এ বছরের জুলাইতে বাংলাদেশে নতুন ইতিহাস বিনির্মাণ করেছেন আলোকিত ছাত্রনেতৃত্ব- ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে তা পরিচিতি পেয়েছে বিশ্বব্যাপী। বছরের সেরা ঘটনা এটাই- ‘ছাত্র আন্দোলন’। ছাত্রদের আন্দোলনের সূত্রে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থায় মৌলিক গুণগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছে। তিনি বাধ্য হয়ে দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন।
সূচনা
কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়। আন্দোলন গতিশীল হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের একটি বড় অংশ এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। শুরুতে যারা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, নানা সময়ে গণমাধ্যমে যাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা গেছে, তারাই পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছেন এই আন্দোলনের মুখ ও মুখপাত্র। ‘সমন্বয়ক’ হিসেবে তারা নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন। এই সমন্বয়কদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম, ইংরেজি বিভাগের হাসনাত আবদুল্লাহ, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সারজিস আলম, ভূগোল বিভাগের আবু বাকের মজুমদার প্রমুখ। এরা সবাই ছাত্র কিংবা সদ্য ছাত্রত্ব ছেড়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের মহানায়ক। তবে এককভাবে নয়, সম্মিলিতভাবে, সম্মিলিত নেতৃত্বের মাধ্যমে। বাংলাদেশে এর আগে এমনটি ঘটেনি। নিজেদের সাফল্য সম্পর্কে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘মানুষ মুক্তি খুঁজছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই মুক্তি ঘটেছে।’
আন্দোলনের গতিমুখ ও সাফল্য
বাংলাদেশে ছাত্র-আন্দোলনের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। ছাত্র-আন্দোলনের কারণেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান সফল হয়েছে। ২০২৪-এর জুলাইতে আরও একবার ছাত্র আন্দোলনের অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণে বাংলাদেশ বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনের স্বপ্ন দেখছে। এবারের গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্ব বাংলাদেশকে একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত বহুত্ববাদী অংশগ্রহণমূলক বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছেন। এসবই হচ্ছে তাদের রাষ্ট্রদর্শন। ১৯৭১ সালে যে রাষ্ট্রদর্শনের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই ‘ন্যারেটিভ’কেও তারা সংশোধন করে নতুন ‘ন্যারেটিভ’ সামনে নিয়ে এসেছেন। গত সাড়ে ১৫ বছরে স্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্রীয় যে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা হয়েছে, তারা তার সংস্কারের কথা বলছেন। লক্ষ্য, বাংলাদেশ যাতে আর কখনো স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে না ওঠে। কোনো স্বৈরশাসকের আবির্ভাব যেন আর না ঘটে। সার্বিকভাবে দেশে যেন একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়।
যেভাবে নায়ক হয়ে উঠেছেন তারা
সব মিলিয়ে মাত্র এক মাসের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করেছেন তারা। জুলাইয়ের ২ তারিখ থেকে ৪ দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি দেন। ৬ জুলাই পর্যন্ত তারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ, মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করেন। জুলাইয়ের ৭ তারিখে পালন করা হয় গণপরিবহন বন্ধ ও রাস্তা অবরোধ কর্মসূচি। এরপর আসে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি। বাংলা ব্লকেডের সময় রাজধানীর মেট্রোরেল ছাড়া অন্য সব পরিবহন বন্ধ ছিল। লাগাতার এসব কর্মসূচি পালনের সময় শিক্ষার্থীরা পুলিশি হামলার শিকার হন। ১৪ জুলাই গণপদযাত্রার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বরাবর স্মারকলিপি দেন। ওই দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলে উল্লেখ করলে শিক্ষার্থীরা এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করেন এবং নানা স্লোগান দেন। এরই প্রেক্ষাপটে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘গত রাতে (১৪ জুলাই) বিক্ষোভ করে আমরা সোমবার (১৫ জুলাই) রাত ১২টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে তার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিলাম। প্রত্যাহার না হওয়ায় আমরা রাস্তায় নেমেছি।’ এই বক্তব্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে নাহিদ ইসলাম আন্দোলনের মুখপাত্র হয়ে ওঠেন। ১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। এই ঘটনায় আন্দোলন গতি পায়। আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে। ঊনসত্তরের আসাদের মৃত্যু, মুক্তিযুদ্ধে ড. শামসুজ্জোহার মৃত্যু, এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নূর হোসেনের মৃত্যু ও ড. মিলনের মৃত্যু যেভাবে আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছিল, এবারের গণ-অভ্যুত্থানে আবু সাঈদের মৃত্যু ছাত্র আন্দোলনকে তার চেয়েও অনেক বেশি বেগবান করে।
