উৎপাদন খরচ বাড়ায় চট্টগ্রামের প্রান্তিক পর্যায়ের পোলট্রি খামারিরা বিপাকে পড়েছেন। ফিড (খাবার) ও মুরগির বাচ্চার দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভ তুলতে গিয়ে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। খামারিদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে ব্যবসা ছোট করেছেন। কেউ আবার লোকসানের ভার বইতে না পেরে ব্যবসাই গুটিয়ে নিয়েছেন।
খামারিরা জানিয়েছেন, বড় শিল্পগ্রুপগুলো বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা মুরগির বাচ্চা ও ফিডের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। প্রান্তিক খামারিদের একটি ডিম উৎপাদনে ১১ টাকার বেশি খরচ পড়ছে। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ১০ টাকার কমে। অন্যদিকে মুরগির বাচ্চাও কিনতে হচ্ছে বাড়তি দরে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে মুরগির বাচ্চার দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। অথচ কোম্পানিগুলো চাইলে সব খরচ সামলে এখনো ৩০ টাকার মধ্যে একটি মুরগির বাচ্চা বিক্রি করতে পারে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ফিডের (খাবার) দাম বেড়ে যায়। এরপর আর কমেনি।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বৃহত্তর চট্টগ্রামে (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম) করোনা মহামারির আগে ২০ হাজারের বেশি খামারি ছিল। লোকসানের ভার বইতে না পেরে অনেক খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে ১০ থেকে ১২ হাজার খামারি টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে যেভাবে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, এমনটা অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকের মধ্যে প্রান্তিক খামারিরা বিলীন হয়ে যাবেন।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রিটন প্রসাদ চৌধুরী বলেন, ‘মুরগির বাচ্চার দাম অনেক বেড়েছে। একটা বাচ্চা কিনতে ৫০ টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে। প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) ফিডের দাম ৩ হাজার ২০০ টাকা। কয়েক বছর আগে ছিল ২ হাজার ২০০ টাকা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অজুহাতে খাবারের দাম বাড়ানোর পর আর কমানো হয়নি। ব্রয়লার মুরগির ওজন ১ কেজি হতে ২৫ দিন সময় লাগে। ১ কেজিতে আমাদের খরচ পড়ে ১৫০ টাকার বেশি। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে। এভাবে চলতে থাকলে প্রান্তিক খামারিরা বিলীন হয়ে যাবেন। বড় গ্রুপগুলো বাজার দখল করে একচেটিয়া ব্যবসা করবে।’
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) তথ্যমতে, প্রতিদিন দেশে ডিমের চাহিদা ৪ কোটি পিস। উৎপাদন আছে সাড়ে ৪ কোটি। দিনে ৩ হাজার টন মুরগির চাহিদার বিপরীতে ৩ হাজার ৫০০ টন উৎপাদন হচ্ছে। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, উদ্বৃত্ত উৎপাদনের পেছনে প্রান্তিক খামারিদের অবদান রয়েছে। তাই তাদের টিকিয়ে রাখতে সরকারকে কাজ করতে হবে।
সংগঠনটির সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, ‘বাচ্চার দাম বাড়ায় মুরগি উৎপাদনে খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু খামারিরা ন্যায্যদাম পাচ্ছেন না। তাহলে খামারি টিকে থাকবেন কীভাবে? খামারিদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। আমরা বিভিন্ন কোম্পানির হাতে আর জিম্মি থাকতে চাই না। এদের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ও খামারিরা ন্যায্যমূল্য না পেলে ভবিষ্যৎ খারাপ হবে।’
নাহার অ্যাগ্রোর মহাব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) মনোজ কুমার বলেন, ‘কোম্পানিগুলোকে অযথা দোষ দিয়ে লাভ নেই। ফিড বা বাচ্চা সবকিছুতেই আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাই এর প্রভাব পড়েছে। কাঁচামাল আমদানিতে ডলার রেটের তারতম্য থাকে। আমাদের মজুরি খরচও আগের তুলনায় বেড়েছে। আগে একজন শ্রমিক মাসে ৯ হাজার টাকা মজুরি নিতেন। এখন ১৫ হাজার টাকার নিচে কেউ কাজ করতে চান না। একজন ম্যানেজার নিয়োগ দিলে তিনি ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন। যারা প্রতিষ্ঠান চালায় তারাই বুঝে ব্যয় কতটা বেড়েছে। বাকিরা না বুঝেই মন্তব্য করেন।’
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘ছোট খামারিদের টিকিয়ে রাখতে হবে। কারণ তারা টিকে থাকলে বড় কোম্পানিগুলো একচেটিয়া ব্যবসা করতে পারবে না। পাশাপাশি কোনো সিন্ডিকেট হচ্ছে কি না তা দেখতে হবে। প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে আরও উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে হবে।’
চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ডা. আতিয়ার রহমান বলেন, ‘মন্ত্রণালয় মুরগির বাচ্চার দাম নির্ধারণ করে দিতে পারবে না। কারণ আমাদের মুক্তবাজার অর্থনীতি। বড় গ্রুপগুলোর ওপর নির্ভর না করে খামারিরা নিজেরাই ফিড তৈরি করতে পারেন। তখন তাদের খরচ অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি বড় গ্রুপগুলো বাড়তি দরে ফিড বা বাচ্চা বিক্রি করলে সেটার ব্যবস্থা তো আমরা নিতে পারি না। কারণ আমার দপ্তরে তো ম্যাজিস্ট্রেট নেই বা আমাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নেই।’