাম্প রাশিয়ার এক বছরের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায়।
উদ্বোধনী বক্তব্যে দুই নেতাই বর্তমানের ভঙ্গুর বিশ্ব পরিস্থিতিতে নিজেদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন। রুশ সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পুতিন শি জিনপিংকে বলেন, বাইরের নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও রাশিয়া ও চীনের পারস্পরিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা অত্যন্ত শক্তিশালী গতিতে এগিয়ে চলেছে।
অন্যদিকে শি জিনপিং চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার এই সম্পর্ককে ‘অদম্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, নানা পরীক্ষা ও সংকটের মধ্যেও দুই দেশের রাজনৈতিক পারস্পরিক বিশ্বাস এবং কৌশলগত সমন্বয় আরও গভীর হয়েছে।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের বিষয়টিও উঠে আসে। শি জিনপিং রুশ প্রেসিডেন্টকে বলেন, এই যুদ্ধ আর বাড়ানো ঠিক হবে না এবং এখনই একটি যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি। নতুন করে শত্রুতা শুরু করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং আলোচনা চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিবৃতিতে সতর্ক করে বলা হয়, বর্তমানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিভক্ত হয়ে যাওয়ার এবং ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে যাওয়ার একটি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কলোনিয়াল বা ঔপনিবেশিক আমলের মানসিকতা নিয়ে কিছু দেশ এককভাবে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করার, নিজেদের স্বার্থ চাপিয়ে দেওয়ার এবং অন্য দেশের সার্বভৌমত্বকে বাধাগ্রস্ত করার যে চেষ্টা করছে, তা ব্যর্থ হয়েছে।
এই শীর্ষ বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল জ্বালানি খাত। পুতিন এই খাতকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। ইউক্রেন আক্রমণের পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করলে চীন রাশিয়ার তেলের প্রধান ক্রেতা ও অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়।
বৈঠকে দুই দেশ অর্থনীতি, পর্যটন ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ৪০টি চুক্তি স্বাক্ষরের পরিকল্পনা করলেও পুতিনের প্রধান লক্ষ্য ছিল জ্বালানি নিরাপত্তা। তবে দীর্ঘদিনের আলোচিত ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া টু’ গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে নতুন কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, পাইপলাইনের রুট বা পথ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি মৌলিক সমঝোতা হয়েছে, তবে এটি নির্মাণের কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো ঠিক করা যায়নি। শি জিনপিং এই জ্বালানি সহযোগিতাকে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর বললেও পাইপলাইনটি নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি।
পুতিন প্রতিশ্রুতি দেন রাশিয়া ও চীন বিশ্বমঞ্চে স্থিতিশীল ভূমিকা রাখতে একসঙ্গে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে। শি জিনপিং বলেন, বিশ্ব যখন দিন দিন বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছে এবং আধিপত্যবাদ জেঁকে বসছে, তখন বেইজিং ও মস্কো তাদের কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে। এই সফর প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীন ও রাশিয়ার মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের গভীরতা অনেক বেশি এবং চীন একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা চায় যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা ও প্রভাব কম থাকবে।
বৈঠকের আগে এক ভিডিও বার্তায় পুতিন বলেন, রাশিয়া ও চীন একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় ঐক্য রক্ষাসহ মূল স্বার্থগুলোতে একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। তারা কারও বিরুদ্ধে জোট বাঁধছেন না, বরং বিশ্ব শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য কাজ করছেন। সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা