ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে দেশের ১০টি জেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ পরিবার। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে পুকুর ও ঘেরের মাছ। ফসল-সবজিসহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৯ লাখের বেশি মানুষ। কক্সবাজারে বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
বন্যাকবলিত জেলাগুলো হলো ফেনী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার।
বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী রেজা জানান, ১০টি জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব জেলার ৫০টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। ইউনিয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৫৭টি। জেলাগুলোতে ৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৪০টি পরিবার পানিবন্দি অবস্থায় আছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৬ লাখের বেশি মানুষ।
তিনি বলেন, ‘১ হাজার ৫৩৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা দেড়টা পর্যন্ত ৭৫ হাজার ৬৭৮ জন আশ্রয় নিয়েছে। এ ছাড়া আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রায় সাড়ে সাত হাজার গবাদিপশু আশ্রয় নিয়েছে। আটটি জেলায় মোট ৪৪৪টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। ফেনীতে সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী উদ্ধারকাজ করছে। এ ছাড়া বিজিবিসহ অন্যরাও উদ্ধার কার্যক্রম চালাচ্ছে।’
এদিকে লক্ষ্মীপুরে বন্যায় ১০ লাখ এবং কক্সবাজারে ২ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।
বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন আবহাওয়াবিদরা
চলতি মাসের শুরুতে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, এ মাসে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতিবৃষ্টির কারণেই এ বন্যা হবে বলে জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে এখন উত্তর-মধ্যাঞ্চলের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্যুরো, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
লক্ষ্মীপুর: এ জেলায় ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে। লোকজন পার্শ্ববর্তী আশ্রয়কেন্দ্র, বিদ্যালয় ভবন ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে।
জেলা প্রশাসক সুরাইয়া জাহান বলেন, ‘বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ৫৭৬ টন চাল ও নগদ ১০ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা ও তাদের পাশে দাঁড়াতে প্রত্যেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনসহ সবার সহযোগিতায় এই দুর্যোগ মোকাবিলা করা হবে।’
চট্টগ্রাম: পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েকটি উপজেলার হাজারও মানুষ। লোহাগাড়া উপজেলায় গাছ ভেঙে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া সবজি খেত, মাছের খামার, হাঁস-মুরগির খামারের ক্ষতি হয়েছে। ২২ হাজার টন মাছ ভেসে গেছে বন্যায়। ১২ হাজার হেক্টর ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে এ জেলায়।
জানা গেছে, সাত দিন ধরে চট্টগ্রামে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এতে চট্টগ্রামের হালদা, ফেনী নদী, ফটিকছড়ির ধুরুং ও সর্তা খালের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়া পূর্বাভাস কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইসমাইল ভূঁইয়া বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বেলা ৩টা থেকে আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৫৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।’
ফটিকছড়ি উপজেলার ইউএনও মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘১৫টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মানুষের সেবার জন্য ১৮ জন কর্মকর্তা নিয়ে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। জরুবি সেবার জন্য কন্ট্রোল রুম নম্বর চালু করা হয়েছে। সহযোগিতা করে যাচ্ছে সেনাবাহিনীও।’
এদিকে লোহাগাড়া উপজেলায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পদুয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের নয়াপাড়া এলাকায় চলন্ত মাছবোঝাই একটি মিনি ট্রাকের ওপর গাছ পড়ে ঘটনাস্থলেই একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুর, মুরাদপুর, বাড়বকুণ্ড, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়ার ৩০ গ্রামের মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।
খাগড়াছড়ি: জেলা সদর, দীঘিনালা, পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা, মহালছড়ি ও রামগড়ের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চেঙ্গী, মাইনী ও ফেনী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার নদী-তীরবর্তী কয়েক শ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কয়েক হাজার বাড়িঘর, ব্যবসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। আটকে পড়াদের উদ্ধার অব্যাহত রেখেছেন সেনাবাহিনী ও রেড ক্রিসেন্টের সদস্যরা। খাগড়াছড়ি শহরের প্রবীণ বাসিন্দারা বলছেন, তারা গত ২২ বছরের মধ্যে এমন ভয়াবহ বন্যা আর দেখেননি।
জেলা প্রশাসক মো. সহিদুজ্জামান জানান, জেলায় ৯৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা রাখা হয়েছে।
ফেনী: ফেনী পৌর শহরেও বন্যার পানি উঠেছে। সদর উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এর আগে ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে মুহুরী নদীর পানি বেড়ে সোনাগাজী উপজেলার আমিরাবাদ ও নবাবপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় ঢুকতে শুরু করে। পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে মুহুরী ও ফেনী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছিল।
জেলার বন্যায় উপদ্রুত অঞ্চলে দুর্গতদের সহায়তা ও উদ্ধার তৎপরতায় কাজ করছেন সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা।
রাঙামাটি: রাঙামাটির বাঘাইছড়ির নিচু এলাকার ৩০টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এতে ১২ হাজার ২০০ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ৫৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪টিতে আশ্রয় নিয়েছে ৪৮৫ পরিবারের ১ হাজার ৮২০ মানুষ।
বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আতাউর রহমান জানিয়েছেন, ত্রাণ সহায়তার ৩০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা: জেলার তিনটি উপজেলার এক লাখের বেশি মানুষের ঘরবাড়িতে পানি উঠে গেছে। তারা এখন আশ্রয়কেন্দ্র অথবা আত্মীয়ের কাছে আশ্রয় নিচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মু মুশফিকুর রহমান জানান, ভারতীয় ঢল ও বৃষ্টি না কমলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। নদীর তীরবর্তী সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের জন্য কাজ করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জ: হবিগঞ্জে রেকর্ড বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে খোয়াই নদীর পানি। রেলসেতু ছুঁয়ে যাওয়ায় ঢাকার সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার বেলা ১টা ৪৫ মিনিটে রেল চলাচল বন্ধ করা হয়।
জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ৫২ মিলিমিটার। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ।
জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলার অন্তত ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
মৌলভীবাজার: জেলার সদর, রাজনগর, কুলাউড়া, জুড়ী ও কমলগঞ্জ উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের অসংখ্য বসতঘর, গ্রামীণ সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠেছে। এতে পাঁচটি উপজেলার দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মনু ও ধলাই নদের অন্তত ১৩টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ১ লাখ ২২ হাজার ৬৮৭ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ৪ হাজার ৩২৫ জন। খোলা হয়েছে ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্র। মেডিকেল টিম রয়েছে ২৫টি। একই সঙ্গে বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য ২০ লাখ ৫০ হাজার নগদ টাকা এবং ২৮৫ টন চাল জিআর খাত থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার: বন্যার পানিতে দুই শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অন্তত দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া এসব এলাকার আঞ্চলিক ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে ডুবে গেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া: আখাউড়া উপজেলার ৩৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে প্রায় ৫৫০টি পরিবার।
জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম জানান, হাওড়া নদী ও জাজীর খালসহ বিভিন্ন স্থানে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে।
সিলেট: সিলেটে কুশিয়ারা নদীর চার পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করছে। বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাউবোর সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস বলেন, ‘সিলেটের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি ও বন্যা পরিস্থিতি নির্ভর করে ভারতের পাহাড়ি ঢলের ওপর। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তাই আমাদের নদ-নদীগুলোতে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি অব্যাহত থাকে, তাহলে সিলেটে আবার বন্যার শঙ্কা রয়েছে।’