সিলেটের জনপ্রতিনিধিদের তালিকায় জনপ্রিয় নাম আরিফুল হক চৌধুরী। একই আদর্শের রাজনীতিতে অবিচল থেকে ভোটের মাঠে তার নির্ভয় বিচরণ আর দলমত-নির্বিশেষে নির্মোহ জনসেবায় নিয়োজিত থেকে তিনি রীতিমত ম্যাজিকম্যান হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন সর্বমহলে। তার ম্যাজিকে মাত্র দেড় মাসে তিনি শহর থেকে গ্রামের মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৫৫ ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে হারিয়ে সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর) আসনে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত করেন আরিফুল হক চৌধুরী। নগর ভবন থেকে এখন তার যাত্রা সংসদ ভবনে।
অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যখন বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়, তখনও কেউ ভাবেনি আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-৪ আসনে নির্বাচন করবেন। কারণ, সিলেট মহানগরী অন্তর্ভুক্ত সিলেট-১ আসন থেকে তিনি বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু গত বছর ৩ নভেম্বর যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ২৩৭ আসনের বিপরীতে সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে বিএনপি সেখানে তার নাম ছিল না।
জানা গেছে, মনোনয়ন না পেয়ে আরিফুলসহ তার অনুসারী নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা যখন আশাহত হন, তখন ৪ নভেম্বর দলের উচ্চপর্যায় থেকে তাকে ঢাকায় জরুরি তলব করা হয়। পরে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বাসভবনে দেখা করার ডাক পান। চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করার সময় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও আরিফুল হকের ভিডিও কলে কথা হয়। এ সময় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আরিফুলকে সিলেট-৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নির্দেশ দেন।
এরপর গত ৬ নভেম্বর ঢাকা থেকে ফিরে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থিতা ঘোষণা করেন তিনি। ৭ নভেম্বর থেকেই তিনি সিলেট-৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর উপজেলায় প্রচার কাজ শুরু করেন। কিন্তু তখনও প্রার্থিতা নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। কারণ দলীয়ভাবে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। তাই তিনি যখন সিলেট-৪ আসনে প্রচার শুরু করেন তখন বিএনপির অনেক নেতা তার এই দাবী বিশ্বাস করেননি। তারা মনে করেন মনগড়া কথা বলে এই আসনে প্রচার চালাচ্ছেন আরিফ। তার এই মনগড়া সিদ্ধান্তের জন্য দল থেকে বহিষ্কার করা হবে বলেও মনে করেন অনেক স্থানীয় বিএনপি নেতা। তবে গত ৪ ডিসেম্বর বিএনপির দ্বিতীয় দফায় ঘোষিত প্রার্থীর তালিকায় যখন সিলেট-৪ আসনে আরিফুল হকের নাম আসে তখন সবার ধোঁয়াশা কাটে।
তবে আরিফুল হকের ভোটের মাঠে অজেয় উত্থান ২০১৩ সালে। সে বছর কারাগারে থেকেই প্রথমবারের মতো সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন আরিফুল হক চৌধুরী। পরবর্তীতে আওয়ামী শাসনামলে ২০১৮ সালেও টানা দ্বিতীয়বারের মতো তিনি সিটি মেয়র নির্বাচিত হন। তবে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয় ২০০৩ সালে। সে বছর তিনি সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে কমিশনার (বর্তমান কাউন্সিলর) হিসেবে নির্বাচিত হন। তখন সিটি মেয়র হিসেবে বদর উদ্দিন আহমেদ কামরান নির্বাচিত হলেও নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আরিফুল হক। রাজনীতির বাইরে সবার নজর ছিল তার ওপর। নগর ভবন থেকে সংসদ ভবনযাত্রায় চূড়ান্ত ম্যাজিক দেখা যায় ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে। মাত্র দেড়মাসে সিলেটের তিনটি উপজেলার বাসিন্দাদের মন জয় করে ছিনিয়ে আনেন ভূমিধ্বস জয়। ১২ ফেব্রুয়ারি লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে এমপি নির্বাচিত হন আরিফুল হক চৌধুরী।
বিপুল ভোটে জয়ী হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় আরিফুল হক চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি আনন্দিত। এত অল্প সময়ে সিলেট-৪-এর মানুষজন আমাকে এত বিশ্বাস করেছে, আল্লাহ আমাকে তাদের এই বিশ্বাস ধরে রাখার তাওফিক দিন। আমার আজকের এই বিজয়ের প্রেক্ষাপট তৈরির পিছনে আছেন সিলেট নগরবাসী এবং আমার নেতা প্রয়াত এম সাইফুর রহমান। যার সঙ্গে কাজ করে করে এই নগরীতে আমি কাউন্সিলর থেকে শুরু করেছি। আজ সবার দোয়ায় এমপি নির্বাচিত হয়েছি। সিলেট ৪ আসনের মানুষজন আমার ওপর যে বিশ্বাস রেখেছেন তার মর্যাদা আমি রাখব।’
সিলেট-৪ নির্বাচনি এলাকা একটি সীমান্ত প্রান্তিক অঞ্চল। ওপারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়-পাদদেশ, এপারে মাটির নিচে খনিজ সম্পদে ভরপুর। পাশাপাশি প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্রের জন্য দেশে ও বিদেশে বিশেষভাবে পরিচিত সিলেট-৪ আসনের তিনটি উপজেলা। গোয়াইনঘাট উপজেলায় পড়েছে জাফলং, তামাবিল, বিছনাকান্দি, জলাবন রাতারগুল, কোম্পানীগঞ্জে সাদাপাথর, উৎমাছড়া, ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে এবং জৈন্তাপুরে পড়েছে বাংলাদেশের প্রথম গ্যাসফিল্ড, লাল শাপলা বিল, নীলনদখ্যাত সারী-লালাখাল, সিনেমার শ্যুটিং এরিয়া শ্রীপুর ও রাংপানি। প্রাকৃতিক পর্যটনের চেয়ে প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধির বালু ও পাথরমহাল পুরো এলাকাকে সম্পদশালী করেছে।
আরিফুল হক চৌধুরীর নির্বাচনি প্রচারণা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ভোটের মাঠে নেমেই তিনি ‘প্রাকৃতিক সম্পদের সদ্ব্যবহার’ স্লোগানটি তুলে ধরেন। গ্রামীণ যোগাযোগ বিড়ম্বনার বিষয়টি সরাসরি নির্বাচন কমিশনে উপস্থাপন করেন। এরপর তার অভিজ্ঞতার আলোকে উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়টি প্রকাশ করেন।
উন্নয়ন পরিকল্পনায় তিনি সিলেট অঞ্চলে উন্নয়নের রূপকারখ্যাত রাজনীতিবিদ ও বিগত চারদলীয় জোট সরকার আমলে সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের প্ল্যান তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি স্মরণে রাখেন স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রয়াত দিলদার হোসেন সেলিমকেও। পূর্বসূরিদের স্মরণ বিষয়টি সাধারণ মানুষজনকে আকৃষ্ট করে। আরিফুল হক চৌধুরী তার নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণার সর্বশেষ সমাবেশে সিলেট-৪ নির্বাচনি এলাকাকে ভবিষ্যতে ‘সিলেট উত্তর সিটি’ হিসেবে গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
নির্বাচনি প্রচারণায় সক্রিয় থাকা উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধিরা বলেছেন, আরিফুল হক অল্প দিনে ভোটের মাঠ চষে বেড়ানো, উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি ও পূর্বসূরিদের স্মরণ করার বিষয়টি জনগণের মনজয় করে। এজন্য বড় ব্যবধানে তিনি বিজয়ী হন।
নাঈম/