শেষ পর্যন্ত কিস্তিমাত করল কিসমত আলীর মেয়ে কুলসুম বেগম। কুলসুম বেগমের বিয়ে হচ্ছিল না বলে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। প্রতিবেশীরা নানা কথা বলত।
সেই কুলসুম বেগম প্রেমের ফাঁদে ফেলে সুদূর চীন থেকে এই অজপাঁড়াগায়ে নিয়ে এল এক যুবককে। যুবক দেখতে সুদর্শন, নাকটা যা চ্যাপ্টা। চীন-জাপানের মানুষের নাক তো চ্যাপ্টাই হবে। মাথার চুলগুলো খাড়া খাড়া। তবে খাড়া চুল কোনো সমস্যা না।
কুলসুম বেগম তো আনন্দে ঝলমল করছে। পাড়ার ছেলে-বুড়ো সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে কিসমত আলীর বাড়িতে। এর আগে তারা কখনো চাইনিজ দেখেনি। সেই চাইনিজ যুবক আজ তাদের গ্রামের জামাই হতে যাচ্ছে। বিয়ের পর কুলসুম বেগম চলে যাবে চীন দেশে। কপাল একেই বলে!
কুলসুম বেগমের কপাল দেখে গ্রামের অন্যান্য বিয়ের যোগ্য মেয়েরা ফেসবুকে বিদেশি ছেলে খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে। কালো, মুখে বসন্তে দাগওয়ালা আইবুড়ো কুলসুম যদি চীন দেশের ছেলেকে প্রেমের ফাঁদে আটকাতে পারে তো অন্যরা পারবে না কেন?
বিয়ের সব আয়োজন শেষ। সমস্যা দেখা দিল এক জায়গায়। ছেলে তো বাংলা বলতে পারে না, বাংলা বোঝেও না। বিয়ের কাজি যা বলছে ছেলে তা কিছুই বুঝছে না। হাঁ করে কাজির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কুলসুম বেগমের চাচা রহমত আলী বলল–কাজি সাহেব, বিশেষ কিছু বলানোর দরকার নাই। কোনোমতে ওর মুখ দিয়ে ‘কবুল’ শব্দটা বের করেন। তার পর আমাদের মেয়ে ওকে বাংলা শিখায়া নেবে।
পাশ থেকে একজন বলল, বাংলা পারে না তো প্রেম করল কেমনে?
রহমত আলী ধমকে উঠল, প্রেম করছে ইংরেজিতে। তুমি জানো না, আমাদের মেয়ে আইএ পাস?
উপস্থিত মেয়েরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারা বোঝাল, বিদেশি ছেলেকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে হলে ইংরেজি শিখতে হবে। আরেকজন বলল, ইংরেজিতে কবুল বলানোর সিস্টেম আছে নাকি?
আরেকজন বলল, আরে নাহ! ইংরেজিতে বললে বিয়ে হবে না।
ছেলে শুধু এর-ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। বিয়ে করার ব্যাপারে তার ভেতর বিশেষ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবেশী বৃদ্ধ তমিজ মিয়া বলল, এভাবে সময় নষ্ট করে লাভ নাই। ইংরেজি জানে এমন কাউরে নিয়া আসো। সে এর সঙ্গে কথা বলে এর মুখ দিয়ে কবুল বের করতে পারবে।
কয়েকজন ছুটে গেল ইংরেজি জানা লোক আনতে। পাড়ায় লেখাপড়া তো অনেকেই জানে, কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলার মতো তেমন কেউ নাই। বেশির ভাগই অটোপাস যুগে এসএসসি, এইচএসসি পাস করেছে।
একজন রফিক উল্লাহকে ধরে নিয়ে এল। রফিক উল্লাহ বিএ পাস করেছে। সে মোটামুটি ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। রফিক এসে চাইনিজ যুবককে একথা-সেকথা বলে, বিয়ের নিয়মকানুন সম্পর্কে বলে, কিন্তু চাইনিজ যুবক আগের মতোই তাকিয়ে থাকে। কিছুই বলে না।
রফিক বলল, সে তো ইংরেজিও জানে না। আসলে চাইনিজরা নিজেদের ভাষার বাইরে অন্য কোনো ভাষা শেখে না। তাদের মান্দারিন ভাষা খুবই সমৃদ্ধ। এমনকি চাইনিজরা জুকারবার্গের ফেসবুকও ব্যবহার করে না। তাদের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আছে।
এ কথা শুনে সবার চোখ কপালে। প্রেম তো জাকারবার্গের ফেসবুকেই হয়েছে। বৃদ্ধ তমিজ মিয়া বলল, তায়লে সে জাপানিজ। চাইনিজ আর জাপানিজদের দেখতে একই রকম লাগে। জাপানিজদের চোখ আরও একটু বেশি ফোলা, নাক আরও মোটা। দেখো তার চোখ কেমন ফোলা।
রফিক বলল, চাইনিজ, জাপানিজ যাই হোক, তার মুখ থেকে তো কিছু বলাতে হবে। সে তার ভাষাই বলুক। সে তো কিছুই বলছে না। সে ফেসবুকে প্রেম করছে কোন ভাষায়?
