২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক রাজনীতি অনেকটাই বদলে গেছে। সচরাচর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে রূপ দেখা যায়, চলতি বছর ঘটেছে তার উল্টো। দেশে দেশে রক্ষণশীল রাজনীতিকে জেঁকে বসতে দেখা গেছে, উত্থান হয়েছে আত্ম-কেন্দ্রিক রাজনীতিরও। এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে চলতি বছর যা অবাক করে দিয়েছে পুরো বিশ্বকেই।
ট্রাম্পের ফেরা
এ বছরের ২০ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো হোয়াইট হাউসে ফিরেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরপরই অভিবাসন, গাজা যুদ্ধ, ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্য যুদ্ধ– একাধিক ইস্যুতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন ট্রাম্প। বিশ্ব চলতি বছর দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে শিকল পরিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতেও ট্রাম্পের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দেখা গেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপীয় মিত্রদের বলয় থেকে সরিয়ে এনেছেন। রাশিয়ার সঙ্গেও আলোচনা শুরু করেছেন। এমনকি চলতি বছরে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে বৈঠকও করেছেন ট্রাম্প। এক বছর আগেও এ ধরনের কিছু ছিল অকল্পনীয়। ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের ইস্যুতে এখনো বড় ধরনের কোনো ফলাফল না এলেও গোটা বছর ধরেই ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল।
বছরের উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা ছিল ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ। ক্ষমতায় আসার পর চীনের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেন তিনি। শুধু চীন নয়, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে শুল্ক আরোপ করেন তিনি। এরপর শুল্ক কিছু সময়ের জন্য স্থগিত করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। বাণিজ্যকে পরিণত করেন কূটনীতির হাতিয়ারে। এ নিয়েও ব্যাপক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। বছরের বড় একটা অংশ জুড়ে গণমাধ্যমের শিরোনামে নিয়মিতভাবেই ছিল বিষয়টি।
গাজা যুদ্ধ
গাজায় চলতি বছর তৈরি হয়েছিল মানবেতর পরিস্থিতি। ইসরায়েল খাবার ও প্রয়োজনীয় রসদ আটকে এবং টানা নির্বিচারে হামলা চালিয়ে গোটা উপত্যকাকে ঠেলে দিয়েছে দুর্ভিক্ষের মুখে। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত এক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে একমত হয়েছে ইসরায়েল ও হামাস। তবে সে চুক্তিও বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ইসরায়েল প্রায়ই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে হামলা চালাচ্ছে। চুক্তির শর্ত অনুসারে, হামাসের হাতে থাকা জীবিত ইসরায়েলি জিম্মিরা বাড়ি ফিরতে পেরেছেন।
পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে, চুক্তিটি দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার কথা রয়েছে। এই ধাপে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। তবে ইসরায়েল ও হামাসের দ্বন্দ্ব যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে সে পরিকল্পনা আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন অনেকেই। এরই মধ্যে এ নিয়ে শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সিরিয়ায় নতুন সরকার
গত বছর সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন ছিল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। বছরের প্রথম কয়েক মাসের পুরোটা জুড়েই ছিল সেটির রেশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা থেকে শুরু করে ইসরায়েলের সিরিয়ায় হামলা চালানোর মতো ঘটনাবলিও ছিল আলোচনায়। জানুয়ারিতেই দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা আহমেদ আল শারা। পরে তার অধীনে মার্চে ঘোষিত হয় সিরিয়ার নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভা। এক সময় যুক্তরাষ্ট্রের কালো তালিকাভুক্ত ছিলেন আল শারা। যুক্তরাষ্ট্র সে তালিকা থেকে তার নাম বাদ দিয়েছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে সফরও করেছেন তিনি।
ইউক্রেন যুদ্ধ
ট্রাম্পের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও চলতি বছর রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অন্যকে লক্ষ্য করে হামলার পরিমাণ বাড়িয়েছে। আরও বহু সেনা হারিয়েছে দুই দেশ। ইউক্রেনের পাশে রয়েছে তার ইউরোপীয় মিত্ররা। ফলে এখনো যুদ্ধ টেনে যেতে পারছে তারা। রাশিয়া এখন আলোচনার টেবিলে ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলটি চাইছে। ইউক্রেন তা দিতে রাজি নয়। বছর শেষ হয়ে এলেও এ বিষয়টির সুরাহা হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির বৈঠকের পর ইউক্রেন যুদ্ধ অবসান নিয়ে নতুন করে আশার আলো দেখা দিয়েছে।
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ
চলতি বছরের ১৩ জুন ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল। ওই হামলার মধ্য দিয়ে দুই দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে সামরিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা প্রাণ হারান। নিরাপত্তার জন্য আত্মগোপনে চলে যেতে হয় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকেও। যুদ্ধের একপর্যায়ে, ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পরমাণু কেন্দ্রে হামলা চালায়। এর মধ্য দিয়ে তারাও এই যুদ্ধে জড়ায়। পরে ২৩ জুন ইরান কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। ২৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির কথা জানান। ওই সময়ের পর থেকে ইরান নীরব রয়েছে। তবে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ইসরায়েল ও ইরান আবারও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে এমন শঙ্কাও করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ
চলতি বছরের এপ্রিলে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের পাহেলগাম এলাকায় ভয়াবহ এক সন্ত্রাসী হামলায় অন্তত ২৬ জন বেসামরিক পর্যটক নিহত হন। ভারত সরকার ওই হামলার জন্য পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনকে দায়ী করে এবং ইসলামাবাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলে। তবে পাকিস্তান এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে জানায়, হামলার সঙ্গে তাদের সরকার বা দেশের কোনো পক্ষের সম্পর্ক নেই। এই ঘটনার জেরে দক্ষিণ এশিয়ায় উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। দুই দেশই একে অপরকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে শুরু করে, ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যাও সময়ের সঙ্গে বাড়তে শুরু করে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের উদ্যোগে আলোচনার পর ১০ মে বিকেল ৫টা থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
প্রযুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চিপ প্রযুক্তি ও এআই নিয়ে চলতি বছরও প্রতিযোগিতা অব্যাহত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে এআই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি বেড়েছে। দেশটি নতুন সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে এ শিল্পকে গড়ে তুলতে। তারা চেষ্টা করছে এগিয়ে থাকতে। অন্যদিকে চীনও একই পথে হাঁটছে। জানুয়ারিতে চীনের প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপসিক এআই লঞ্চ হওয়ার পর ব্যাপক ধাক্কা খেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। তবে দ্রুতই তারা সেটি সামলে নেয়। যুক্তরাষ্ট্র এখন চিপ প্রশ্নে কিছুটা নমনীয় অবস্থানে রয়েছে। অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে আলোচনা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত আসে যে চিপ প্রশ্নে তারা চীনকে কিছুটা ছাড় দিতে পারে আগামীতে।
বহুপক্ষীয় ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা
২০২৫ সালে বহুপক্ষীয় ও বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো অভূতপূর্ব চাপের সম্মুখীন হয়। জাতিসংঘের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আরও অর্থায়ন কমানোর হুমকি দেয়, যা সংস্থাটির শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, মানবিক সহায়তা ও কূটনৈতিক মধ্যস্থতার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এর ফলে এরই মধ্যে অনেক উন্নয়নশীল দেশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, বৈশ্বিক সংকটে জাতিসংঘের ভূমিকা আরও সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্রে পরিণত হয়। মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর একাধিক দেশ প্রকাশ্যে আইসিসির এখতিয়ার ও নিরপেক্ষতা নিয়ে আপত্তি তোলে। কিছু রাষ্ট্র আদালতের সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানায়, আবার কেউ কেউ আইসিসি থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার একটি মৌলিক দ্বন্দ্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। আর তা হলো- জাতীয় সার্বভৌমত্ব বনাম আন্তর্জাতিক আইন ও জবাবদিহি। বিশ্লেষকদের মতে, বড় শক্তিগুলোর অনীহা ও দ্বিচারিতার কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বহুপক্ষীয় কাঠামো দুর্বল হলে বিশ্ব রাজনীতি আরও বেশি খণ্ডিত ও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন
২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর। আর ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করে। এই ঘটনা জলবায়ু সংকটকে আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বর্তমানের বাস্তবতা হিসেবে স্পষ্ট করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্রাজিলের বেলেম শহরে অনুষ্ঠিত কপ-৩০ সম্মেলন থেকে বহু আশা রেখেছিল বিশ্বের মানুষ। তবে তা আর পূরণ হয়নি। বরাবরের মতো এবারের সম্মেলনেও আধিপত্য ও প্রভাব দেখা গেছে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের এবং কার্বন নিঃসরণ ও জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পক্ষে থাকা রাষ্ট্রের। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, কপ আয়োজন এখন আর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়।