রাজধানী শহর ঢাকা থেকে ফরহাদ ভাই এসেছেন গ্রামে। আমরা খুব খুশি। একজন শহুরে বড়ভাইকে নিয়ে এবার বৈশাখী আনন্দ করব। মেলায় ঘুরব। চড়কে চড়ব। বিন্নি খই, বাতাসা খাব। কবি গান, জারি গান শুনব। আরও হরেকরকম আনন্দ করব, এ রকম আশা করেছিলাম।
কিন্তু আমাদের আশার গুড়েবালি। ফরহাদ ভাই বৈশাখী মেলায় বিশেষ মজা পাচ্ছে না। গ্রামের মেলা। উত্তপ্ত বৈশাখ। দমকা বাতাস। ধুলোবালির ওড়াওড়ি। ফরহাদ ভাইয়ের এসব ভালো লাগছে না। চড়কে উঠতে সে ভয় পায়। কবি গান, জারি গানেও বিশেষ আগ্রহ পেল না। শেষে ফরহাদ ভাইকে নিয়ে গেলাম গ্রামের বাজারে পরিচিত এক দোকানে হালখাতার দাওয়াত খাওয়াতে। সেখানে জিলাপি, নিমকি, দই-রসগোল্লা, সমুচা ইত্যাদি খেতে দিল। খুবই সুস্বাদু! আমরা হামলে পড়লাম। ফরহাদ ভাইয়ের এসব খাবারেও রুচি নেই। গ্রামের মিষ্টি নাকি ঢাকা শহরের মিষ্টির মতো হয় না। সে ব্র্যান্ডের মিষ্টি ছাড়া খায় না।
কী করব ফরহাদ ভাইকে নিয়ে? তাকে নিয়ে আনন্দ করতে চেয়েছিলাম, অথচ সে আমাদের বৈশাখের আনন্দটাই মাটি করে দিল। আমি বললাম, ফরহাদ ভাই, চলেন পাশের গ্রামে ষাঁড়ের লড়াই আছে, দেখে আসি।
ফরহাদ ভাই বলল, ষাঁড়ের লড়াই দেখতে যাব গুঁতা খেয়ে মরার জন্য? তোরা আমাকে পান্তা-ইলিশ খাওয়াতে পারলি না। ধুর! আর কখনোই বৈশাখে গ্রামে আসব না। পান্তা-ইলিশ ছাড়া বৈশাখ হয়?
ফরহাদ ভাই প্রথম থেকেই পান্তা-ইলিশ, পান্তা-ইলিশ করছে। কিন্তু পান্তা-ইলিশ তো নেই। গ্রামের কৃষক-শ্রমিকরা পান্তা ভাত খান, ইলিশ মাছ দিয়েও খান, তবে সেটা খান সাধারণভাবে। বৈশাখে বিশেষভাবে পান্তা ইলিশ খান না। বৈশাখে জিলাপি, নাড়ু, বাতাসা, মুড়ি-মুড়কিতেই আমাদের আনন্দ।
ফেকু আমাকে পেছন থেকে খোঁচা দিয়ে বলল, পান্তা-ইলিশ না ঘোড়ার ডিম খায়। ঢাকায় পান্তা-ইলিশের দাম জানিস? যে কিপ্টার কিপ্টা। ১০ টাকার বাতাসা কিনতে সাহস পায় না। আমাদের কাছে যত চাপাবাজি।
ফরহাদ ভাই বলল, ফেকু, কিছু বললি?
ফেকু বলল, না ফরহাদ ভাই, কিছু বলিনি।
— কিপ্টা বললি কাকে?
— কিপ্টা বলেছি? কই, না তো।
— তুই কি মনে করিস, আমি বয়রা?
