জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ আজ সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
মঙ্গলবার (২৮ অক্টােবর) দুপুর ১২টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের উপস্থিতিতে কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে এই সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দল এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে তৈরি এই সুপারিশে সনদ বাস্তবায়নের আইনি ও রাজনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার বিকেলে যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিশনের সমাপনী বৈঠকে এই সুপারিশ চূড়ান্ত হয়। ঐকমত্য কমিশন সূত্র জানিয়েছে, সব কূল রক্ষা করেই সনদ বাস্তবায়নের এই রূপরেখা তৈরি করা হয়। সনদ বাস্তবায়নের এই সুপারিশ জমা দেওয়ার মাধ্যমে আগামী ৩১ অক্টোবর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আজই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন তার দায়িত্ব শেষ করবে। এ সময় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করার পাশাপাশি অন্য সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ বাস্তবায়নেও সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান কমিশনের সদস্যরা।
বাস্তবায়নের পথে বড় পদক্ষেপ
সরকারের কাছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আট মাসব্যাপী ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞ। গতকাল বিকেলে প্রধান উপদেষ্টা ও কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় কমিশনের সমাপনী বৈঠক। এতে সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, বদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামান, সফর রাজ হোসেন ও মো. আইয়ুব মিয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
সভায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই প্রক্রিয়ায় যেসব ডকুমেন্ট, আলোচনা ও ছবি-ভিডিও তৈরি হয়েছে, সেগুলো ইতিহাসের সম্পদ। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। আমরা কীভাবে ঐকমত্যে পৌঁছেছি, তা জানানোই হবে গণতান্ত্রিক বিকাশের শিক্ষণীয় অধ্যায়।’
কী থাকছে সনদ বাস্তবায়নের সুপারিশে?
ঐকমত্য কমিশনের সূত্র জানিয়েছে, সুপারিশে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রধান কাঠামোকে পাঁচটি ধাপে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো-
১. প্রথমে ‘জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ নামে একটি বিশেষ আদেশ জারি করা হবে, যা গণ-অভ্যুত্থানকে ভিত্তি হিসেবে নেবে।
২. সেই আদেশের অধীনে গণভোটসংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি হবে; এর মাধ্যমে জনগণের সম্মতি নেওয়া হবে।
৩. গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে ঐকমত্য কমিশনের প্রণীত সংস্কার প্রস্তাবই সরাসরি বাস্তবায়ন হবে।
৪. আগামী জাতীয় সংসদ ২৭০ দিনের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করবে এবং এই সময়ের মধ্যেই সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবগুলো পাস করতে হবে।
৫. গণভোটে পাস হলে সংসদে দ্বিকক্ষ ব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে- সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবও এতে আছে।
এ ছাড়া কমিশনের খসড়ায় বিকল্প একটি পথও রাখা হয়েছে- সংস্কার প্রস্তাবগুলো বিল আকারে সংসদে পেশ করে তার ভিত্তিতেই গণভোট আয়োজন করা। তবে উভয় পথেই মূল লক্ষ্য একই- আইনি বৈধতা ও গণসমর্থনের ভিত্তিতে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন।
সুপারিশ প্রস্তুতে দফায় দফায় বৈঠক
কমিশনের একাধিক সূত্র জানায়, রবিবার বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কমিশন বৈঠকে সুপারিশের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। এরপর গতকাল সকাল ১০টায় কমিশন পুনরায় বসে শেষ মুহূর্তের সংযোজন-বিয়োজনে। এরপর বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সামনে ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় সংক্রান্ত চূড়ান্ত সুপারিশপত্র’ উপস্থাপন করে কমিশন। আগামী ৩১ অক্টোবর কমিশনের মেয়াদ শেষ হলেও প্রয়োজনে সদস্যরা পরামর্শমূলকভাবে সরকারের পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
গণ-অভ্যুত্থানের পর জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন প্রক্রিয়া শুরু হয় গত আগস্টে। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, আইনবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের মতামতের ভিত্তিতে কমিশন টানা তিন মাসে ৮৪ দফা সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করে- এর মধ্যে ৪৭টি সরাসরি সংবিধানসংক্রান্ত।
অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে শুরু হয় বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরির কাজ। গণভোটের আইনি ভিত্তি, সংসদের ভূমিকা, বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা- সব দিক নিয়েই দফায় দফায় বৈঠক করেছে কমিশন। একপর্যায়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও আইনজীবীদের নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়।
শেষ মুহূর্তের সংযোজন-বিয়োজন
