পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়েছিলাম। এই পথেই সুমনা যাবে কোচিং থেকে। মাথায় হাত দিয়ে দেখে নিলাম চুলের ভাঁজটা ঠিক আছে কিনা। সামনে একটা সাইকেল এসে থামল। সাইকেলের সামনে একটা ছোট মাইক লাগানো। সেখান থেকে ভেসে আসছে,
‘জায়গায় খায়, জায়গায় ব্রেক।
ইন্দুর তোর বাঁচন নাই, ইন্দুর তোর রেহাই নাই,
ধরা খাইলে জামিন নাই।’
ইঁদুর, তেলাপোকা মারার, চুলকানি নিরাময়ের, শক্তি বর্ধক ওষুধ বিক্রি করছে লোকটি। মনে পড়ে গেল, আম্মা বলেছিল ইঁদুরের ওষুধ নিতে। এই ইঁদুরের যন্ত্রণায় বাসার অবস্থা খুব বেশি ভালো না। ওই দিন ছোট বোন তার রুমে একটা ইঁদুর দেখে ‘এমা ছিঃ’ করতে করতে দৌড়ে আমাদের কাজের বুয়াকে ধাক্কা দিল। সেই ধাক্কায় কাচের প্লেট ভাঙল। সেই ভাঙা কাচে বুয়া পা কেটে মাথায় হাত দিয়ে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। আমি রুমে বসে মুভি দেখছিলাম।
আম্মা এসে বলল, কালকের মধ্যে ইঁদুর মারার ওষুধ না আনলে আমার খবর আছে। দেশের খবর টবর এমনিতেই ভালো যাচ্ছে না। তাই তাড়াতাড়ি সেই লোকের দিকে এগিয়ে গেলাম।
— ভাই ইঁদুর মারার ওষুধ কত?
— একটা ত্রিশ টেহা আরেকটা চল্লিশ।
— পার্থক্য কী?
— একটা দিলে মরবে। আরেকটা দিলে লাফায়া লাফায়া মরবে!
— মরার দরকার। ভালোটা দেন।
— চল্লিশ টেহা দেন।
আমি চল্লিশ টাকা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে মরার এক ফাইল ইঁদুরের ওষুধ কিনলাম।
— ভাই কলিকাতা হারবাল লাগব নাকি?
‘না না। আমি ঠিক আছি।’ খেঁকিয়ে উঠলাম।
— অহংকার কইরেন না ভাইডি, অহংকারই কিন্তু পতনের মূল।
আমি বাসায় এসে আম্মাকে ওষুধ বুঝিয়ে দিলাম।
‘লাফিয়ে লাফিয়ে মরবে’ বলার পর ছোট বোন ‘এমা ছিঃ ছিঃ’ বলে রুমে ঢুকে গেল।
তিন দিন পর আম্মা জানাল ইঁদুর মরেনি। কাজের বুয়া জানাল, ‘মনে হইতেছে আরো বাইড়া গেসে ভাইজান!’
আমি মাথায় হাত দিয়ে বসলাম। পরদিন সেই সাইকেলওয়ালাকে আবার পেলাম।
–এই যে ভাই কী ওষুধ দিলেন? মরা দূরে থাক, ইঁদুর আরও বেড়ে গেছে।
–বুঝছি আপনাগো ইঁদুর দিনে খাওয়াইন্যা ইন্দুর। ত্রিশ টেহা যেটা সেইটা নিইয়া যান।
আমি আবার কিনলাম। আবার সেই একই অবস্থা।
বাসায় এসে বললাম, ‘এরা এবার দিনে মরবে। এরা নাকি রাতে মরে না।’
ছোট বোন ‘এমা ছিঃ ছিঃ’ বলে রুমে ঢুকে গেল।
তিনদিন পর আম্মা এসে জানাল ইঁদুর একটিও মরেনি। কাজের বুয়া জানাল, ‘মনে হইতেছে আরও বাইড়া গেসে ভাইজান!’
আমি আর মাথায় হাত দিয়ে বসলাম না। এবার ভাবলাম এলাকার দোকান থেকে কিনি।
এলাকার পল্টু ভাই থেকে এক প্যাকেট নিলাম। রাতের বেলা এবার নিজের হাতেই ওষুধ ছড়ালাম। প্যাকেট ফেলতে গিয়ে ওষুধের মেয়াদের দিকে চোখ গেল। মেয়াদ অনেক আগেই উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। আমি ততক্ষণে ওষুধ ছড়িয়ে দিয়েছি।
পল্টু ভাইকে গিয়ে ধরলাম। উনি উদাস ভঙ্গিতে হাই তুলতে তুলতে বলল, ‘একে তো বিষ। তার ওপর আবার মেয়াদ গ্যাছে গা। বুঝছেন তো জিনিসটা কি দাঁড়াইছে?’
তিন দিন পর বুঝলাম জিনিস কি দাঁড়িয়েছে। শুধু ইঁদুর না, তেলাপোকা পর্যন্ত সাফ। কাজের বুয়া হালি হালি ইঁদুর আর তেলাপোকা ফেলে আর বলে, ‘বাপের জনমে এই কাণ্ড দেহি নাই। কী বিষ আনছেন ভাইজান।’
ছোট বোন এসে বলল, তার পোষা বিড়াল মিনি কেমন যেন ঢুলছে।
–তুই কী এমন জিনিস আনছিস বল। আমার মিনি এখন সারা দিন ঝিমুচ্ছে? আমার মিনির জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার তোকে কে দিয়েছে?
আমি টা টা করে হাসতে লাগলাম।
কয়েকদিন পর খালামনি এসে জানাল, তাদের বাসা ভর্তি ইঁদুর, তেলাপোকা। আমি যেন সেই ওষুধটা এনে দিই। ওষুধের দামের পাশাপাশি ১০০ টাকা পাব।
তাড়াতাড়ি পল্টু ভাইয়ের দোকানে গেলাম।
–ভাই তাড়াতাড়ি একটা ইঁদুরের ওষুধ দেন।
প্যাকেটটা হাতে নিয়ে দেখি এটার মেয়াদ আছে।
–আরে ভাই মেয়াদ ছাড়াটা দেন।
‘নাই। মেয়াদ ছাড়া জিনিস আর রাহি না।’ কান খোঁচাতে খোঁচাতে পল্টু ভাই বলল।
এরই মধ্যে একটা ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে এল, ‘ভাই একটা মেয়াদ ছাড়া ইঁদুরের বিষ দেন!! তাড়াতাড়ি!’