২৬ মার্চ হঠাৎ করে আসেনি। বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে ২৬ মার্চের আগমন হয়েছে। ’৬০-এর দশকে এ দেশের মানুষ অধিকার থেকে শুরু করে পুরো শায়ত্তশাসন কখনো পায়নি। পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের অসামান্য বৈষম্য বিরাজমান ছিল। এ দেশের মানুষ বহুদিন ধরেই নিপীড়ন ও নির্যাতিত হয়ে আসছিল। এ দেশের শোষিত মানুষ তাদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করে আসছিল। সেখান থেকেই মানুষের মধ্যে মুক্তির একটা সংগ্রাম কাজ করছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির হাতে পাকিস্তানের সামরিক সরকার ক্ষমতা ছাড়ল না। তখন ইয়াহিয়া খান নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করতে চাইলেন। ইয়াহিয়া খানের মনের মধ্যে এক ধরনের প্রতারণা ছিল। তিনি মার্চ মাসে ঢাকায় এলেন সংলাপ করার জন্য। শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের অন্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সংলাপে বসলেন। কিন্তু সেই আলোচনাটা ছিল পুরোটাই ধাপ্পাবাজি এবং সময়ক্ষেপণের একটা উপলক্ষ মাত্র। শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্য নেতাদের সঙ্গে সংলাপে বসে তেমন সুবিধা করতে পারেনি। এ সময়ে তারা আলোচনায় না এসে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আরও বেশি সৈন্য নিয়ে আসে এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ২৪ মার্চ আলোচনায় বসলেও তাতে কোনো অগ্রগতি হলো না। তখন ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নাম দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালাল। ঢাকা নিউমার্কেটের পেছনে ইপিআর ক্যাম্পের পেছনে নিষ্ঠুর হত্যকাণ্ড চালাল। ইতিহাসে এ ধরনের হত্যাযজ্ঞের কাহিনি বিরল। বাঙালিদের ওপর নির্বিচারে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালাল। আমার মনে পড়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষককে তারা হত্যা করল। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল ও সলিমুল্লাহ হলে যত ছাত্র পেয়েছে সবাইকে হত্যা করেছে। ২৫ মার্চ রাতে তুমুল গুলাগুলির শব্দ শোনা যায়। ২৬ মার্চ কারফিউ জারি করা হয়। ২৭ মার্চ কারফিউ যখন শিথিল হলো, তখন ঢাকাবাসী দিগ্বিদিক হয়ে বিভিন্ন দিকে ছুটতে লাগল। শহর থেকে মানুষ গ্রামে যেতে শুরু করল। এই সময় মেজর জিয়া প্রথমে স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। পরে তিনি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা করলেন। দিশেহারা মানুষ তখন পথ খুঁজে পেল। তখন মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস অর্জন করল। মানুষ তখন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করল। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং আমার সৌভাগ্য হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার। আমার মাতৃভূমির জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল অসীম, যার কোনো তুলনা নেই। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সব গণতান্ত্রিক আন্দলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরা ’৬২-এর আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রত্যেক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বলভাবে থাকবে। নিষ্ঠুরভাবে হত্যা, আহত, নিপীড়ন-নির্যাতন, কারাবরণ করেই দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। ছাত্রদের আন্দোলনে জনসমর্থন ছিল। এ কারণেই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
মানুষ যে চেতনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই চেতনা ধূলিসাৎ করে দিয়েছে বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট সরকার। ফ্যাসিস্ট সরকার ও তার সহযোগীরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে দিয়েছে। মানবিক মর্যাদা একদমই ছিল না। বিগত ১৬ বছরে মৌলিক অধিকার বলে কিছু ছিল না। তারা মানুষের অধিকারকে হরণ করেছে। তারা ভোট ও ভাতের অধিকার হরণ করেছে। তারা দেশের মানুষকে বঞ্চিত করেছে। এ কারণেই মানুষের ভেতরে এক ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। দেশের তরুণরা ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। দেশে তারা মানুষের অধিকার ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। তরুণরা নেতৃত্ব দিয়েছে। আমি তাদের সাধুবাদ জানাই। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে আমরা আবার নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। হয়তো আমরা স্বাধীনতার সেই চেতনা ও গণতান্ত্রিক অধিকার আবার ফেরত পাব। দেশ ও মানুষের মুক্তি আমরা আবার ফিরে পাব। দেশে গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধ আবার ফিরে আসবে।
তরুণরা ২৬ মার্চের ঘটনা তেমন জানে না। দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস তরুণদের জানতে হবে। পেছনের ইতিহাস না জানলে সামনে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। তরুণদের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। প্রবীণ শিক্ষক হিসেবে তরুণদের প্রতি আমার আহ্বান হলো- তারা যেন দেশের ইতিহাস পড়ে ও জানে। কীভাবে বাঙালি জাতি বারবার শোষিত ও বঞ্চিত হয়েছে, সেগুলো তরুণদের জানা দরকার। ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলে এ দেশের মানুষের ওপর ব্যাপক অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে। এ দেশের মানুষ তাদের অধিকার থেকে বারবার বঞ্চিত হয়েছে। এসব ইতিহাস তরুণদের জানতে হবে। কীভাবে এ দেশের মানুষ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে এবং স্বাধীনতা অর্জন করেছে, তার ইতিহাস তরুণদের জানতে হবে।
জাতীর স্বাধীনতা একবারেই হয়েছে, তা হলো ১৯৭১ সালে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা ও বিজয়কে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আমাদের স্বাধীনতা ১৯৭১ সালেই হয়েছে। সেই স্বাধীনতা তাদের ধরে রাখতে হবে। তরুণদের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যা হয়েছে, সেটা হলো গণ-অভ্যুত্থান বা রেনেসাঁ। এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই আমরা আমাদের অধিকার ও স্বাধীনতা পুনরায় ফিরে পেয়েছি। স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার অনেকটা মিল রয়েছে। এটা কখনোই সাংঘর্ষিক নয়। আমরা আবার গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছি।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমারা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, সেটাই হলো স্বাধীনতা। ২০২৪ সালের আগস্টে যেটা হলো তা স্বাধীনতা নয়, এটা হলো জাগরণ। মানুষের মধ্যে এক ধরনের জাগরণ তৈরি হয়েছে নিপীড়ন ও নির্যাতন থেকে বের হয়ে আসার। ’২৪-এর আগস্টের ঘটনাকে স্বাধীনতা বলা যাবে না। তবে ’৭১-এর স্বাধীনতার সঙ্গে অনেক মিল রয়েছে। আমরা যে চেতনা নিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম তা ব্যর্থ হয়েছিল। আগস্টের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই স্বাধীনতা আবার অর্জিত হবে।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়