— ও, গাব্বুকে বলেছি। ওর বাপ এই এলাকার খুবই সচ্ছল কৃষক। নিজেদের অনেক জমি-জমা। অথচ দেখেন, এই যে ঘোরাঘুরি করছি ও আমাদের কিছুই খাওয়াচ্ছে না।
ফরহাদ ভাই গাব্বুকে বলল, গাব্বু, তুই তো পান্তা-ইলিশের ব্যবস্থা করতে পারতি।
— ফরহাদ ভাই, আপনি তো বিভিন্ন মেলা ঘুরলেন। কোথাও কি পান্তা-ইলিশের দোকান দেখেছেন? পাওয়া গেলে আমি অবশ্যই খাওয়াতাম। পকেটে যথেষ্ট টাকা আছে। বৈশাখে পান্তা-ইলিশ ঢাকায় হয়, গ্রামে হয় না।
— বাড়িতেও তো ব্যবস্থা করতে পারতি।
— আমরা পয়লা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাই না। মোরগ পোলাও খাই। আমার মায়ের পালা মোরগ। মাংস সেই স্বাদ। ঢাকায় তো এসব মোরগ পাওয়া যায় না। চলেন যাই।
— ধ্যাৎ! গ্রামে আসাটাই ভুল হয়েছে।
ফরহাদ ভাই মন খারাপ করে হাঁটতে লাগল। আমরাও তার সঙ্গে কোনো কথা বলতে পারছিলাম না। পান্তা-ইলিশ ছাড়া বেচারার বৈশাখটাই মাটি হয়ে যাচ্ছে।
এমন সময় মুখোমুখি দেখা গাব্বুর বাবার সঙ্গে। গাব্বুর বাবা বললেন, বাবা ফরহাদ, কেমন আছো? গ্রামের বৈশাখ কেমন লাগছে?
— আছি মন্দ না। বৈশাখ লাগছে মোটামুটি।
— মোটামুটি কেন? ভালো লাগার কথা তো। কত কী হচ্ছে চারদিকে। এই তোমরা তাকে ইছামতি নদীর তীরে নিয়ে যাও, সেখানে নৌকাবাইচ আছে।
আমি বললাম, চাচা, গ্রামে এসে পান্তা-ইলিশ খেতে পারছে না বলে ফরহাদ ভাইয়ের মন খুব খারাপ।
— তাই!
— আমরা তো পান্তা-ইলিশের কোনো ব্যবস্থা করতে পারছি না।
— পান্তা-ইলিশের ব্যবস্থা করতে পারছ না? সন্ধ্যায় ফরহাদকে নিয়ে সবাই আমার বাড়িতে চলে এসো। আমি সব ব্যবস্থা করে রাখব। বাবা ফরহাদ, তুমি মন খারাপ করো না। নৌকাবাইচ দেখে আমার বাড়িতে চলে এসো। পান্তা-ইলিশ খাওয়াব।
আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। ফরহাদ ভাইও খুব খুশি হলো।
সন্ধ্যায় আমরা গেলাম। দেখি সত্যিই পান্তা-ইলিশের আয়োজন। আমরা সবাই খেতে বসলাম। পান্তা ভাত আর ইলিশ মাছ ভাঁজা। তবে মাছ মুখে দিয়ে আমরা যা বোঝার বুঝে গেলাম। তাকালাম ফরহাদ ভাইয়ের দিকে। দেখি সে হাপুস-হুপুস করে খাচ্ছে। কোনোদিকে তার দৃষ্টি নেই। দুই প্লেট ভাত সাবাড় করে দিল। মাছ খেল চার টুকরা। গাব্বুর মা বললেন, বাবা, আরেক টুকরা মাছ দিই?
— না চাচি। অনেক খেয়েছি। আপনার রান্না তুলনাহীন। ঢাকায় হাজার টাকা খরচ করে যে পান্তা-ইলিশ খাই এর কাছে সেসব কিছুই না।
খাওয়া-দাওয়া শেষে ফরহাদ ভাই উঠানে নেমে বৈশাখী বাতাস খেতে লাগল।
গাব্বু বলল, দেখলি আমার বাবার বুদ্ধি? পুকুর থেকে বড় বড় সরপুঁটি ধরে রেখেছিল, আর গরম ভাতে পানি ঢেলে দিয়েছে।
— বুঝেছি। শেষ পর্যন্ত ফরহাদ ভাইকে যে খুশি করতে পেরেছি এটা ভালো লাগছে।
ফরহাদ ভাই ফিরে এসে বলল, আমি প্রতি পয়লা বৈশাখে গ্রামে আসব। তোদের সঙ্গে বৈশাখের আনন্দ করব আর চাচির হাতের পান্তা-ইলিশ খাব।
গাব্বুর মা বললেন, অবশ্যই আসবে বাবা। তুমি এলে আমরা খুব খুশি হব।