এই প্রশ্নটা খুব কার্যকর। কুলসুমের সঙ্গে তার সে দীর্ঘ দেড় বছর চুটিয়ে প্রেম করেছে। তখন সে কোন ভাষায় লিখেছে?
কুলসুমের চাচা রহমত আলী কুলসুমের দিকে তেড়ে গিয়ে ধমকে উঠল, এই কুলসুম, তুই ওর সঙ্গে কোন ভাষায় প্রেম করছোস?
–আমি তো বাংলা ভাষায়ই লিখছি।
–আর সে?
–সেও বাংলা ভাষায় লিখছে।
–তার বাড়ি কোন দেশে বলছিল?
–চীন দেশে।
উপস্থিত সবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। কাজ-কর্ম ফেলে তারা এখানে বসে আছে। ছেলে প্রেম করেছে, প্রেমের টানে বিয়ে করতে এসেছে। এখন মুখে কোনো আওয়াজ বের করছে না।
এক যুবক চোখ রাঙিয়ে বলল, এই মিয়া, তুমি বিদেশি লোক। তার ওপর আমাদের গ্রামের মেয়ে বিয়ে করতে এসেছো। তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে চাই না। কিন্তু এভাবে চুপ করে থাকবে না। চীনের কোন শহরে তোমাদের বাড়ি? ঝটপট বলো। তোমার ভাষাতেই বলো। আমরা তোমার মুখের শব্দ শুনতে চাই। বলো, কোন শহরে তোমার বাড়ি?
–রাঙামাটি শহরে।
রাঙামাটি! সবাই হাঁ হয়ে গেল।
পাশ থেকে এক যুবক বলল, চীনে রাঙামাটি শহর আছে?
–আছে। বিরাট দেশ তো। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি সব আছে।
–কী বলতেছো তুমি?
–আমি একটু টয়লেটে যাব। খুব চাপ দিতেছে।
–যাও, টয়লেটে যাও। যতদূর মনে হইতেছে তোমার কপালে আজ খারাপ কিছু আছে। তোমারে সারা রাত টয়লেটে বেঁধে রাখব। সকালে পুলিশ আসবে। তুমি চরম ধোঁকাবাজি করেছো বোঝা যাচ্ছে।
চীনের রাঙামাটি শহরের যুবক টয়লেটে গেল তো গেল, আর বের হওয়ার নাম নেই। সবাই ডাকাডাকি করতে লাগল, টয়লেটের দরজা ধাক্কাতে লাগল কিন্তু চাইনিজ যুবক তো আর বের হয় না।
শেষে একজন লক্ষ্য করে টয়লেটের পেছনের বেড়া ভাঙা। দেখে চাইনিজ যুবক টয়লেটের পেছনের বেড়া ভেঙে ধানখেতের ভেতর দিয়ে পালিয়ে গেছে।
রাত নেমে এসেছে। চারদিক অন্ধকার। এর মধ্যে চাইনিজ যুবককে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না। তবুও অনেকে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করল। কিন্তু কোথাও পেল না।
চাচা রহমত আলী কুলসুমকে বলল, এই তোর মোবাইল কই?
কুলসুম মোবাইল তুলে দিল চাচার হাতে। রহমত আলী বলল–আজ থেকে তোর মোবাইল চালানো বন্ধ। চীনের রাঙামাটি শহরের যুবকের সঙ্গে প্রেম আর চলবে না।