অসামান্য এক মানুষ ছিলেন মার্ক টালি, জীবন ছিল তার বিচিত্র। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে মার্ক টালি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালি গণমানুষের আশার আলো। রেডিওতে কান পেতে সকাল-সন্ধ্যা বিবিসিতে তার খবর ও সংবাদ পর্যালোচনা শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকত গোটা বাংলাদেশ। বিশ্ব জনমত গঠনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য সাধারণ। সে কারণে এই মহান সাংবাদিক ও বিশ্ব গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব অমর হয়ে থাকবেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অমর ইতিহাসে।...

বলতে কী, ইদানীংকালে শুধু প্রিয়জন হারাবার শোকগাথাই লিখে চলেছি। এই প্রিয়জনদের বেশির ভাগই দেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত মানুষ, যাদের কেউ মুক্তিবাহিনীর অংশ হয়ে অস্ত্র হাতে লড়েছেন, কেউ মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ড সংগঠিত করেছেন, কেউ আবার মুক্তিযুদ্ধের গান গেয়েছেন, কেউ প্রচার কাজে যুক্ত থেকেছেন। এই মানুষেরা প্রায় সবাই বাংলাভাষী স্বদেশি হলেও ভিন দেশের বহুভাষী মানুষও যুক্ত হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে, যারা যার যার অবস্থান থেকে বাঙালির জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে, সত্যের পক্ষে এবং পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন অসীম দৃঢ়তা ও সাহসে। এই অসামান্য মানুষদেরই একজন খ্যাতিমান ব্রিটিশ সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মার্ক টালি, যার পরিবেশিত খবর ও সংবাদ পর্যালোচনা আমাদের জনগোষ্ঠীর কাছে মুক্তিযুদ্ধের খবর জানার প্রধান উৎস ছিল উত্তাল ১৯৭১ দিনগুলোতে।
গত রবিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, সেই কিংবদন্তি মার্ক টালি মারা গেলেন ৯০ বছর বয়সে।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে গোটা বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে অবরুদ্ধ, সংবাদমাধ্যমগুলো ছিল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, হত্যা-নির্যাতন থেকে বাঁচতে ১ কোটি মানুষ দেশ ছেড়ে ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে আশ্রিত। অতএব, জানার সুযোগ নেই কোথায় কী ঘটছে। সেই দুঃসহ দুর্দিনে বস্তুনিষ্ঠ খবর জানতে লন্ডনের বিবিসি রেডিও হয়ে ওঠে প্রায় একমাত্র ভরসা। কারণ সে সময়ে বাঙালি গণমানুষের দুর্দশার প্রকৃত চিত্র যিনি পৌঁছে দিতেন অবরুদ্ধ দেশে এবং সারা বিশ্বের কাছে, তিনি মার্ক টালি। তিনি ছিলেন তখন বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক সংবাদদাতা। সেই থেকে টানা ২০ বছর নয়াদিল্লিতে বিবিসির ব্যুরোপ্রধানের দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি।
অন্যদিকে ভারতের সব শ্রেণির সংবাদপত্র, বিশেষত আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র পালন করে গেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অসামান্য সহযোগীর ভূমিকা, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য ভূমিকার জন্য আরও অনেকের সঙ্গে ২০১২ সালে মার্ক টালিকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ দিয়েছে বাংলাদেশ। সে সম্মাননা নিতে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি, আরও এসেছিলেন একজন অসামান্য ব্রিটিশ সাংবাদিক, সায়মন ড্রিং। টেলিগ্রাফ পত্রিকা যার সরেজমিন রিপোর্ট প্রথমবারের মতো ঢাকায় ২৫ ও ২৬ মার্চের পাকিস্তানি গণহত্যার চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছিল। ২০২১ সালের রোমানিয়ার একটি হাসপাতালে মারা যান ড্রিং।
১৯৭১-এর উত্তাল দিনগুলোতে মুক্তিবাহিনীর একজন হয়ে আমার কোনো সুযোগ ছিল না মার্ক টালিকে চেনার, যদিও পরবর্তী জীবনে বেশ জানাশোনা হয়েছিল সাংবাদিকতার সুবাদে। অসামান্য এক মানুষ ছিলেন মার্ক টালি, জীবন ছিল তার বিচিত্র। ১৯৩৫ সালে জন্ম নেন কলকাতার টালিগঞ্জে, পেশাগত জীবনের বড় অংশ কাটান ভারতে। সম্ভবত সে কারণেই সম্মান জানিয়ে তার মৃত্যুর পর বিবিসি লিখেছে, তিনি ছিলেন বিবিসির ‘ভয়েস অব ইন্ডিয়া’। শুধু বস্তুনিষ্ঠ খবর সম্প্রচার নয়, একজন প্রথম সারির প্রতিবেদক নন, একই সঙ্গে তিনি বিশ্বজোড়া প্রশংসিত হয়েছেন ভারতের রাজনীতি ও প্রায় সব বড় ঘটনার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য বিশ্লেষক হিসেবেও। মোট কথা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে পরবর্তী পাঁচ দশক তিনি প্রায় একচ্ছত্রভাবে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি ঘটনাপ্রবাহের একচ্ছত্র প্রতিবেদক ও পর্যবেক্ষক ছিলেন, হয়ে উঠেছিলেন একজন কিংবদন্তি সাংবাদিক। সংবাদ পরিবেশন ও বিশ্লেষণে তার সততা ও বস্তুনিষ্ঠুতা তাকে একটি শ্রদ্ধেয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল।