কমিশন সূত্র জানায়, গতকাল বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর খসড়ায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন যুক্ত করা হয়- গণভোটের সময় নির্ধারণ এবং আদেশ কে জারি করবে এই দুটি বিষয়ের সিদ্ধান্ত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে (২৭০ দিন) সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে সংসদ বিলুপ্ত হবে না; বরং একটি ‘ইতিবাচক বিকল্প প্রণোদনা ব্যবস্থা’ থাকবে, যাতে সংসদ দ্রুত সংস্কার শেষ করে।
বাস্তবায়নের সুপারিশে সব কূল রক্ষার চেষ্টা
ঐকমত্য কমিশনের সমাপনী বৈঠকে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করেছি এমন একটি বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি করতে, যাতে রাজনৈতিক ঐক্য অক্ষুণ্ণ থাকে, আবার আইনি বৈধতাও নিশ্চিত হয়। সব কূল রক্ষা করে এই সুপারিশ তৈরি করা হয়েছে। চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের যে ঐক্যের ভিত্তি দিয়েছে, সেটাকে সংরক্ষণ করাই ছিল আমাদের লক্ষ্য। সংস্কারের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক।’
অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, আজ সরকারের হাতে সুপারিশ হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম কার্যত শেষ হবে। তবে কমিশন সদস্যদের আশা- এই প্রক্রিয়া শুধু সরকারের কাজকে নয়, জনগণের প্রত্যাশাকেও প্রতিফলিত করবে। তিনি আরও বলেন, ‘কমিশনের কাজ শেষ, কিন্তু সংস্কারযাত্রা শুরু হচ্ছে এখন। আমরা চাই, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো সেই পথেই এগিয়ে যাক, যে পথে জনগণ একবার হেঁটে দেখেছে স্বাধীনতার নতুন অর্থ।’
কমিশনের শেষ বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এই কমিশনের কাজ শুধু আজকের নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি মানদণ্ড তৈরি করেছে। আলোচনা, মতভেদ, সমঝোতা- সবকিছুই নথিবদ্ধ করা হোক। কারণ এই নথিগুলো হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের ইতিহাস।
কমিশনের সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক বলেন, ‘কমিশনের বৈঠকগুলোতে যেমন সৌহার্দ্য ছিল, গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও তেমন ঐক্য ছিল। এটাই আশার জায়গা।’ সফর রাজ হোসেন (পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান) বলেন, ‘প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘ আলোচনায় অংশ নিয়েছে। এই সংস্কৃতি টিকে থাকুক।’ ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জুলাই সনদের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারও জরুরি। সরকার যেন এ সুযোগ কাজে লাগায়।’ প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, ‘শহিদ পরিবারের প্রত্যাশা একটাই- সংস্কার বাস্তবায়ন। সেটাই হবে জুলাই আন্দোলনের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।’
জুলাই সনদ তৈরির ইতিহাস
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত হয় জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, যার নেতৃত্বে ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই কমিশনের দায়িত্ব ছিল একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য জাতীয় সনদ তৈরি করা; যা ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা, নির্বাচন, বিচার ও নাগরিক অধিকারের দিকনির্দেশনা দেবে।
এরপর ধারাবাহিক সংলাপ ও কর্মশালার মধ্য দিয়ে কমিশন দেশের ২৫টি রাজনৈতিক দল ও জোটের মতামত সংগ্রহ করে। এই প্রক্রিয়ায় মোট ৮৪ দফা সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়, যার মধ্যে ৪৭টি সরাসরি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাকিগুলো প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারবিষয়ক। রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তাব দেয় সংসদীয় ব্যবস্থার জবাবদিহি বাড়ানো, দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা, পুলিশের জবাবদিহিমূলক পুনর্গঠন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তার বিষয়ে।
গত ১৭ অক্টোবর ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ ২৪টি রাজনৈতিক দলের নেতারা। এক দিন পর ১৯ অক্টোবর জুলাই সনদে সই করে গণফোরাম। কিন্তু জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) সিপিবির নেতৃত্বাধীন ছয়টি বাম দল এখনো সনদে সই করেনি। তাদের মধ্যে এনসিপি এ বিষয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছে, সনদ বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা ছাড়া তারা স্বাক্ষর করবে না।
সনদ স্বাক্ষরের পর কমিশন মনোযোগ দেয় সনদ বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণে, যেখানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা। কমিশন প্রথমে বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা নিয়ে বিভাজিত ছিল- ২৭০ দিনের মধ্যে সংসদ সংস্কার শেষ না করলে কী হবে, তা নিয়ে ছিল মতপার্থক্য। তবে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে ‘ইতিবাচক প্রণোদনাভিত্তিক’ বাস্তবায়ন মডেলই বেছে নেয় কমিশন। এরপর বহু পর্যালোচনা শেষে ঐকমত্য কমিশনের তৈরি করা সমন্বিত প্রস্তাবে আইন, রাজনীতি ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।