একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২১ সালের ২২ অক্টোবর এক রায়ে বলেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের শহিদ হওয়া ও লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম বিসর্জন প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস।’ এই রায়ের বক্তব্যের মতোই সংখ্যা উল্লেখ না থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের সময় লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম বিসর্জনের কথা বলা হয়েছে বারবার। তবে স্বাধীনতার ৫৩ বছরে সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সরকারের গেজেটে প্রকাশ পেয়েছে মাত্র ৫০৪ বীরাঙ্গনার নাম। সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, কোথায় এবং কেমন আছেন বাকি বীরাঙ্গনারা।
অবশ্য বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো বলছে, গেজেটভুক্তির জন্য আবেদন নিষ্পত্তির সময়সীমা নির্ধারণ না থাকা এবং পরিকল্পনাহীনতার কারণেই অধিকারবঞ্চিত হয়ে উল্টো নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন বীরাঙ্গনারা।
গত ১৩ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে সহায়তাকারী সব নারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কার্যক্রম চলমান আছে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সুপারিশের আলোকে এরই মধ্যে ৫০৪ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তাদের নাম গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে।
এর আগে ২০২২ সালের ১৬ জুন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) গেজেটভুক্ত বীরাঙ্গনার সংখ্যা হালনাগাদ নয়। সরকারি তালিকায় এখন পর্যন্ত মোট বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৪৪৮ হলেও লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ৪০২ জনের নাম। এর মধ্যে ৮৯ জন বীরাঙ্গনারই নামের বানানসহ বিভিন্ন ধরনের ভুল রয়েছে। পিতা বা স্বামীর নামের ক্ষেত্রে বানান ও পদবির ভুল, এমনকি ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে ২০৭ জনের। বিভিন্ন আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সঙ্গে এমন তথ্যগত ভুল বীরাঙ্গনাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা তৈরি করে।’
তা হলে প্রশ্ন ওঠে বাকি বীরাঙ্গনাদের কী হলো? তারা আছেনই বা কোথায়? এখনো দেশের আনাচে-কানাচে অনেক বীরাঙ্গনার কান্না শোনা যায়। স্বীকৃতি না পাওয়ায় এবং সামাজিকভাবে নিগৃহীত হওয়ার কষ্টে তাদের এই কান্না।
এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বাধীনতার এত বছর পরে এসে সরকারিভাবে বীরাঙ্গনাদের স্বীকৃতি আমাদের জন্য অনেক আনন্দের ছিল, কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রাপ্তির তুলনায় এখন অপ্রাপ্তি বেশি। জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলা হলেও তুলনামূলক কম আলোচিত প্রসঙ্গ হচ্ছে বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘বীরাঙ্গনাদের চিহ্নিত করা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানের পুরো প্রক্রিয়ায় নানা ঘাটতির বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে, যা আমরা কাজ করতে গিয়ে দেখেছি। এর মধ্যে বীরাঙ্গনাদের গেজেটভুক্তির জন্য আবেদন নিষ্পত্তির জন্য সময়সীমা নির্ধারণ না থাকা, পরিকল্পনাহীনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি, অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগের সঙ্গে রয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক-সাংস্কৃতিক নেতিবাচক মনোভাব। পাশাপাশি এখন একটি বড় সিন্ডিকেট প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, যেখানে বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি পেতে হলে তাদের টাকা দিতে হবে। এ ছাড়া বীরাঙ্গনাদের পরিবারও তাদের পরিচয় প্রকাশে অনেক সময় সহযোগিতা করছে না। আবার যেসব পরিবার সহযোগিতা করছে তারাও ওই বীরাঙ্গনার প্রাপ্য সুবিধা নিজেরা ভোগ করছে বলেও অভিযোগ আছে।
বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নারীপক্ষ। সরকারি তালিকার বাইরে এ পর্যন্ত ১০০ জনের তালিকা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ৫০ জনকে মাসিক ভাতা দেওয়া হচ্ছে নারীপক্ষের পক্ষ থেকে।
কেন বীরাঙ্গনারা দ্রুত সরকারি তালিকাভুক্ত হচ্ছেন না জানতে চাইলে নারীপক্ষের সদস্য নাজনীন সুলতানা রত্না খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে বীরাঙ্গনাদের সঙ্গে আমরা কাজ করতে গেলে অনেকেই অভিযোগ করেন সরকারের পক্ষে কেউ এসে তাদের খোঁজই নেয়নি। আবার অনেকের ভেরিফিকেশন হয়েছে, কিন্তু এখনো গেজেটে নাম আসেনি। অনেকে আবার আবেদন করে রেখেছেন, কিন্তু তারপর আর কিছুই এগোয়নি।’ তিনি বলেন, কারও কারও অভিযোগ আছে একটি চক্র তালিকায় নাম তুলে দেওয়ার জন্য তাদের কাছে টাকা চেয়েছে। টাকা না দেওয়ায় কাজ আটকে আছে। যে বীরাঙ্গনাদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীনতা পেয়েছি, স্বাধীন দেশে বাস করছি, তাদের কি এমন অবহেলায় থাকার কথা- এমন প্রশ্ন তুলে নাজনীন সুলতানা রত্না বলেন, বীরাঙ্গনাদের তাদের প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া উচিত। একজন মুক্তিযোদ্ধা যে সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেঁচে আছেন, বীরাঙ্গনাদেরও সে মর্যাদা যত দ্রুত সম্ভব দেওয়া উচিত। কারণ তাদের বয়স হয়েছে। অনেকে তো মারাও গেছেন। কিন্তু যারা বেঁচে আছেন তাদের মধ্যে অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকে ভিক্ষা করছেন।
এসব সমস্যার সমাধানের কথা জানতে চাইলে নাজনীন সুলতানা রত্না খবরের কাগজকে বলেন, সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। কাজগুলোকে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। যেন তারা বেঁচে থাকতে অন্তত স্বীকৃতিটা পান। একটু ভালোভাবে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারেন।
বীরাঙ্গনাদের দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়ার কথা উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, বীরাঙ্গনারা যে বীর সেই স্বীকৃতি দিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যাতে আরও বেশি প্রচার করা হয়। পাশাপাশি তাদের তালিকায় আনার জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) যে দীর্ঘসূত্রতা আছে, সেটিকে দ্রুত করার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি যারা সিন্ডিকেট করে বীরাঙ্গনাদের তালিকায় আনার জন্য অর্থ নিচ্ছেন ও কার্যক্রমটি দীর্ঘ করছেন, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।