মার্ক টালি এ উপমহাদেশের বহু ঐতিহাসিক ঘটনা ও মুহূর্তের সাক্ষী। সেই অভিজ্ঞতা তিনি লিখে গেছেন। প্রকাশ করেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেসব গ্রন্থে তিনি ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে তার গভীর সম্পৃক্ততার ছাপ রেখেছেন।
২০১২ সালে তিনি যখন ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ নিতে ঢাকায় আসেন তখন তিনি এবং সায়মন ড্রিং হোটেল সোনারগাঁয়ে এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা শুনিয়েছেন। সেদিনের স্মৃতিতর্পণেও বাড়তি কিছু বলেননি মার্ক টালি, অকপটভাবে তুলে ধরেছিলেন বাংলাদেশের জন্মের নির্মোহ ইতিহাস।
ভারতে দীর্ঘকালীন অবস্থানের পরও এই সাংবাদিককে বহুবার উগ্রবাদীদের আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। ১৯৯২ সালে, হিন্দু উগ্রপন্থিরা যেদিন বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়, তখন তিনি বড় বিপজ্জনক সময়ের সম্মুখীন হন। এর পরও মার্ক টালি প্রকাশ্যে উচ্চারণ করেছেন- বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা ছিল ভারতের স্বাধীনতার পর ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর ‘সবচেয়ে বড় আঘাত’। বলার অপেক্ষা রাখে না, মার্ক টালির প্রতিবেদন ও সংবাদ বিশ্লেষণ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, অপারেশন ব্লু স্টার, ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড, শিখবিরোধী দাঙ্গা, রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড, পাকিস্তানের সামরিক শাসন, শ্রীলঙ্কায় তামিল টাইগারদের বিদ্রোহ, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।
এই ব্যক্তির সঙ্গে বাংলার মাটির একটি টানা সম্পর্ক আছে। মার্ক টালির মা জন্মেছিলেন বাংলাদেশের আখাউড়ায়, দাদা ও বাবা ছিলেন বড় ব্যবসায়ী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের পরিবার ভারতে ব্যবসা ও প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তিনি ইংরেজ ছিলেন কিন্তু ভারতের মাটিতে তিনি প্রচলিত ‘বিদেশি’ ছিলেন না। কারণ জীবনের চার ভাগের তিন ভাগ ভারতেই কাটিয়েছেন তিনি। নয় বছর বয়সে পড়াশোনার জন্য ব্রিটেনে চলে যান, কেমব্রিজে ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব পড়েন। একসময় পাদ্রি হওয়ার ইচ্ছে ছিল তার, লিংকন থিওলজিক্যাল কলেজেও ভর্তি হন, পরে মত বদলায়। ১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেন। ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করলে ২৪ ঘণ্টার নোটিশে তাকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করা হয়। কিন্তু তিনি ফিরে আসেন ১৮ মাস পর এবং তখন থেকে দিল্লিতেই থেকে যান। দীর্ঘকাল বিবিসিতে যুক্ত থাকার পর এক সময় তিনি প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে দেন, এরপর ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে সরাসরি চাকরি না করলেও বিবিসির নানা অনুষ্ঠান সম্প্রচারের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন।
একজন বিদেশি হয়েও ভারতে বিরল সম্মান লাভ করেছেন মার্ক টালি। তাকে দেওয়া হয়েছে ভারতের দুই শীর্ষ বেসামরিক সম্মাননা- পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ। অন্যদিকে ব্রিটেনও তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সম্প্রচার ও সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ২০০২ সালে তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি গণহত্যা শুরু করার আগে ঢাকায় অবস্থানরত সব বিদেশি সাংবাদিককে আটকে ফেলে পাকিস্তান বাহিনী। এরপর তাদের হোটেল থেকে সরাসরি বিমানে তুলে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল একটিই: যাতে গণহত্যার কোনো খবর বিশ্ববাসীর কাছে না পৌঁছয়। সামরিক জান্তা বিদেশি সাংবাদিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর বিবিসি জুন মাসে মার্ক টালিকে বাংলাদেশে পাঠায়। তিনি ভারত সীমান্তের শরণার্থী শিবির ও বিভিন্ন জেলা ঘুরে মানবিক দুর্দশার চিত্র এবং মুক্তিবাহিনীর খবর পাঠাতে থাকেন। প্রত্যক্ষদর্শীর সেসব খবর বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশের বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত করে।
ইতিহাসের এই সত্য যে, মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে মার্ক টালি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও বাঙালি গণমানুষের আশার আলো। রেডিওতে কান পেতে সকাল-সন্ধ্যা বিবিসিতে তার খবর ও সংবাদ পর্যালোচনা শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকত গোটা বাংলাদেশ। বিশ্ব জনমত গঠনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য সাধারণ। সে কারণে এই মহান সাংবাদিক ও বিশ্ব গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব অমর হয়ে থাকবেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অমর ইতিহাসে।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক



