দেশজুড়ে চলা তীব্র তাপপ্রবাহে কঠিন সংকট ও চ্যালেঞ্জে পড়েছে দেশের চা-শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় চা-গাছে গজাচ্ছে না নতুন কুঁড়ি, পুড়ে যাচ্ছে চা-গাছের পাতা। নানান জাতের রোগবালাই দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি তীব্র তাপপ্রবাহে চা-গাছের পাতা তুলতে সমস্যায় পড়ছেন চা-শ্রমিকরা। তীব্র গরমে লোডশেডিংয়ে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। তাপপ্রবাহের মধ্যে আহরিত চা-পাতার গুণগত মান পড়ে যাওয়ার শঙ্কায় ভুগছেন ব্যবসায়ীরা।
চলমান তাপপ্রবাহের কারণে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ৪২টি চা-বাগানের চা-গাছে আসছে না নতুন পাতা ও কুঁড়ি। পাশাপাশি ছায়াবৃক্ষের নিচে থাকা চা-গাছগুলোতে ধরেছে ‘বাঞ্জি দশা’ (চায়ের পাতা শক্ত হয়ে যাওয়া)। দীর্ঘদিন ধরে চাহিদামাফিক বৃষ্টি না হওয়ায় চা-গাছগুলোতে আক্রমণ করেছে ‘রেড স্পাইডার’, যার ফলে চা-গাছগুলোতে ধরেছে লাল রোগ। লাল রোগের প্রভাবে চা-গাছের পাতাগুলো লাল হয়ে ঝরে যাচ্ছে।
সাধারণত মার্চ-এপ্রিল মাসকে চা-পাতা উৎপাদনের ভরা মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু উৎপাদনের এই ভরা মৌসুমে তীপ্র তাপপ্রবাহের ফলে চা-শিল্পে আশানুরূপ উৎপাদন নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, সাধারণত চা-গাছগুলো ৩২ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপ সহ্য করতে পারে। কিন্তু এবার গড় তাপমাত্রা থাকছে ৩৬ ডিগ্রির ওপর। চা-গাছগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে সেচ দেওয়া সত্ত্বেও ময়েশ্চার ধরে রাখা যাচ্ছে না। অতিরিক্ত তাপ মাটি থেকে দ্রুত পানি শুষে নিচ্ছে।
এদিকে তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে চা-শ্রমিকরা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ পাতা উত্তোলন করতে পারছেন না। প্রতিদিন প্রতিজন চা-শ্রমিকের ২৪ কেজি চা-পাতা তোলার লক্ষ্য থাকলেও তীব্র গরমের কারণে তারা সর্বোচ্চ ১৫ কেজি পর্যন্ত তুলতে পারছেন। গরমে চা-শ্রমিকরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। বারবার পান করতে হচ্ছে পানি। পাতা চয়নের গতিও হয়ে গেছে শ্লথ।
চা-শ্রমিক গীতা গোয়ালা বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে চা-পাতা তুলতে আমাদের খুব কষ্ট হয়। ১ ঘণ্টা পাতা তুললে ১ ঘণ্টা ছায়ায় বসে থাকা লাগে। পরিমাণমতো পাতা তুলতে পারি না। তাই পুরো হাজিরাও পাই না।’
আরেক চা-শ্রমিক সুনীতি নায়েক জানান, এত গরম কখনো পড়তে দেখিনি। প্রচণ্ড গরমে পাতাগুলো সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তীব্র রোদের কারণে পাতা জ্বলে লাল হয়ে গেছে। সারা দিনে বাগানে ঘুরে তোলার মতো ১০-১২ কেজি পাতা পাচ্ছি।
বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা জানান, গত কয়েক দিন ধরেই বৃষ্টির দেখা নেই বললেই চলে। তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮-এর ঘরে ওঠানামা করছে। তীব্র গরমে শ্রমিকরা ঠিকভাবে পাতা তুলতে পারছেন না। এ ছাড়া খরার কারণে নতুন পাতা ও কুঁড়ি গজানো বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে।
তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে লোডশেডিংও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। যার কারণে বাগান থেকে তোলা চা-পাতাগুলো প্রক্রিয়াজাত করতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বাগান মালিকদের।
সরেজমিনে শ্রীমঙ্গলের একাধিক চা-বাগান ঘুরে দেখা যায়, তীব্র দাবদাহ থেকে চা-গাছ বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন বাগান কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকরা। প্রতিদিনই তারা সেচ দিচ্ছেন চা-বাগানে, পাশাপাশি রোগবালাইয়ে আক্রান্ত চা-গাছগুলোতে ছিটানো হচ্ছে কীটনাশক। বাঞ্জি দশায় আক্রান্ত গাছগুলো থেকে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে পাতা।
গত বছরের শীত মৌসুমে প্রুনিং (চা-গাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য গাছের মাথা ছেঁটে ফেলা) করা বিভিন্ন বাগানে গিয়ে দেখা যায়, গাছে গাছে এখনো নতুন কোনো কুঁড়ি আসেনি। চা-শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিগগিরই পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টি না হলে এসব গাছে নতুন কুঁড়ি আসবে না।
চা-বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট বিভাগীয় চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ শিবলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘তীব্র তাপপ্রবাহে চা-শিল্প সংকট ও চ্যালেঞ্জ দুটোর মুখেই পড়েছে। চা-গাছে রোগ ধরেছে, সেচ দিতে সমস্যা হচ্ছে, লোডশেডিংও আমাদের বেশ ভোগাচ্ছে। এ ছাড়া চায়ের দামও কমে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় চা-বাগান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় তাপপ্রবাহের ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলো আমাদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে পড়েছে।’
ইস্পাহানি জেরিন চা-বাগানের উপমহাব্যবস্থাপক সেলিম রেজা বলেন, ‘চা-শিল্প অনেকটাই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে আমাদের উৎপাদন কমেছে। আমরা চা-গাছে সেচ দিয়ে চা-গাছগুলো টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লোডশেডিংও বেড়েছে। জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
মহসীন টি হোল্ডিং কোম্পানি লিমিটেডের ফ্যাক্টরি ব্যবস্থাপক ফয়সল শামীম খবরের কাগজকে বলেন, ‘তীব্র তাপপ্রবাহে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে গেছে। এখন আমাদের প্রতিদিন ১৬ হাজার কেজির মতো পাতা প্রক্রিয়াজাত করার কথা ছিল। সেখানে আমরা মাত্র ৭-৮ হাজার কেজি চা-পাতা প্রক্রিয়াজাত করতে পারছি। আগামী এক সপ্তাহ এই রকম তাপপ্রবাহ চলতে থাকলে চা-গাছ থেকে আর কোনো পাতা তোলাই সম্ভব হবে না। শীতকালে আমরা বাগানে কৃত্রিমভাবে পানি দিই গাছগুলোতে। এখন গরমকালে সেচ দেওয়ার জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের কাছে পানির পর্যাপ্ত সোর্স নেই।’
এদিকে চা-শিল্পের খরার প্রভাবে উৎপাদিত চায়ের গুণগত মান পড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন চা-ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, এই খরার সময়ে উত্তোলিত চা-পাতা থেকে ভালো মানের চা পাওয়া কষ্টকর হয়ে যাবে।
চায়ের অকশন বিডার মেসার্স পদ্মা টি সাপ্লাইয়ের স্বত্বাধিকারী মেঘনাদ হাজরা খবরের কাগজকে বলেন, ‘চলমান তাপপ্রবাহের কারণে চায়ের উৎপাদন বেশ কমে যাবে। উৎপাদন কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে চা-পাতার দাম বাড়বে। পাশাপাশি চায়ের মানও কমে যাবে।’
বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. ইসমাইল হোসেন বলেন, এই তাপপ্রবাহ ও খরার সময়ে সেচ এবং পচা গোবরের সঙ্গে টিএসপি সার মিশিয়ে বাগানগুলোর মাটিতে দিলে ভালো ফল মিলতে পারে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রকল্প উন্নয়ন ইউনিটের পরিচালক ড. এ কে এম রফিকুল হক বলেন, ‘সারা বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে। যে কারণে এই তাপপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছে। তাপপ্রবাহে চা-বাগান মালিকদের আমরা চা-গাছ টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। এ বছর আমাদের চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০৮ মিলিয়ন কেজি। এই তাপপ্রবাহ চলমান থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে বেশ বেগ পেতে হবে।’
চা-শিল্পের জন্য কোনো সুখবর দিতে পারছে না আবহাওয়া বিভাগ। শ্রীমঙ্গলের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের আবহাওয়া পর্যবেক্ষক বিপ্লব কুমার দাশ খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত কিছুদিন ধরেই তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রির ঘরে ওঠানামা করছে। এক দিন তাপমাত্রা প্রায় ৩৮ ছুঁয়ে ফেলেছিল। আগামী কয়েক দিন গরম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’