১৮ জুলাই পালিত হয় ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। ১৯ জুলাই মধ্যরাতে নাহিদ ইসলাম আটক হন। পাশাপাশি অন্য তিন সমন্বয়কের সঙ্গে চলছিল সরকারের তিনজন প্রতিনিধির বৈঠক। সেই বৈঠকে অংশ নেন সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ এবং সহ-সমন্বয়ক তানভীর আহমেদ। বৈঠকে তারা ৮ দফা দাবি জানান। ২১ জুলাই জানানো হয় ৯ দফা দাবি। পরে ২২ জুলাই আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মুখ হয়ে ওঠা নাহিদ ইসলাম ৪ দফা দাবি জানিয়ে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি স্থগিত করেন।
আন্দোলনের এই পর্যায়ে সরকারের নানা তৎপরতার ফলে কিছুটা সমন্বয়হীনতা দেখা দিলেও ২৪ জুলাই থেকে আবার আন্দোলনের গতি সঞ্চারিত হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নিখোঁজ তিন সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদ প্রকাশ্যে আসেন। তারা নতুন করে ৮টি বার্তা দেন। ২৬ জুলাই গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল থেকে নাহিদ ও অন্য দুই সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ও আবু বাকের মজুমদারকে সরকারি গোয়েন্দারা তুলে নিয়ে যায়। পরদিন আরও দুই সমন্বয়ক সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহকে হেফাজতে নেয় গোয়েন্দারা। সমন্বয়করা এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আটক সব শিক্ষার্থীর মুক্তি দাবি করেন এবং সারা দেশের দেয়ালগুলোতে গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখনের কর্মসূচি দেন। পুলিশের চাপে আন্দোলন প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে অন্য সমন্বয়কারীরা জানান এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। ৩১ জুলাই তারা ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করেন। ১ আগস্ট গোয়েন্দা হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছয় সমন্বয়ককে ছেড়ে দেওয়া হয়। এই সমন্বয়কারীরা হচ্ছেন নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও নুসরাত তাবাসসুম।
৩ আগস্ট ডাক দেওয়া হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের। কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আয়োজিত বিশাল সমাবেশ থেকে এই অসহযোগ আন্দোলনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়। শহিদ মিনার থেকে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকার পদত্যাগের ১ দফা ঘোষণা করেন। এ সময় শহিদ মিনারে অন্য কেন্দ্রীয় সমন্বয়করাও উপস্থিত ছিলেন। ৬ আগস্ট ঘোষণা করা হয় ‘লং মার্চ টু ঢাকা’। তবে সেই কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে আনা হয়। ৫ আগস্ট আন্দোলন দমনের নামে ১০৮ জন শিক্ষার্থীসহ সাধারণ নাগরিককে হত্যা করা হয়। এর আগের টানা কয়েক দিনও বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় শত শত নিরীহ মানুষের মৃত্যুর খবর। ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রবল আন্দোলনের মুখে সরকারি বাসভবন গণভবন ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। এভাবে অবসান ঘটে সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসনের। আর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সমন্বয়করা গণ-অভ্যুত্থানের মহানায়ক হয়ে উঠেছেন।
দেশ-শাসনে সমন্বয়ক
শুধু আন্দোলন নয়, দেশ-শাসনেও সমন্বয়করা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ৮ আগস্ট তাদেরই আমন্ত্রণে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন দুই সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা আরেক সমন্বয়ক মাহফুজ আলমও উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করার ফলে তাদের গুরুত্ব এখন অপরিসীম। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে, কী দাঁড়াবে, কোন পথে অগ্রসর হবে, রাষ্ট্রনীতি কী হবে- এই মুহূর্তে তারা সেই ভূমিকা পালন করছেন। সংস্কারের পর নির্বাচনের কথাও তাদের মুখ থেকে শোনা গেছে। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন ঘটে গেছে। বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে এক নতুন রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায়। জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররাই হয়ে উঠেছেন বছরের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য চরিত্র। তাদের হাতেই হয়তো বিনির্মাণ ঘটবে বৈষম্যহীন সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশের।