অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে ২০২৫ সাল। তবে এ বছর মোটাদাগে দেশের অর্থনীতি আশা জাগাতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতির বিশ্লেষক ও শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিনিয়োগে খরা, রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা, শিল্প খাতে ধস, বেসরকারি ঋণপ্রবাহে গতি না থাকা, রাজস্ব আয়ে ঘাটতি, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি–সবকিছু মিলিয়ে বছরের সারাটা সময়ে ছিল অস্থিরতা। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানিতে বিধিনিষেধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক আরোপের কারণেও ব্যবসা-বাণিজ্যে খরচ বাড়ে। পাকিস্তানসহ অনেক দেশে নতুন বাজারের খোঁজ করলেও খুব একটা সফলতা আসেনি। এত নেতিবাচক ধারার মধ্যেও প্রবাসী আয় ও রিজার্ভে ভালো খবর ছিল।
নিট পোশাকশিল্প-মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকেই রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। ওসমান হাদির মৃত্যু, বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন ধরা এবং দেশব্যাপী সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এসেছে। এ ছাড়া প্রায় সারা বছরই দেশের বিভিন্ন স্থানে দাবি আদায়ে মিছিল-সমাবেশসহ আন্দোলন চলেছে। এসব কারণে তৈরি পোশাকসহ সমগ্র শিল্প খাতেই ধস নামে। অনেক অর্ডার (ক্রয়াদেশ) বাতিল হয়েছে। শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আর এতে বেকার হয়েছেন লক্ষাধিক শ্রমিক।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্ক আরোপ দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। এরপর নতুন বাজার খোঁজার চেষ্টা করা হয়। এখনো এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি। এত কিছুর মধ্যে ব্যবসায়ীরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসার প্রস্তুতি নিতে পারেননি।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল খবরের কাগজকে বলেন, ‘৫০টি স্পিনিং মিলসহ ২৫০টি তৈরি পোশাক খাতের কারখানা বন্ধ হয়েছে। শুধু ৫০ মিলে বিনিয়োগ ছিল ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা। এতে ২ লাখ মানুষ বেকার হয়েছেন। দেশের স্পিনিং মিলগুলোতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের স্পিনিং খাত এখন আইসিইউতে আছে। সারা বছরই সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু কাজ হয়নি।’
আরেক ব্যবসায়ী নেতা বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু খবরের কাগজকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের মত আমলে না এনেই চট্টগ্রামসহ দেশের সব বন্দরে মাশুল বাড়ানো হয়েছে। শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। আমরা বারবার চেষ্টা করেছি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলো জানাতে। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনেননি। সারাটা বছর দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য খারাপ গেছে।’
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ না করার দাবি জানিয়েছিলেন। নীতি সুদহার কমানোর কথাও বলেছিলাম। কিন্তু ব্যবসায়ীদের কথা শোনা হয়নি। এসবের নেতিবাচক প্রভাব ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যে। বছরের শেষ সময়ে রপ্তানি আয় কমেছে। সবকিছু মিলিয়ে ২০২৫ সালে দেশের অর্থনীতিতে আশা জাগানো যায়নি।’
সারা বছরই অর্থসংকটে বেকায়দায় ছিল সরকার। অতি জরুরি ছাড়া অন্যান্য খরচ কাটছাঁট করেও এ সংকট থেকে বের হতে পারেনি। বিভিন্ন শর্ত পূরণের চেষ্টা করেও জোটেনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তি। অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে আয়েও ছিল না ভালো খবর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভক্তি নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্দোলনে নামেন। রাজস্ব আদায় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। চলতি বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ছিল। এনবিআরের পরিসংখ্যান বিভাগের শেষ হিসাবে ঘাটতি বেড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে সারা বছরই ব্যাংক খাত ছিল অস্থিতিশীল। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া বেড়েছে। বেসরকারি ঋণপ্রবাহ কমে রেকর্ড হয়েছে। সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা সঞ্চয়পত্রেও হাত দিয়েছে সরকার। সঞ্চয়পত্রে মুনাফা কমানো হয়েছে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, একটি নির্বাচিত সরকার অনেক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে পারে, যা অনির্বাচিত সরকারের পক্ষে সম্ভব হয় না। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম কয়েক মাস আর্থিক খাতে সংস্কারের কথা বলা হয়। চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিল থেকে এসব সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলেও খুব একটা সফল হতে পারেনি। অনেক আয়োজন করে বিনিয়োগ সামিট করলেও বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা যায়নি। চলতি বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ বাড়েনি। বিনিয়োগ না থাকায় একটি দেশের অর্থনীতি কীভাবে ইতিবাচক ধারায় আসবে?
সারা বছরই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে ছিলেন সাধারণ মানুষ। বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরেই ছিল। বিভিন্ন কৌশলে সিন্ডিকেট পণ্য মূল্য বাড়িয়েছে। তবে বছরের শেষভাগে মূল্যস্ফীতি বাড়ার হার কিছুটা কমলেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, সারা বছরই পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, চাল, আটা, ময়দা, মাছ, মাংসসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকে। এখন সবজির ভরা মৌসুম, তারপরও দাম সেভাবে কমছে না। সারা বছরই সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি ছিল বাজার। সরকার এখানে কিছু করতে পারেনি বলেই চলে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ব্যবসায়ীরা সরকারকে তোয়াক্কা না করেই নিজেরাই ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়ে দেন। সরকার তাদের এ সিদ্ধান্ত বাতিলের বহু চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত দাবি মেনে দাম বাড়াতে বাধ্য হয়। পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দিলেও দামে তেমন প্রভাব পড়েনি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, সারা বছর সব ধরনের জিনিসপত্রে দাম বাড়ার কারণে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। কারণ জিনিসপত্রে দাম যে হারে বেড়েছে সেই হারে সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি। দাম কমাতে যেভাবে সরবরাহ বাড়ানোর দরকার ছিল, তা হয়নি।
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, মোটাদাগে অর্থনীতি ২০২৫ সালে ভালো যায়নি। বিশেষ করে শিল্প-বিনিয়োগ ভালো যায়নি। বছরের শেষভাগে রপ্তানিতে নেতিবাচক ধারা দেখা যায়। জিনিসপত্রের দাম কমেনি। ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা আসেনি। সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি আছে। এসবের বেশির ভাগই উত্তরাধিকার সূত্র প্রাপ্ত। তবে প্রবাসী আয় ও রিজার্ভ বেড়েছে, এটি ভালো খবর।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘চলতি বছর দেশের বেসরকারি খাত স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে গেল। অন্তর্বর্তী সরকারের কেউ ব্যবসায়ীদের দাবিদাওয়া বা কথা শুনছেন না। বলছেন রিজার্ভ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা আমদানিনির্ভর একটি দেশ। যদি ব্যবসা না বাড়ে, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি না হয়, ডলারের চাহিদাই যদি কমে যায়, তখন রিজার্ভ তো বাড়বেই। দেশের অর্থনীতি বেগবান হওয়ার কারণে রিজার্ভ বাড়েনি। চাহিদা, যন্ত্রপাতি আমদানি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে বলে এবং ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ না করার কারণে ডলারের চাহিদা কমেছে ও রিজার্ভ বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ভালো কাজের জন্য এমনটি হয়েছে সে ধারণা ভুল। বরং ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো না থাকায় রিজার্ভ বাড়ছে।’