বাংলাদেশে বছরে দীর্ঘ ৮-৯ মাস ধরে নেচে বেড়ানো ছোট পরিযায়ী পাখির নাম তাইগা-চুটকি। আমাদের দেশে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে এসে একেবারে মে মাস পর্যন্ত অবস্থান করে। তাইগা-চুটকির প্রধান এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল হলো তাইগা বনাঞ্চল। সেই বন থেকেই সে উড়াল দিয়ে চলে যায় অপেক্ষাকৃত কম শীতপ্রধান এলাকায়। তাইগা বন, যা বোরিয়াল বন বা তুষার বন নামেও পরিচিত। এ বন বিশ্বের বৃহত্তম স্থলজ বন, যেটি উত্তর গোলার্ধের বিশাল অংশজুড়ে বিস্তৃত, বিশেষ করে কানাডা, রাশিয়া, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডজুড়ে। এই বনাঞ্চল পৃথিবীর মোট বনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং এর বৈশিষ্ট্য হলো ঠাণ্ডা জলবায়ু, ঘন এবং অন্ধকার পরিবেশ। তাইগা-চুটকি মে মাসের মাঝামাঝিতে বা শেষের দিকে উড়ে যায় তাইগা অঞ্চলে। তখন তাইগা অঞ্চলের তাপমাত্রা বেশি থাকে। সেই তিন মাসই তাইগা অঞ্চলে থাকে পাখিটি। এই তিন মাসেই বাসা তৈরি করে ডিম পাড়া, ছানা ফোটানো খুব দ্রুতই করে।
তাইগা-চুটকি খুব ছোট পাখি। এই পাখির সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ২০১০ সালে রাজশাহী জেলার কোনো এক গ্রামে। সেদিন মাঠের খোলা প্রান্তরের কাছে একটি ছোট গাছের পত্রহীন ডালে বসে ছিল পাখিটি। কিছুক্ষণ পর পর সে উড়াল দিয়ে পোকা ধরে আবার সেই ডালেই বসেছিল। ‘চিরিক-চিরিক’ শব্দে ডাকাডাকি করছিল কিছুক্ষণ। তারপর কেবলই নীরব থেকে উড়ে উড়ে পোকা শিকার করতে দেখেছি।
এ পাখিটিকে দেশের সব জেলায় দেখা যায়। আমাদের দেশে বনের প্রান্তরে, পাহাড়ি বনের নদীর তীরে, গ্রামের কুঞ্জবনে, শহরের পার্কে, আবাদি জমির পাশে ঝোপে এ পাখি বিচরণ করে। শীতের আবাসে একাকী থাকে। আমি সব সময় পাখিটিকে একাকী ছোট গাছের ডালে বসে থাকতে দেখেছি। বসে থাকার সময় এরা কিছুটা বিরতি দিয়ে লেজ ওপর-নিচ করে। ঢাকার রমনা পার্কে, সিলেটের বড়লেখা এবং সাঙ্গু অভায়রণ্যে সুন্দর এ পাখিদের অনেকবারই দেখেছি। ১৮১১ সালে পিটার সাইমন প্যালাস প্রথম এই প্রজাতির বর্ণনা দেন। তিনি ছিলেন একজন পুরুশিয়ান প্রাণী বিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিদ, নৃতাত্ত্বিক, অভিযাত্রী, ভূগোলবিদ, ভূতত্ত্ববিদ, প্রাকৃতিক ইতিহাসবিদ এবং শ্রেণিবিন্যাসবিদ। এ পাখির ইংরেজি নাম তাইগা ফ্লাইক্যাচার। দেখতে বাদামি বর্ণের। নারী পাখির ওপরের অংশ বাদামি এবং লেজের চারপাশে কালো রং থাকে। বুকের নিচের অংশ বেশির ভাগই সাদা। পুরুষ পাখির কানের আবরণ এবং ঘাড়ের পাশে নীল-ধূসর রঙের। প্রজননকারী পুরুষ পাখির গলায় কমলা-লাল রং থাকে। দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ সেন্টিমিটার। চোখগুলো অপেক্ষাকৃত বড় বড়। মাঝে মাঝে বেশ চঞ্চল থাকে পাখিটি।
তাইগা-চুটকির খাদ্যতালিকায় আছে নানা প্রজাতির কীটপতঙ্গ। তবে মশা ও ডাঁশ পোকা প্রধান খাবার। মে থেকে জুন মাসে প্রজনন আবাসে বাসা বাঁধে। তাইগা-চুটকি পূর্ব রাশিয়া থেকে সাইবেরিয়া এবং মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত উত্তর ইউরেশিয়ায় প্রজনন করে। দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শীতকালে পরিযায়ী হিসেবে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, ক্যাম্বোডিয়া, লাওস, মায়ানমার, নেপাল, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, ভিয়েতনাম এবং জাপানে আসে।
লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার