তখনো বুঝে উঠতে পারিনি। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর যখন জ্ঞান ফিরল, দেখলাম আমার দুই পা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। পা দুটি অসাড় লাগছে। কিছুক্ষণ সময় লাগল বুঝতে যে পায়ে গুলি লেগেছে। গত বছরের ১৯ জুলাই ঘটেছে এ ঘটনা।
২০২৪ সালের ১ জুলাই বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। প্রথম দিকে এ আন্দোলন ছিল অহিংস। সময় যত গড়িয়েছে, আন্দোলন তত সহিংস হয়েছে।
মাঠের একজন ফটোসাংবাদিক হিসেবে পেশাগত কারণে কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রতিটি কর্মসূচির ছবি তুলতে হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কোনো ছবি যেন মিস না হয়, সে ভাবনা সব সময় তাড়া করেছে। ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হয়েছে সম্মুখ সারিতে।
১৯ জুলাই ছিল আন্দোলনের ১৯তম দিন। দিনটি ছিল ৩৬ দিনের মধ্যে আন্দোলনের অন্যতম সহিংস ও ঘটনাবহুল দিন। ওই দিন শুধু ঢাকাতেই ৪৪ জন আন্দোলনকারী শহিদ হন।
প্রতিদিনের মতো সে দিনও আমি ছবি তোলার জন্য সকালেই বের হই। সংঘর্ষের সংবাদ শুনে রামপুরায় যাই। সেখানেই খবর পাই সেগুনবাগিচা, পুরানা পল্টন, বিজয়নগর, প্রেস ক্লাব, হাইকোর্ট, নয়াপল্টন ও কাকরাইল মসজিদ এলাকায় সংঘর্ষ হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় সংঘর্ষের খবর পাই। দুপুর ১টা নাগাদ রামপুরা ছেড়ে পুরানা পল্টনের উদ্দেশে রওনা হই। সেখানে গিয়ে দেখতে পাই, সংঘর্ষ থামাতে রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আন্দোলকারীরাও ইটপাটকেল দিয়ে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। পুরানা পল্টনের আশপাশের পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দায়িত্ববোধ থেকেই ঝুঁকি নিয়ে ছবি তোলা শুরু করলাম। অন্যরা যখন আতঙ্কে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছিল, আমি ঠিক করলাম, আমি ছবি তুলে যাব, এ সংঘর্ষের ছবি আমাকে তুলতেই হবে। অন্য সহকর্মীদের আতঙ্কিত হওয়ারও কারণ ছিল। ঠিক আগের দিন যাত্রাবাড়ীতে সংঘর্ষের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় ঢাকা টাইমসের সাংবাদিক হাসান মেহেদী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
আমি এ পেশায় আছি প্রায় ২৭ বছর। আমার এত বছরের অভিজ্ঞতায় অনেক সহিংসতার ছবি ফ্রেমবন্দি করেছি। কখনো এমন সহিংস ইভেন্ট আমি কাভার করিনি। তবুও সাহস হারালাম না।
দুপুর ২টার দিকে জুমার নামাজের পর বিজয়নগর এলাকা থেকে একটি মিছিল নিয়ে আন্দোলনকারীরা পুরানা পল্টনের মোড়ে দিকে এগোতে চাইল। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে আন্দোলনকারীরা পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
এরপর দুপুর আড়াইটার দিকে প্রেস ক্লাবের সামনে কদমফোয়ারা থেকে আন্দোলনকারীরা আরেকটি মিছিল নিয়ে পুরানা পল্টনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে তাদেরও লক্ষ্য করে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়। পরে প্রধান সড়ক থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে আন্দোলনকারীরা সেগুনবাগিচার বারডেম হাসপাতাল গলিতে অবস্থান নেন।
একই সময় বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মিছিল ও সমাবেশের শেষ মুহূর্তে দলটির নেতা-কর্মীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় আমি পুরানা পল্টন মোড়ে মেট্রোরেলের ৫৯৫ নাম্বার পিলারের গোড়ায় অবস্থান নিয়ে সংঘর্ষের ছবি তুলতে থাকি। চারিদিক থেকে যেভাবে গোলাগুলি চলতে থাকে তাতে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। একটা সময় আমি আন্দোলনকারী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষে পড়ে যাই। সংঘর্ষের একটি ফ্রেমও যেন বাদ পড়ে, সে জন্য ক্যামেরার শাটারে একের পর এক ক্লিক করতে থাকি। তখন মনে হয় বাস্তবতা ভুলে যাই। নিজের জীবনের চেয়ে একটা ভালো ছবিই আমার কাছে প্রধান হয়ে ওঠে।
ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকার মধ্যেই কয়েকজন গুলিবিদ্ধ আন্দোলনকারীকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখি। আমি যখন ছবি তুলছিলাম, তখন আমার পাশে ছিলেন ডেইলি অবজারভারের ফটো সাংবাদিক এ আর সুমন। হঠাৎ আমার চোখ পড়ে সুমনের দিকে। দেখলাম তার পা রক্তাক্ত হয়ে গেছে। তাকে যখন রক্তের কথা বলতে যাব এমন সময় আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। বুঝতে পারছিলাম না কী হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না। মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরতেই দেখি আমি রাস্তার পাশের ফুটপাতে বসে আছি। আমার দুই পা দিয়ে গড়িয়ে রক্ত ঝরছে। বুঝতে পারলাম আমার পায়ে গুলি লেগেছে। এ সময় সংবাদ কাভার করতে আসা কয়েকজন সহকর্মী আমাকে বাতাস করছেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার কর্মস্থল খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল ভাই ও তৎকালীন প্রধান বার্তা সম্পাদক (বর্তমানে ব্যবস্থাপনা সম্পাদক) খালেদ ফারুকী ভাইকে কল দিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি জানালাম। তখন আমাকে জানানো হলো, সহযোগিতার জন্য আমার কয়েকজন সহকর্মীকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হচ্ছে। তখন আমি তাদের জাতীয় প্রেস ক্লাবে আসতে বলি।
আমার অফিসের সহকর্মীরা আসার আগে একটি রিকশা নিয়ে আমাকে ও সুমনকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিয়ে আসা হয়। সে সময় কারা এই কাজটি করেছেন, এখন মনে করতে পারছি না। আহত অবস্থায় সেখানে অবস্থান করা নিরাপদ ছিল না। আমার প্রাণনাশের শঙ্কা ছিল। প্রেস ক্লাবে পৌঁছানোর পরই দেখি আমাকে ও সুমনকে দেখে অন্য সাংবাদিকরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ছুটে আসেন একের পর এক। সবাই জিজ্ঞেস করতে থাকেন কীভাবে কী হলো। তবে খুব বেশি কিছু বলতে পারছিলাম না। কারণ, তখন বেশি কিছু বলার মতো পরিস্থিতিতে ছিলাম না। রক্তক্ষরণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম। ইতোমধ্যে অফিসের গাড়ি নিয়ে আমার সহকর্মী ফয়সাল দেওয়ান, শফিকুল ইসলাম, মিঠুন আল মামুন, সিফাত আহমেদ ও খাজা মেহেদী হাসান পৌঁছে যান। তারা সবাই মিলে আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বেশ ভয় পেয়ে যাই। তবে সাহস হারাইনি। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর আর সাহস ধরে রাখতে পারলাম না। একের পর এক আহত আন্দোলনকারী হাসপাতালে আসছিলেন, তাদের অনেকেই ছিলেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, কেউ কেউ বেঁচে ছিলেন না। হাসপাতালজুড়ে ভয়াল দৃশ্য আমাকে আতঙ্কের অতল গহ্বরে নিয়ে যায়।
হাসপাতালে যাওয়ার পর প্রথমেই আমাকে এক্স-রে রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। এক্স-রেতে দেখা যায় আমার দুই পায়ের কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত সাতটি গুলি লেগেছে। অপারেশন করে গুলিগুলো বের করার জন্য চিকিৎসকদের কাছে অনুরোধ করলাম। কিন্তু তখন এত বেশি আহত আসতে থাকেন যে, তারা সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না। আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সেখানেই ফেলে রাখা হয়। কিছুক্ষণ পর অফিসের সহকর্মীরা নিজ দায়িত্বে আমাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অফিসে নিয়ে আসেন।
সম্পাদক মোস্তফা কামাল ভাই, নির্বাহী সম্পাদক এনাম আবেদীন ভাই, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক খালেদ ফারুকী ভাই, বার্তা সম্পাদক রোকেয়া রহমান আপা, অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক শাহাবুদ্দিন ভাই ও আমাদের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মিন্টু ভূষণ রায় দাদা ছুটে আসেন আমার কাছে। সবার মধ্যে সেদিন আমার জন্য যে ভালোবাসা দেখেছিলাম তা আমার চোখের সামনে এখনো ভেসে ওঠে। সবাইকে গুলি লাগার ঘটনা সংক্ষেপে জানালাম। তখন সঙ্গে সঙ্গে আমার সম্পাদক জানালেন আমার চিকিৎসা খরচ অফিস বহন করবে, আমি যেন কোনো দুশ্চিন্তা না করি। খালেদ ফারুকী ভাই জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘এখনই বেসরকারি কোনো হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নাও।’ আমি আমার কর্মস্থল খবরের কাগজের সহকর্মীদের সে দিনের ভালোবাসা কোনো দিনও ভুলব না।
আমি তখন আমার ক্যামেরা খালেদ ফারুকী ভাইকে বুঝিয়ে দিয়ে (সারা দিনের তোলা সব ছবিসহ) দ্রুত চিকিৎসার জন্য গ্রিন রোডের কমফোর্ট হাসপাতালে যাই। সেখানে গেলে আনুষ্ঠানিকতা শেষে চিকিৎসক আমাকে অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নিয়ে যান। কিন্তু অপারেশনের আগে অন্য জটিলতা তৈরি হয়। নতুন করে করা এক্স-রেতে ডাক্তার লক্ষ করলেন পায়ের হাড়ের একেবারে কাছে টিস্যুর সঙ্গে প্রতিটি গুলি আটকে আছে। এতে অপারেশন করলে পায়ের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। ওটি থেকে বের হয়ে আসলাম। ততক্ষণে আমার পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে চলে এসেছেন। আমাকে দেখে আমার ক্লাস ফোরে পড়া মেয়ে নাজিফা আনজুম রাইসা কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসে। তার কান্না থামাতেই পারছিলাম না। নিজেও কান্না শুরু করে দিলাম। জীবনে কখনো এত অসহায় বোধ করিনি। নিজের অবুঝ মেয়েকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল সব ভাষা বুঝি হারিয়ে গেছে। হাসপাতালে এক গুরুগম্ভীর পরিবেশ তৈরি হলো। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিলাম। তাদের সাহস দিয়ে বললাম, ‘আমার কিছুই হবে না ইনশাআল্লাহ। তোমরা এত চিন্তা করো না।’
আজও আমার দুই পায়ে সেই গুলি বহন করে চলেছি। ১৯ জুলাই ছিল আমার জীবনের এক ভয়াল ও বিভীষিকাময় দিন, যা কোনোদিন ভুলতে পারব না।
সিনিয়র ফটোসাংবাদিক, খবরের কাগজ