আমি খাটে হেলান দিয়ে বই পড়ছি, বউ সোফায় বসে টিভি দেখছে। পানিতে বসে থাকা মহিষ আর সিরিয়াল দেখতে বসা বাড়ির বউকে সহজে উঠানো যায় না। এক ঘণ্টা ধরে বউকে ডাকছি এক কাপ চায়ের জন্য, আমাকে পাত্তাই দিচ্ছে না। একবার ধমক দিয়ে বলল, এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়ার মুরোদ নাই আবার গেছো বিয়ে করতে? তোমাকে বিয়ে করতে বলেছে কোন বলদে? দেখছো না ব্যস্ত আছি?
এরপর আর কথা চলে না। এরও আধঘণ্টা পর আমি বই ফেলে তার পাশে গিয়ে বসলাম। সে একমনে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে পানি।
আমি তার মাথায় হাত রেখে বললাম, কাঁদছ নাকি! কাজ ফেলে জামাইকে এক কাপ চা খাওয়াতে পারছ না বলে কাঁদতে হবে? আমার জন্য এত মায়া! আহা রে! বলেই তার একটা হাত ধরতে গেলাম।
বউ এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, একদম বিরক্ত করবা না, কীসের মায়া। আমার খেয়েদেয়ে কাজ নাই, তোমার জন্য কাঁদতে যাব? হু আর ইউ? আমি তো কাঁদছি ওই নিরীহ জামাইটার জন্য? ওর বউটা কী দজ্জাল...
আমি অভিমানের গলায় বললাম, নিজের জামাই বাদ দিয়ে আরেকজনের জামাইয়ের জন্য কাঁদতে বসেছ, কাজটা ঠিক হচ্ছে না। দিস ইজ নট ফেয়ার।
আরে কাঁদছি কী আর সাধে? শোনো কী হইছে, ওই দজ্জাল মহিলা জামাই আজকে ইলিশ মাছ ভাজা দিয়ে খিচুড়ি খাইতে চাইছে। মহিলা কিছুতেই রান্না করে দেবে না। জামাইয়ের সামান্য একটা আবদার পূরণ করতে পারে না, এরা আবার কেমন মহিলা? এমন মহিলাদের বিয়ে করাই উচিত না। এসব বদ মহিলার কারণেই সংসারে অশান্তি হয়।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ঠিক কথা। এই জন্য আমি প্রায়ই হাত তুলে দোয়া করি, সবাই যেন তোমার মতো বউ পায়।
বউ খুশি খুশি গলায় বলল, সত্যি? তুমি আমাকে নিয়ে এত হ্যাপি?
—আরে কীসের হ্যাপি! সবাই বুঝুক, তোমার মতো মেয়ে বিয়ে করলে জামাইয়ের কী হাল হয়।
সিরিয়াল শেষ হয়ে গেছে। বউ টিভি বন্ধ করতে করতে বলল, তুমি যেন কী বলতে চাইছিলা? আমার বিরুদ্ধে তোমার কোনো অভিযোগ আছে?
—আছে তো!
বউ নিজের চুল ঠিক করতে করতে বলল, যদি কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে বলার দরকার নাই। চুপচাপ সহ্য করে যাও।
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, সেটাই তো করছি। তবে আজকে শরীরটা কেন যেন ম্যাজম্যাজ করছে, কিছুই ভালো লাগছে না। এই আসো না একটু ঝগড়া করি। তোমার সঙ্গে ঝগড়া করলেই আমার মন ফুরফুরে হয়ে যায়। আমাদের বংশের অনেক অজানা ইতিহাস জানা হয়ে যায়। লয়্যাল হয়ে দেখেছি, দয়াল হয়েও দেখেছি, শান্তি শুধু তোমার সঙ্গে ঝগড়াতে।
বউ কিছুক্ষণ রাগী চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, তোমার কথাবার্তা শুনলে আমার মনে চৌধুরী সাহেবদের মতো প্রতিশোধের আগুন জ্বলে। গুণ্ডা ভাড়া করার টাকা নাই বলে তোমাকে কিছু করতে পারি না। ভাবছি একটা কাল নাগ পুষব তোমাকে সাইজ করার জন্য। কাল নাগটা কলেজ না ভার্সিটি লেভেলের আনব সেটা চিন্তা করছি। আমি বুঝতে পারছি, তুমি সহজে মানুষ হবা না।
আমি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললাম, তোমার কথার বিষ যে ব্যাটা হজম করা শিখে গেছে, তাকে কালনাগের ভয় দেখিয়ে লাভ নাই। শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে।
বউ বিলাপ শুরু করল, বিয়ের পর উপহার হিসেবে কত মেয়ে টাকা পায়, ফ্ল্যাট পায়, জমি পায়। আমি পাইছি ঘাড়ত্যাড়া জামাই!
আমি তার হাত ধরে সান্ত্বনা দিতে গেলাম, সে এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, তুমি আমার হাত ধরবে না। আমি যাকে তাকে আমার হাত ধরতে দিই না। আমার হাতের একটা ইজ্জত আছে। জীবনে নিশ্চয় অনেক পুণ্য করছিলা, সেজন্যই আমার মতো একটা বউ পাইছ।
—আরে কীসের পুণ্য, ভাদ্র মাসে একবার একটা কুকুরকে ঢিল মেরেছিলাম, তাই হয়তো...
—অশিক্ষিত, ক্ষ্যাত, মূর্খ...
আমি আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম, এতকিছু জীবনে শিখলাম, এত লেখাপড়া করলাম, তারপরও বউয়ের কাছে শিক্ষিত হতে পারলাম না! হায় আফসোস!
বউ বউ হেঁচকি তুলে কাঁদতে বসল, এজন্যই ভেবেচিন্তে কাজ করতে হয়। আগেপিছে না ভেবে তোমাকে বিয়ে করে কী যে ভুল করেছি!
আমি গাল চুলকাতে চুলকাতে বললাম, ভেবেচিন্তে বিয়ে করেও লাভ হয় না। আমি তো ভেবেচিন্তে তোমাকে বিয়ে করেছিলাম। লাভ হয়েছে কিছু? বিয়ে মানেই লস আর লস। অতএব...
কথা শেষ হওয়ার আগেই দেখি বউ আমার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে। ভয়ে আর কথা শেষ করতে পারলাম না।