আরবি রিহমুন শব্দ থেকে আত্মীয়তার উৎপত্তি। যা সম্পর্কের অর্থেও ব্যবহার করা হয়। পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক, ভালোবাসার বন্ধন এবং আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমেই মানুষ একে অপরের সঙ্গী হয়। কখনো বন্ধু হয়। কখনো-বা অচেনা- অদেখা মানুষের মধ্যে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সংসারজীবনের মাধ্যমেও স্থায়ী সম্পর্ক ও আত্মীয়তা করতে প্রয়াসী হয়। এভাবেই মানুষে মানুষে সম্পর্ক, পরস্পর দয়া মায়া মহব্বত ভালোবাসা ও গভীর আত্মীয়তা তৈরি হয়।
আজকাল আমরা প্রযুক্তির দাসে পরিণত হচ্ছি। পারিবারিক সম্পর্ক, ছোটদের প্রতি স্নেহ ভালোবাসা দয়া মায়া মমতা প্রকাশ, বড়দের প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা-ভক্তি ইত্যাদিও ক্রমশই দিন দিন লোপ পাচ্ছে আমাদের থেকে। হারিয়ে যাচ্ছে সম্পর্কের অটুট বন্ধন। আমরা ব্যবহার করছি, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। যার ফলে প্রযুক্তির সাহায্যে দূরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। কথা হচ্ছে। নিয়মিত আলাপ-আলোচনাও চলছে। কিন্তু আমার পাশে বসে থাকা কারও সঙ্গে কথা হচ্ছে না।
অথচ একই সঙ্গে হয়তো বসে আছি। কিন্তু সবাই যার যার কাজে মুঠোফোনে ইন্টারনেটে আসক্ত। এভাবে আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট হচ্ছে। সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় সরাসরি দেখা-সাক্ষাৎও হচ্ছে না। এমনকি মুঠোফোন ব্যবহার করে দু-এক মিনিটের জন্যও কেউ কারও কোনো খবর নিচ্ছি না। কোনো কথা হচ্ছে না নিয়মিত। হচ্ছে না কোনো ধরনের যোগাযোগ। তবে, কীভাবে আমাদের মধ্যকার সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তার সম্পর্ক ইত্যাদি অটুট থাকবে?
আমরা কী তবে পরস্পর সম্পর্কের ও আত্মীয়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে ভুলে যাচ্ছি? তবে তো আমাদের মধ্যে আর যন্ত্রমানবের মধ্যে তেমন একটা তফাত রইল না। এ জন্যই বোধহয় আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ক্ষমতা লাভ করার পর সম্ভবত তোমরা আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করবে এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত : ২২)
বাস্তবে ঘটছে তাই। আমরা কেউ কারও খোঁজখবর রাখছি না। ঘরের কারও সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছি না। কাছের-দূরের কারও সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ রাখতে চাইছি না। সামান্যতম কথাও বলতে চাই না। বাকি যোগাযোগ করে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ করা। খোঁজখবর নেওয়া। সময় করে কোনো আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া। তাদেরকে আসতে বলা। এক বেলা একসঙ্গে একটু আহার করা। কথা বলা। এগুলো এখন আর হয় না। আমরা মানুষ বটে; তবে সামাজিক-পারিবারিক কি না তাতে সন্দেহ করা অবান্তর নয়!
প্রযুক্তিবান্ধব মানুষের তালিকায় আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব বেশি সরব। ওখানে আমাদের নিয়মিত উপস্থিতি। বাস্তবে ঘরে বাইরে রাস্তায় বাজার হাটে বা কোনো লোকসমাগম স্থলে আমরা হাজির হলেও, হাতের যন্ত্র চালনা কিন্তু থেমে নেই। এভাবে কথা বলা ছাড়া। একে অপরের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কথা বলা, ভালো মন্দ কুশল বিনিময় ছাড়াই কী আমাদের সম্পর্ক মজবুত হবে? আমরা কী এভাবে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করতে পারব?
পবিত্র কোরআনে সুরা নিসার ৩৬ নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা নিকটাত্মীয় ও দূরবর্তী আত্মীয় এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সু-আচরণ করো। হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে, যাতে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জীবিকার প্রশস্ততা ও দীর্ঘায়ু লাভের কথাও এসেছে।
বিখ্যাত সাহাবি হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি তার জীবিকার প্রশস্ততা চায় এবং দীর্ঘ জীবন কামনা করে- সে যেন আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করে। (বুখারি ও মুসলিম)
হজরত সুফিয়ান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (বুখারি ও মুসলিম)
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আওফা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.)কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহতায়ালা ওই সম্প্রদায়ের ওপর রহমত অবতীর্ণ করেন না, যে সম্প্রদায় আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে। (বাইহাকি)
আমরা নিয়মিত আমাদের নিকটাত্মীয় ও দূরবর্তী আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নিই। তাদের সঙ্গে কথা বলি। মতবিনিময় করি। ভালো-মন্দ আলাপ-আলোচনা করি। কারও কোনো সমস্যা থাকলে, বিপদগ্রস্ত হলে তা সমাধানের চেষ্টা করি। এভাবে দেখা-সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা বলা ও যোগাযোগের মাধ্যমে সকল প্রকারের আত্মীয়তার সম্পর্ককে মজবুত করি। আর এভাবেই আমরা প্রত্যেকেই জীবিকার সচ্ছলতা ও দীর্ঘ জীবন লাভে সচেষ্ট হই!
লেখক: খতিব
ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর