আজ বেশ কয়েকদিন ধরে মশা মামার ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক করার পরিকল্পনা করেছি। কারণ, সমঝোতা না করলে টিকে থাকার উপায় নেই। মশা মামা মানে বুঝতেই পারছেন বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের ট্রেন্ডিং সমস্যা।
খুব সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মশা মামাকে ফোন করলাম। অনেকবার ফোন দেওয়ার পরও মশা ফোন রিসিভ করছিলেন না। কারণ কী, এমন তো হওয়ার কথা নয়! নাকি রাতে ওভারডিউটি করেছেন? যাই হোক নিজের কাজ আগে, অন্যের বিষয়ে নাক গলানোর দরকার নেই।
কিছুক্ষণ পর আবার ফোন দিতেই ওপাশ থেকে ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে মশা মামা বলে উঠলেন, এত সকালে ফোন দিয়ে বিরক্ত করছে কে রে?
আমি একটু কর্কশ গলায় বললাম, মামা আমি আপনার ভাগনে নেপু।
–ভাগনে এত সকালে ফোন কেন?
বললাম, মামা কিছুদিন ধরে যেমন গরম পড়ছে, তেমনি আপনাদের অত্যাচারও বেড়ে গেছে। কোথাও গিয়ে শান্তি পাচ্ছি না। টয়লেটে গেলেও আপনারা দলবল নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন। অজুখানা, গোসলখানা, দাওয়াতখানা, মেহমানখানা, বন্ধ রুম, খোলা রুম, ডাস্টবিন, ছয়তলা, দশতলা কোথাও আপনাদের হাত থেকে রক্ষা নেই। এভাবে তো চলতে পারে না! ওয়াশরুমে একটু শান্তিতে আসল কাজটাও করতে পারি না। আপনাদের সঙ্গে আলোচনা দরকার। একটা গোলটেবিল বৈঠক করব।
শুনে মশা মামা ধমকের সুরে বললেন, ভাগনে আমাদের রেট এখন বেশি। কারণ, আমরা এখন সব জায়গায় প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছি। তবে তুমি যেহেতু বলেছ, দেখি কী করা যায়।
বললাম, অবশ্যই আসতে হবে। আপনাদের জন্য খাবারের মেনু আগেই পাঠিয়ে দিতে পারি। যদি ভালো লাগে তবেই আসবেন। তবে শর্ত একটাই–আমাকে ডিস্টার্ব করা যাবে না।
মশা মামা বললেন, ঠিক আছে। তোমার খাদ্য মেনুটা তৈরি কর। সাঙ্গোপাঙ্গদের সঙ্গে কথা বলে দেখি তারা বৈঠকে আসবে কি না।
মশা মামার জন্য ভিআইপি খাবারের ব্যবস্থা করলাম। খাদ্যতালিকায় রাখলাম বিভিন্ন প্রকারের রক্ত। যেমন–চোরের রক্ত, দারোয়ানের রক্ত, ডাক্তারের রক্ত, উকিলের রক্ত, নায়কের রক্ত, ভিলেনের রক্ত আরও কত শত রক্ত।
মেনুটি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতেই মশা মামা টেক্সট করে বললেন, ভাগনে খাদ্যতালিকা বেশ ভালো। তবে দুয়েকজন ভিআইপির রক্ত যোগ করলে খাবারে বৈচিত্র্যতা আসবে।
বললাম, মামা ভিআইপির রক্ত আমি কোথায় পাব? এ রক্তের দাম অনেক বেশি। তারা আপেল-ফলমূল আর বিদেশি খাবার খায়! আমাকে মাফ করে দিন। এই রক্ত খাওয়াতে পারছি না। প্রয়োজনে আমার গায়ের রক্ত দেব।
মশা মামা চেঁচিয়ে বললেন, ঠিক আছে। বৈঠকের সময় আলোচনা হবে। ঠিকানাটা দাও।
বললাম, চৌরাস্তা বস্তির গলি, কড়াইতলা নারিন্দা। তাড়াতাড়ি চলে আসুন।
একে একে অনেক প্রজাতির মশা এসে গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিলেন। ছিলেন আহ্লাদী মশা, মনচুরা মশা, বাসি মশা, হুরুধুরু মশা, ফিচকে মশা, পেঁচালি মশা, ফুরফুরে মশা, ঠান্ডু মশা, কুতকুত মশা ইত্যাদি।
বললাম, আপনাদের ডেকে আনার জন্য দুঃখিত। কোনো উপায় ছিল না। আশা করি আপনারা আমাকে যন্ত্রণা থেকে রেহাই দেবেন।
আহ্লাদী মশা বললেন, যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন। আমাদের সময়ের দাম আছে।
বললাম, আমি বেকার মানুষ। কয়েল কেনার টাকা নেই। মশারিও টাঙাতে ইচ্ছা করে না। সারা দিন কাজ করে ক্লান্ত শরীরে যখন ঘুমাতে যাই, তখন আপনাদের ঘ্যানর ঘ্যানর, প্যানর প্যানর একদম সহ্য হয় না। রক্ত তো প্রতিদিন খানই, আবার বিরক্তও করেন। প্লিজ বিরক্ত করা বন্ধ করুন। প্রয়োজনে আমি রক্ত বাটিতে করে রেখে দেব, আপনারা এসে খেয়ে যাবেন।
সব মশা রাগান্বিত কণ্ঠে বললেন, আমরা কাজ করে খাই, ঘুষ খাই না। পরিশ্রম করে খেতে ভালো লাগে। আর ওই যে বললে, ঘ্যানর প্যানর-ওটা আমাদের কাজের অংশ। আমরা একসঙ্গে কাজ করি আর গান গাই। গান না গাইলে কাজে মনোযোগ দিতে পারি না!
হতাশ হয়ে বললাম, মামা একটু দেখেন। এখনো বিয়ে-শাদি করিনি। জীবনটা বিফল করে দেবেন না।
মশা মামা বললেন, ঠিক আছে বিষয়টা পরে ভাবা হবে। তবে যারা বেকার এবং বিয়ে করেনি তাদের কাছ থেকে আমরা রক্ত একটু কম খাব। মানে তোমাদের জন্য ৪০ পারসেন্ট ডিসকাউন্ট। আর সবাইকে বলে দেব, যেন ঘুষখোর দুর্নীতিবাজ আর চাঁদাবাজদের রক্ত বেশি করে খায়।