তানিয়া বাণিজ্যমেলায় বেড়াতে এসেছে। বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহে মেলাটি বসেছে। তাই কেউ কেউ বৈশাখী মেলাও বলছে। বৈশাখ মাস, তাই বৈশাখী সাজে সেজেছে তানিয়া। তানিয়ার সঙ্গে আরেকটি মেয়েও এসেছে। দুজনই একই সাজে সেজেছে। লাল পেড়ে সাদা রঙের শাড়ি, কোমরে বিছে, কপালে মেরুন রঙের টিপ, চুল শ্যাম্পু করা, চুলে বেলি ফুলের মালা, সবই একই রকম করে পরেছে। একেবারে বাঙালি সাজে সেজেছে দুজন। দুজনকেই চমৎকার লাগছে।
তানিয়ার সঙ্গে যে মেয়েটি আছে, তাকে প্রথম দেখাতেই যে কারও ভালো লেগে যাবে। দুজনই সারাক্ষণ হাত ধরাধরি করে ঘুরছে। কখনো গলা ধরে হাঁটছে। উচ্চৈঃস্বরে হাসাহাসি করছে। কখনো কখনো গরমে শরবত খাচ্ছে। মনে হচ্ছে দুই বান্ধবীতে অসাধারণ মিল। আত্মার আত্মীয়। এই রকমই বন্ধুত্বের সম্পর্ক হওয়া উচিত। সে সম্পর্কে কোনো ফাঁকফোকর থাকবে না। কারও মধ্যে কোনো লজ্জা থাকবে না, কোনো কিছু গোপন থাকবে না। ছোট-বড়, ধনী-গরিব ভেদ থাকবে না, তারাই তো আসল বান্ধবী। তানিয়া আর এই মেয়েটির মধ্যে তেমন সম্পর্কই দেখা যাচ্ছে।
মেলার মাঝেই একটা কৃষ্ণচূড়া ফুল গাছে। গাছে প্রচুর ফুল ফুটেছে। মনে হচ্ছে কে যেন গাছের ওপর লাল রঙের কার্পেট বিছিয়ে রেখেছে। গাছের নিচে কয়েকটি বেঞ্চ রাখা আছে। কেউ কেউ বেঞ্চে বসে গল্প করছে। তানিয়ারা সেখানে বসে পড়ল। সামনেই একজন মাঠাওয়ালা কাকা মাঠা বিক্রি করছিলেন। তানিয়া দুই গ্লাস মাঠা চাইল।
তানিয়া আর মেয়েটি খুব ক্লোজ হয়ে বসেছে। এই সময়ে তানিয়ার এক বন্ধু অমিয়, তানিয়াকে দেখে বলল, হাই তানিয়া।
তানিয়া হাই বলে বলল, এখানে বস।
অমিয় আর তানিয়া মাস্টার্স করেছে একই কলেজ থেকে। অমিয়র জন্য আরেক গ্লাস মাঠা চাইল তানিয়া। মাঠাওয়ালা কাকা সবাইকে মাঠা দিয়ে গেলেন। মাঠা খাওয়ার ফাঁকে তানিয়ার সঙ্গের মেয়েটির দিকে একনজর তাকাল অমিয়। মেয়েটি হৃদয় হরণ করা হাসি হেসে দিল। অমিয় লজ্জা পেল মনে হয়। দুয়েকটা কৃষ্ণচূড়া ফুলের পাপড়ি তানিয়াদের মাথায় পড়ে চুলের সঙ্গে আটকে আছে। তাতে ওদের রূপের শোভা বেড়ে গেছে কয়েকগুণ।
এরই মাঝে অমিয় ও তানিয়ার সঙ্গে থাকা মেয়েটি কয়েকবার চাওয়াচাওয়ি হয়েছে। অমিয় মনে মনে ভেবে নিল, মেয়েটি তানিয়ার বোন অথবা বান্ধবী হবে। দেখতে তো দারুণ। আর বুঝি একা থাকা হলো না। যাওয়ার সময় তানিয়াকে বলে যাবে। অমিয় মাঠার দাম দিয়ে বলল, চল মিষ্টি খাই।
তানিয়া বলল, চল।
তারা মিষ্টির স্টলে গেল। অমিয় ইচ্ছে করেই মেয়েটির পাশে বসল। মেয়েটি তেমন কিছু বলল না। যার যে মিষ্টি পছন্দ হাসি হাট্টা করতে করতে খেয়ে নিল। অমিয় এবার বলল, তানিয়া এবার আমি উঠব। বিশেষ কাজ আছে। একটা কথা বলব, তোর সঙ্গীর সঙ্গে তো পরিচয় করিয়ে দিলি না। আমিই করে নিচ্ছি। আমি অমিয় হাসান, তানিয়ার বন্ধু। ব্যাংকে জব করছি।
তানিয়া কী জানি বলতে যাবে, এমন সময় অমিয় বলল, আমি সরাসরি কথা বলতে ভালোবাসি। আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। মা আমার জন্য মেয়ে খুঁজছে। আমি মাকে বলব, আর মেয়ে খোঁজার দরকার নেই। আমি মেয়ে পেয়ে গেছি।
মেয়েটি বলল, তোমাকেও আমার খুব ভালো লেগেছে বাবা! আমিও তানিয়ার জন্য ছেলে খুঁজছি।
অমিয় কেমন জানি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। উনি কী বলেন, বাবা! মাথায় সিস্টেম ইরর দেখাচ্ছে। মানে, যাকে এতক্ষণ তানিয়ার বান্ধবী ভেবে প্রেমে পড়ে যাচ্ছিলাম, সে তানিয়ার মা! তানিয়ার মার বয়স তানিয়ার চেয়ে কম দেখাচ্ছে। মানুষ এতটা বয়সচোর হয়!
তানিয়া বলল, মা, অমিয় আমার বন্ধু।
তানিয়ার মা বলল, ভালো।
অমিয় তখনো ভাবছে, আমি কি বেঁচে আছি নাকি, এখান থেকে লজ্জায় উধাও হয়ে গেছি।
গাছের ওপর থেকে কিছু কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি পড়ল। মনে হলো গাছটাও অমিয়র বোকামিতে হেসে দিল।